বই আলোচনা
দ্য আলকেমিস্ট: জীবাত্মা ও পরমাত্মায় একাত্মতার সুর
পাওলো কোয়েলহো ও দ্য আলকেমিস্ট, ফাইল ছবি
মাসুমুর রহমান মাসুদ
প্রখ্যাত ব্রাজিলিয়ান ঔপন্যাসিক এবং গীতিকার পাওলো কোয়েলহো (১৯৪৭) বিশ্বব্যাপী ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন তার সর্বাধিক পঠিত উপন্যাস ‘দ্য আলকেমিস্ট’র (১৯৮৮) জন্য। বিশ্বের ৮০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত উপন্যাসটি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে আলোচনা ও গবেষণা করার সুযোগ রয়েছে। এতে ভালোবাসা, আধ্যাত্মিকতা এবং দর্শনের ত্রিমুখী প্রভাব বিদ্যমান। আজকের আলোচ্য বিষয় এ উপন্যাসে মেষপালক সান্তিয়াগো, মরুকন্যা ফাতেমার ভালোবাসা এবং সেই ভালোবাসার আধ্যাত্মিকতার মধ্য দিয়ে বিশ্বআত্মার সাথে একাত্মবোধের সুর।
উপন্যাসটিতে পাওলো কোয়েলহোর জীবনের বিশাল ভ্রমণ অভিজ্ঞতার ছাপ রয়েছে প্লটের অগ্রসরতার মধ্যে। এতে ভালোবাসার ধারণা কেবল সাধারণ আবেগ নয়। এই ভালোবাসা একটি ‘রাসায়নিক বিক্রিয়া’র মতো। মানুষের জীবাত্মাকে পরমাত্মার সাথে একীভূত করে পরিণতির দিকে এগোয়। কোয়েলহো ১৯৪৭ সালের ২৪ আগস্ট ব্রাজিলের রাজধানী রিও ডি জেনেইরোতে জন্মগ্রহণ করেন। সেখানেই প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি আইন বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। ১৯৭০ সালে তিনি ভ্রমণের উদ্দেশ্যে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে ঘুরে বেড়ান মেক্সিকো, পেরু, বলিভিয়া এবং চিলিসহ ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে।
এ সময় তিনি ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে বিশদ জ্ঞান অর্জন করেন। এরপর শুরু করেন লেখালেখি। উপন্যাস, ছোটগল্পের পাশাপাশি শিল্পী এলিস রেজিনা ও রিটা লিসহ অসংখ্য বিখ্যাত ব্রাজিলীয় গায়কদের গান তিনি রচনা করেছেন। ‘আমি জন্মেছিলাম দশ হাজার বছর আগে’ শীর্ষক বিখ্যাত গানটি বাংলা সাহিত্যের অসাধারণ প্রতিভার কবি জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতার ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে’ চরণের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কোয়েলহো এমন গানসহ প্রায় ৬০টিরও বেশি গান রচনা করেছেন।
দ্য আলকেমিস্ট উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দার্শনিক উক্তি পৃথিবীব্যাপী অনুসন্ধিৎসু মানুষের মনকে আলোড়িত করে যাচ্ছে অদ্যাবধি। কোয়েলহো বলেন, ‘তুমি যখন কিছু প্রত্যাশা করবে, বিশ্ব তখন তোমাকে তা অর্জনের জন্য সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।’ এ উক্তির মধ্যদিয়ে ‘সর্বপ্রাণবাদ’ তত্ত্বের যথেষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। উপন্যাসটির শেষের দিকের অংশজুড়ে মরুদ্যানের ধূলিকণা, বাতাস, সূর্য এবং সৃষ্টিকর্তার হাতের সাথে সান্তিয়াগোর কথোপকথনের যে দিকটি চিত্রিত হয়েছে; এতে এক অভাবিতপূর্ব ভিন্ন রকম দর্শনের দেখা পাওয়া যায়। পৃথিবীর সমস্ত কিছু মানুষকে সহযোগিতা করে, যখন সে প্রকৃতপক্ষে মন থেকে কিছু চায় এবং তা পেতে চেষ্টা অব্যাহত রাখে। এ দর্শন জারি রেখে ঘটনা প্রবাহিত হয়।
উপন্যাসটিতে কোয়েলহো বলেন, ‘জীবনের এক পর্যায়ে আমরা জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাই। জীবনের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ভাগ্যের ওপর। সেটাই সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা।’ এ দার্শনিক উক্তিটি মানুষের ভাগ্যান্বেষণের পথে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হতে পারে। ভাগ্যের দোহাই দিয়ে যে কোনো ব্যর্থতাকে মেনে নেওয়ার প্রবণতা প্রাচ্যবাসীর মধ্যে ব্যাপকভাবে চর্চিত; যেখানে ধর্মীয় অনুভূতিও কিছুটা নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। কোয়েলহোর মতে, ‘মানুষ যে কোনো বয়সে তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে’ এবং ‘জীবনে সবকিছুরই মূল্য রয়েছে। এটাই আলোর দিশারীরা মানুষকে শেখাতে চেষ্টা করেন।’ এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ জীবন দর্শন উপন্যাসটিকে ঋদ্ধ করেছে। এতে আরও বলা হয়, ‘সাহস এমন একটি গুণ, যা বিশ্বের ভাষা বোঝার ক্ষেত্রে খুবই প্রয়োজনীয়।’
মেষপালক সান্তিয়াগো নামের এক যুবকের স্বপ্নে দেখা গুপ্তধন খোঁজার মধ্যদিয়ে কাহিনির সূত্রপাত। সেই গুপ্তধনের খোঁজে স্পেন হয়ে মিশরের পিরামিডের কাছে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ভ্রমণে বের হয় সান্তিয়াগো। পথিমধ্যে স্বপ্নের বর্ণনা জানা বৃদ্ধা মহিলার সাথে তার দেখা হয়। সে স্বপ্নকে ‘স্রষ্টার ভাষা’ হিসেবে উল্লেখ করে। পুনরায় ভ্রমণ পথে ঘটনাক্রমে তার সাথে দেখা হয় বৃদ্ধ রাজা মেলচিকজেদ এবং আলকেমিস্টের সাথে। বৃদ্ধ রাজা এবং আলকেমিস্ট দুজনেই সান্তিয়াগোকে ‘শুভ সংকেত’ সম্পর্কে অবহিত করেন। পথে পথে সে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জন করে। একজন ক্রিস্টাল ব্যবসায়ীর সাথে ব্যবসা করে টাকা উপার্জন করে। প্রতারণার মাধ্যমে এক যুবকের হাতে সর্বস্বান্ত হয়ে পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর কৌশলও সান্তিয়াগো শিখে নেয়। মরুভূমিতে নানা প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে এগিয়ে যাওয়ার সাহসও সে অর্জন করে।
আল ফাইয়ুম মরুদ্যানে সান্তিয়াগোর সঙ্গী হয় আলকেমিস্ট। তপ্ত বালির বুকে পরম শান্তির পরশ পায় মেষপালক ছেলেটি; যখন তার সাথে দেখা হয় মরুকন্যা ফাতেমার। তার গায়ে কালো বোরকা ছিল না। তার মাথা নেকাব দিয়ে আবৃত, মুখমণ্ডল দেখা যাচ্ছিল। সে যখন মেয়েটির কালো চোখের দিকে তাকাল, দেখতে পেল মেয়েটি হাসি এবং নীরবতার ভারসাম্য রক্ষা করে তাকিয়ে আছে। যে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভাষা শিখে ফেললো, সে ভাষায় সারা বিশ্ব কথা বলে, যে ভাষাটা বিশ্বের যে-কেউ তার হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারবে। এটাই ভালোবাসা। মানব ইতিহাসের চেয়েও পুরোনো, মরুর চেয়েও অনেক প্রাচীন। পাওলো কোয়েলহোর মতে, ‘এটাই সেই হাত যা ভালোবাসা উসকে দেয়। বিশ্বের প্রতিটি মানুষের জন্য একটি দ্বৈত আত্মার জন্ম দেয়। এ ধরনের ভালোবাসা ছাড়া যে-কারো স্বপ্ন অর্থহীন হয়ে যায়।’
উপন্যাসে ফাতেমার ভালোবাসার ভূমিকা অত্যন্ত গভীর এবং রূপান্তরমূলক। এখানে ভালোবাসা কেবল দুটি হৃদয়ের মিলন নয়, বরং এটি ‘বিশ্ব-আত্মা’র সাথে যোগাযোগ সৃষ্টির একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কোয়েলহো দেখিয়েছেন যে, ‘সত্যিকারের ভালোবাসা মানুষকে তার জীবনের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করে না। বরং লক্ষ্য অর্জনে শক্তি জোগায়।’ ফাতেমা মরুকন্যা। সে জানে পুরুষদের ফেরার জন্য দূরে যেতে হয়। আলকেমিস্ট সান্তিয়াগোকে জানায়, ভালোবাসা কখনো মানুষকে তার গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা থেকে বিরত রাখতে পারে না। সে যদি তা থেকে বিরত থাকে তবে বুঝতে হবে সেটা প্রকৃত ভালোবাসা নয়, যে ভালোবাসা বিশ্বজনীন মমতার কথা বলে সেটাই প্রকৃত ভালোবাসা।
সান্তিয়াগো ও ফাতেমার ভালোবাসা প্রকৃত। তাই মরুকন্যা ফাতেমা জানে তার ভালোবাসার মানুষ তার কাছে পুনরায় ফিরে আসবে। কারণ তার মা তার বাবার জন্য অপেক্ষা করেছে। সে যতবারই গিয়েছে; ততবারই ফাতেমার মায়ের কাছে ফিরে এসেছে। ফাতেমা এমনভাবে অপেক্ষা করতে লাগল, যেভাবে একজন নারী তার সাহসী পুরুষের জন্য অপেক্ষা করে। ফাতেমা সান্তিয়াগোকে আটকে রাখতে চায়নি, মুক্ত করে দিয়েছে। তাকে স্বপ্নপূরণের জন্য মরুভূমিতে চলে যেতে উৎসাহ দিয়েছে। এটিই ভালোবাসার সেই কেমিস্ট্রি; যা মানুষকে মোহগ্রস্ত করে বেঁধে রাখে না, মুক্তির মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগত কিংবদন্তিতে পৌঁছাতে সহযোগিতা করে। ফাতেমার কাছে প্রেম মানে হলো মরুভূমির বাতাসের মতো যা আসে এবং যায়। কিন্তু তার অস্তিত্বকে সমৃদ্ধ করে দেয়। এটি জীবাত্মার এমন এক অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি তার প্রিয়জনের সাফল্যের মধ্যেই নিজের সার্থকতা খুঁজে পায়।
সান্তিয়াগো ও আলকেমিস্ট মরুদ্যানে দস্যু সৈন্যবাহিনীর হাতে আটক হয়। প্রাণে বাঁচার জন্য আলকেমিস্ট দস্যুদের জানায় যে, সান্তিয়াগো নিজেকে বাতাসে রূপান্তর করতে পারে। এটা সম্ভব হয় শুভ সংকেত বুঝে দীর্ঘ প্রচেষ্টা ও সাধনার মধ্য দিয়ে বিশ্বআত্মার প্রতি মেষপালক ছেলেটির ভালোবাসার মাধ্যমে। এখানে কোয়েলহোর দর্শনে ভালোবাসা হলো সেই শক্তি, যা এই মহাবিশ্বকে সচল রাখে। একেই তিনি সৃষ্টির বা মহাবিশ্বের ভাষা হিসেবে অভিহিত করেছেন। যখন সান্তিয়াগো নিজেকে বাতাসে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করছিল; তখন সে বুঝতে পারে যে ভালোবাসা কেবল মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
ছেলেটি বায়ুর সাথে কথা বললো, সূর্যের সাথে কথা বললো। সে সূর্যের কাছে জানতে পারলো সূর্য নির্দিষ্ট দূরত্বে থেকে পৃথিবীকে ভালোবাসে। পৃথিবীর কাছে এলে সবকিছু নিঃশেষ হয়ে যাবে। সূর্য পৃথিবীকে জীবন ও উষ্ণতা দেয় আর পৃথিবী সূর্যকে বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগায়। সূর্য, বাতাস এবং মরুভূমির সাথে কথোপকথনের সময় সান্তিয়াগো উপলব্ধি করে যে, ভালোবাসা হচ্ছে সেই চাবিকাঠি; যা দিয়ে প্রকৃতির সাথে তথা পরমাত্মার সাথে কথা বলা সম্ভব। সান্তিয়াগো বিশ্বের আত্মার কাছে পৌঁছল এবং দেখতে পেল, যে হাত দিয়ে সবকিছু লেখা হয়েছে তা স্রষ্টারই অংশ বিশেষ। সে দেখতে পেল তার আত্মা স্রষ্টার আত্মায় মিলেমিশে একাকার। এর মধ্য দিয়েই ছেলেটি অলৌকিক কিছু করতে পেরেছে।
একজন আলকেমিস্ট যেমন সাধারণ ধাতুকে সোনায় রূপান্তর করে; ঠিক তেমনই ভালোবাসাও একজন সাধারণ মানুষকে মহাজাগতিক চেতনায় উন্নীত করে। এই স্তরে ভালোবাসার আর কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রতি আকর্ষণ থাকে না, তা হয়ে ওঠে সৃষ্টির প্রতিটি কণার প্রতি গভীর অনুরাগ। এভাবে ‘দ্য আলকেমিস্ট’-এ ভালোবাসার কেমিস্ট্রি মূলত জীবাত্মা ও পরমাত্মার ঐক্যের একটি সেতুবন্ধন। কায়েলহো বোঝাতে চেয়েছেন যে, ভালোবাসা যখন স্বার্থহীন হয়; তখন তা আর পার্থিব সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকে না। সেটি জীবাত্মার স্তর থেকে উন্নীত হয়ে পরমাত্মার অংশে রূপ নেয়।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, লক্ষ্মীপুর আলিম মাদ্রাসা ও গবেষণা শিক্ষার্থী, উত্তরা ইউনিভার্সিটি।
এসইউ