বই আলোচনা
মানুষখেকো মানুষ: দারুণ সব গল্পে সাজানো
অরুণ বর্মন
নৈঃশব্দের কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. শাহানাজ পারভীন একজন নিভৃতচারী শব্দচাষি। তিনি একাধারে কবি, গল্পকার, ছড়াকার, প্রবন্ধকার, ঔপন্যাসিক ও গবেষক। পেশাগত জীবনে তিনি একটি কলেজের অধ্যক্ষ। বহুধা প্রতিভার অধিকারী এই সব্যসাচী লেখিকা সাহিত্যের প্রায় সব বিভাগেই সরব পদচারণা করে যাচ্ছেন। তুলে আনছেন সমাজ জীবনের আনাচে-কানাচে ঘটে যাওয়া নানা বাস্তবতার গল্প, কবিতা, ছড়া, উপন্যাস। জীবনের ডানে-বামে, সামনে-পেছনে সব দিকেই চৌকস দৃষ্টি রেখে হেঁটে যাচ্ছেন সামনের পানে। জীবনের খুব কাছ থেকেই উপলব্ধি করছেন জীবনকে। উপলব্ধি করছেন সমাজের নানা শ্রেণিপেশারর মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নাকে। বর্তমানকে ধারণ করে লিখছেন অবিরত। তার শক্তিশালী লেখনী পাঠকের শুধু মনে খোরাক জোগাচ্ছে না; পাঠকের সঠিক উপলব্ধিতে পৌঁছে দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। একজন বিজ্ঞ সাহিত্যিক হিসেবে তার সুনাম এরই মধ্যে চতুর্দিকে বিস্তৃত হচ্ছে।
তার একটি গল্পের বই ‘মানুষ খেকো মানুষ’ ২০২৪ সালে জলধি প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বইটির চমৎকার প্রচ্ছদ এঁকেছেন তাইফ আদনান। বইটি হাতে পাওয়ার পর ক’দিনে গল্পগুলো মনোযোগসহ পড়লাম। বেশ ভালো লাগলো। ভাবলাম বইটির একটি পাঠ-প্রতিক্রিয়া না জানালে আমার পড়ার সার্থকতা হবে না। তাই আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।
‘মানুষ খেকো মানুষ’ বইটি দারুণ দারুণ সব গল্পে সাজানো। বইটিতে আছে মোট আঠারোটি গল্প। সবগুলোই পড়ার চেষ্টা করেছি। বইটি পাঠ করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে গল্পগুলো সমাজের চারপাশের ঘটে যাওয়া ঘাটনার একটি মুকুর। গল্পগুলো আমাকে এমনভাবে টেনেছে যে, কোনো একটি গল্প পড়া শুরু করলে সেটি না শেষ করা পর্যন্ত উঠতে পারিনি। একটা পড়ার পরে আরেকটা পড়ার প্রতি তীব্র আকর্ষণ সৃষ্টি হয়েছে।
আমি বইটির প্রথম দুটি গল্প ‘মানুষ খেকো মানুষ’ ও ‘জীবন যেখানে যেমন’ নিয়ে আলোচনা করবো এবং আমার পাঠ-প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবো। একজন গল্পকার তখনই সার্থক হয়; যখন তার গল্পটি পাঠক হৃদয়কে আন্দোলিত করে। পাঠকের মনকে বাস্তবতায় নিয়ে যায়। পাঠক গল্পটিকে তার নিজের জীবনের গল্প বলে মনে করেন। যখন গল্পের কাহিনির মধ্যে ছোট ছোট বাঁকের চৌম্বকীয় আকর্ষণ পাঠকের মনকে আকৃষ্ট করে এবং গল্পটিকে শেষ অবধি টেনে নিয়ে যায়। গল্পের চরম মুহূর্তের রোমাঞ্চকর অবতারণা পাঠককে আবেশিত করে। বইয়ের গল্পগুলো পড়ে আমার মনে হয়েছে গল্পকার তেমনই সব গল্পের প্লট আঁকতে সক্ষম হয়েছেন। পাঠক গল্পের প্রাঞ্জল ভাষা, শব্দের কারুকার্যে মোহিত হবেন বলে আমার বিশ্বাস।
বইয়ে প্রধান গল্প অর্থাৎ প্রথম গল্প ‘মানুষ খেকো মানুষ’ আমার কাছে এমনই একটা গল্প বলে মনে হয়েছে, যা পাঠকের উলব্ধির জয়গাটাকে রিফ্রেশ করবে। মানব যে কখন নিজের অজান্তেই দানব হয়ে উঠতে পারে, কখন বাঘ, সিংহ ও হায়েনার মতো আচরণ করতে পারে, কখন নিজের দাম্পত্যকে উপেক্ষা করে পরনারীর প্রতি আসক্ত হয়ে উঠতে পারে, কখন সে নারী খাদক হয়ে উঠতে পারে; সেটি গল্পকার দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।
কোনো গল্পকারের আসল মুন্সিয়ানা হলো গল্পের চরিত্র সৃষ্টি করা। এই গল্পে সেই মুন্সিয়ানাটা দারুণভাবে দেখিয়েছেন। গল্পের মূল চরিত্র তাজুলকে গল্পকার একেঁছেন সমাজের একজন নারী লোলুপ, লোভী, অসভ্য মানুষ রূপে। যে কি না নিজের ঘরে চাকরিজীবী সুন্দরী স্ত্রী জেসমিন থাকা সত্ত্বেও বাইরের পরনারীর প্রতি আসক্ত হয়। যে বাইরের নারীকে ভোগ করার জন্য নিজের স্ত্রীকেও অপরের হাতে তুলে দিতে দ্বিধাবোধ করে না। তাজুল স্ত্রীকে অন্য কারোর সাথে ব্যস্ত রাখার উদ্দেশ্যে প্রথমাবস্থায় স্ত্রীর বারণ সত্ত্বেও বাড়িতে মেয়ের টিউটর হিসেবে নিজের কলিগ রাকিবকে নিয়োগ দেয়। তারপর স্ত্রীকে একসময় সন্দেহ করে রাকিবের প্রতি দুর্বলতার। ভাবতে থাকে স্ত্রী রাকিবকে নিয়ে মত্ত থাকুক। আমি সেই ফাঁকে বাইরের জমি চষে আসি। কত বড় লোভী এবং স্বার্থপর, পরনারী লিপ্সু না হলে স্ত্রীকে নিয়ে এমন ভাবনা ভাবতে পারে?
গল্পকার তাজুলের চরিত্রটা সে নীচ ভাবেই আঁকার চেষ্ট করেছেন। যেখানে তাজুল ভাবে, তার বন্ধু রাজনের স্ত্রী তো এক বাসের সুপারভাইজারের সাথে চলে গিয়েছিলো। রাজন সেখান থেকে তাকে ফিরিয়ে এনে যদি আবার সুখে সংসার পাততে পারে, ফেসবুকে কাপল ছবি দিতে পারে; তবে সে কেন বাইরের নারীর প্রতি আসক্ত হয়ে পারবে না সংসারে সুখ আনতে। এই তাজুলের চরিত্রটা গল্পকার সত্যিই এক যথার্থ হিপোক্রিটরূপে আঁকতে সক্ষম হয়েছেন।
তাজুল তার পরিবারের বাইরে গিয়ে সাবেক ছাত্রী লাবন্যর সাথে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তোলে। তারই রেশ ধরে এক ছুটির দিনে লাবন্যকে নিয়ে বাল্যবন্ধু রাগিবের ফাঁকা বাসায় ওঠে। সেখানে রাগিবের পাহারায় লাবন্যকে ইচ্ছামতো ভোগ করতে উদ্যত হয়। কিন্তু বাধ সাধে পুলিশ।। পুলিশ সেখানে উপস্থিত হয় লাবন্যের যোগসাজসেই। অ্যারেস্ট হয় তাজুল। পরাজিত হয় তার মানুষখেকো জিভ, তার ভেতরের পশুসত্তা।
আরও পড়ুন
ঘরে বাইরে: প্রথা ভাঙার উপাখ্যান
সংগঠন ও বাঙালি: যে কারণে পাঠ জরুরি
তাজুল যে চারিত্রিকভাবে অনেকটা দুর্বল; সেটা অনেক আগেই টের পেয়েছিলো তার স্ত্রী জেসমিন। তাই তো তাকে আগেই সতর্ক হতে বলেছিল। বলেছিল, ‘কয়লা খাবা আংড়া হাগবা। বুইঝা শুইনা পা বাড়াবা। যত পানিতে নামবা ততটুকুই ভিজবে তোমার।’ এ কথা কিন্তু তখন গ্রাহ্য করেনি তাজুল। করে গেছে যথেচ্ছাচার। যার পরিণতি আজকের দিন। এখনো পুলিশের কাছে ধরা খেয়েও যেন তার শিক্ষা হয় না। এই বেহায়া ও নারী লিপ্সায় উন্মত্ত তাজুল কিন্তু আর কেউ নয়। আমাদেরই সমাজের চরিত্রহীন পরনারী লোলুপ লম্পট পুরুষগুলো।
গল্পকার গল্পের শেষ প্যারাতে সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। লিখেছেন, ‘ও নিজেই কখন যেন একটি আস্ত মানুষখেকো মানুষ হয়ে ওঠে। আর ওর ফাঁক করা হা দিয়ে ক্রমাগত ঢুকে যায় ওর ক্যাঁচরিওয়ালা পুরোনো জেসমিন, পিউপাপিয়া লক্ষ্মী ছেলেটি, পৃথিবীর সবচেয়ে আদরের মেয়েটি, ওর মা, ওর বাবা, ভাই বোন, আত্মীয় স্বজন, কলিগ, প্রিন্সিপ্যাল স্যার, বাড়িওয়ালা একে একে ঢুকতেই থাকে সবাই। ও হা হা গিলতে থাকে একেকটাকে... একেক বার...।’ ও অর্থাৎ তাজুল। সবাইকে সে মানুষখেকো মানুষ রূপে গিলে ফেলছে। গল্পকার তার শেষ প্যারাতে সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরলেন।
সত্যিই মানুষখেকো মানুষ গল্পটি গল্পকারের সমাজের নারী লোলুপ পুরুষের প্রতি এক চপেটাঘাত। গল্পকার গল্পটিতে কিছু নতুন শব্দের আমদানি করেছেন, যাতে গল্পটি আরও শ্রুতিমধুর হয়েছে। যেমন কাপল ছবি, কাপল পোস্ট, পিলো, ডিভান ইত্যাদি। ভালো লেগেছে গল্পটি। আশা করি গল্পটি পাঠকপ্রিয়তা পাবে।
এবার আসা যাক দ্বিতীয় গল্পে। দ্বিতীয় গল্পটি হলো, জীবন যেখানে যেমন। নামকরণটা চমৎকার। নামকরণেই বোঝা যাচ্ছে জীবন যেখানে যায়; সেই পরিবেশেই মানিয়ে নেয়। ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় যেয়ে হয়ে যায় ভিন্ন ভিন্ন মানুষ। প্রতিবার জীবন শুরু হয় অন্য গল্প দিয়ে। তবু ভুলতে পারে না অতীতকে, ভুলতে পারে না জন্মভূমিকে, ভুলতে পারে না শৈশব-কৈশোরের বন্ধুদের।
গল্পের শুরুটাও বেশ রোমাঞ্চকর। মনিকা লিউনিসকির সাথে তুলনা করে গল্পের প্রধান চরিত্র মনিকা জেসিকা তার নিক নেম রেখেছে জেসিকা। গল্পে জেসিকার চেহারার বর্ণনা গল্পকার ফুটিয়ে তুলেছেন অভিনব কায়দায়। গল্পকারের ভাষার চাতুর্যে জেসিকার চেহারা স্পষ্ট ভাসছে পাঠকের চোখে। সুন্দরী চেহারার জেসিকার জন্য অল্প বয়সেই বিয়ে হয় মো. মঞ্জুরুল ইসলামের সাথে। তখন সে কেবল মাধ্যমিক পাস করেছে। মঞ্জুরুল ইসলামও এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। অনেক ধন-সম্পদওয়ালা ঘরের ছেলে। তবু আয়েসী জীবনের ডাকে সব ফেলে তারা পড়ি জমায় আমেরিকায়। মানিয়ে নেয় আমেরিকার পরিবেশের সাথে। গড়ে তোলে আমেরিকার ঢঙে জীবন।
পশ্চিমা ঢঙে দীর্ঘদিন জীবনকে অতিবাহিত করতে যেয়ে জেসিকা যেন হাঁপিয়ে উঠেছে। জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে জেসিকার বোধোদয় হয়। উপলব্ধি করে যান্ত্রিক জীবনের যন্ত্রণা। প্রবাস জীবনের সাথে দেশের পরিবেশের তুলনা করে আপসেট হয়। অতীতকে অবহেলা করার জন্য আফসোস করে। কেন যে সেসময় জেসিকা ভালো করে লেখাপড়া করে নিলো না। তাহলে দেশেই ভালো চাকরি করতে পারতো। তার যে শৈশব-কৈশোরের বন্ধুরা ছাত্রাবস্থায় অপাঙক্তেয় ছিল; তারাই এখন ভালো লেখাপড়া শিখে দেশে বড় বড় অফিসার পদে চাকরি করছে। দেশে তাদের কত সুনাম। আর জেসিকা আমেরিকার মতো উন্নত দেশে যেয়েও যেন শান্তিতে নেই। কাজ না করলে খাবার নেই। এখানে পায়ের ওপর পা দিয়ে বসে খাওয়া যায় না। কর্মঘণ্টা গুনে পয়সা আয় করতে হয়। ছেলেমেয়েও পশ্চিমা ঢঙে মানুষ হচ্ছে। তারা বাবা-মায়ের কথা শোনে না। এখন জেসিকা ভাবে, কেন যে দেশের এত সহায়-সম্পদ ছেড়ে উন্নত জীবনের ধান্দায় আমেরিকায় চলে এসেছিলাম। তবু জীবিকার তাগিদে মেনে নেয় সে জীবনকে। যেখানে যেমন পরিবেশ তার সাথে মানিয়ে নেওয়াই তো জীবন।
গল্পকার এখানে নিজের দেশকে আমেরিকার মতো উন্নত দেশের চেয়েও বড় করে দেখিয়েছেন। গল্পকারের দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল মহিমা প্রকাশ পেয়েছে। শুধু সম্পদ থকলেই যে মানুষ সুখী হয় তা কিন্তু নয়। মানুষের সুখ নির্ভর করে তার মনের অবস্থার ওপর। উন্নত জীবন মানুষকে আর্থিক নিরাপত্তা দেয় কিন্তু আত্মিক নিরাপত্তা দিতে পারে না। মানুষ যতই প্রভাব প্রতিপত্তিশীল হয়ে যাক না কেন, একটা সময় শেকড়ের টান অনুভব করে। শেকড়ে ফিরে আসে। গল্পকার এই গল্পে সেই বিষয়টি সুন্দভারে ফুটিয়ে তুলেছেন।
গল্পটিতেও অনেক নতুন শব্দের আমদানি করেছেন। দারুণভাবে পূর্ব-পশ্চিমের ছবি এঁকেছেন। গল্প সাজানোর ধরনটাও অন্যদের থেকে আলাদা। গল্পে একটা টানটান উত্তেজনা আছে। আছে পশ্চিমা বিশ্ব সম্পর্কে জানার উপাদান। গল্পটি ছোট হলেও বেশ চমকপ্রদ। আমার ভালো লেগেছে।
‘মানুষখেকো মানুষ’ বইটির গল্পগুলো চমৎকার। আশা করি প্রতিটি গল্প পাঠক হৃদয়কে তৃপ্তি দেবে। বইটি পাঠকপ্রিয়তা পাবে। গল্পকারের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। লেখক হিসেবে ড. শাহানাজ পারভীন অনন্য উচ্চতায় অবস্থান করছেন। তার লেখনীর দক্ষতা, ভাষার প্রাঞ্জলতা, শব্দ নির্বাচনের পারদর্শিতা, কাহিনি সৃষ্টির পটুতা অসাধারণ। তার লেখার প্রচার পরিধিও দিন দিন বেড়ে চলেছে। দেশের সব প্রান্তেই তার লেখা পৌঁছে গেছে এবং যাচ্ছে। বিদেশেও তার লেখা সমাদৃত হচ্ছে। আমি গল্পকারের লেখার উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।
এসইউ