ভালোবাসাময় সাত দিন, কবে কী জেনে নিন
ভালোবাসার সপ্তাহে সঙ্গীকে উপহার দিতে ভুলবেন না
অলোক আচার্য
সখী ভালোবাসা কারে কয়/ সে কী কেবলি যাতনাময় কবিগুরুর গানের মতোই ভালোবাসা কি মানব মনকে কেবল যন্ত্রণাই দেয়, না ক্ষণিকের শান্তিও দেয়। ভালোবাসায়, প্রেমে কি এমন জাদু আছে যে মানব মস্তিষ্ক বারবার ভালোবাসায় জড়াতে চায়। সম্পর্কে জড়াতো ব্যাকুল থাকে। ভালোবাসা নিয়ে রহস্য চিরকালের। মানুষ ভালোবাসা চায়, পায়ও। তবে খুব ক্ষণিকের অনুভূতির নাম ভালোবাসা। যে আঘাত ভালোবাসা দেয় সে আঘাতও যেন প্রশান্তির!
বসন্ত মানে বাঙালির মন রঙিন হয়ে ওঠার সময়। চারদিকে ফুলের সুবাস আর ছড়ানো ভালোবাসার বর্ণ নিয়ে আসে ভালোবাসা দিবস। এই দিবস কেবল আমাদের দেশে না সারাবিশ্বেই ব্যাপক উদ্দীপনায় কাটে। ভালোবাসা দিবস ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখ হলেও মূলত এর শুরু হয় আরও সাত দিন আগেই। অর্থাৎ পুরো সাতটা দিনকেই ভালোবাসা দিবস হিসেবে ধরা যেতে পারে।
ফেব্রুয়ারির আট তারিখ পালিত হয় হ্যাপি প্রপোজ ডে। এই দিনে আপনজনকে মনের কথাটা বলার, প্রস্তাব দেওয়ার দিন। দীর্ঘদিন ধরে জমিয়ে রাখা কথা এদিন অনায়াসে বলতে পারেন। পরের দিন অর্থাৎ ৯ তারিখ পালিত হয় চকলেট ডে হিসেবে। প্রিয়জনকে মনের কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে উপহার হিসেবে চকলেট দেওয়ার দিন। ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখ হ্যাপি টেডি ডে। নারীদের প্রিয় হলো টেডি বিয়ার। তাই এদিন প্রিয় জনকে টেডি বিয়ার উপহার দেওয়ার রীতি হিসবে পালিত হয় হ্যাপি টেডি ডে। তারপর দিন ভালোবাসার দিন হিসেবে পালিত হয় হ্যাপি প্রমিস ডে। এটি হলো প্রতিজ্ঞা করা এবং প্রতিজ্ঞা রক্ষা করার দিন। ১২ ফেব্রুয়ারি পালন করা হয় হ্যাপি কিস ডে। বুঝতেই পারছেন ভালোবাসার প্রথম শারীরিক প্রকাশ এটি। এর মাধ্যমে প্রেমিক প্রেমিকা একে অপরের কাছাকাছি আসে। তারপরের দিন আসে হ্যাপি হাগ ডে। কিস ডের পর প্রিয়জনকে আরও কাছে টেনে নেওয়ার দিন এটি। এবং সবশেষ দিনে আসে হ্যাপি ভ্যালেন্টাইনস ডে মানে ভালোবাসা দিবস।
বিশ্ব ভালোবাসা দিবস হিসেবে বসন্তের প্রথম দিনকে বেছে নেওয়ায় বাঙালির প্রাণে থাকে উচ্ছ্বাস, আনন্দ। যদিও ভালোবাসতে কোনো নির্দিষ্ট দিনক্ষণ প্রয়োজন হয় না, তবু এই দিনকে ঘিরে উচ্ছ্বাস থাকে। প্রেমিক যুগল অপেক্ষা করে। ‘ভালোবাসা’ শব্দটি মূলত এতটাই বিস্তৃত যে কোনো নির্দিষ্ট দিনে তাকে বেধে রাখা সম্ভব না। আবার কোনো নির্দিষ্ট সম্পর্কের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। তা যেমন মানুষের সঙ্গে মানুষের তেমনি হতে পারে কোনো প্রাণীর প্রতিও। ভালোবাসার ধরণই এমন।
কে কখন কোথায় কাকে ভালোবাসবে তার পূর্ব অনুমান করা সম্ভব না। ভালোবাসার শুরু কবে তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব না। তবে ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইনস ডে এর উৎপত্তি নিয়ে দু’একটি তথ্য রয়েছে। ভ্যালেন্টাইনস ডে’র সংক্ষিপ্ত ইতিহাসে জানা যায়, রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস একটা সময় তার দেশে বিয়ে নিষিদ্ধ করলেন। কিন্তু তা কি আর আটকে রাখা যায়। এগিয়ে এলেন সেন্ট ভ্যালেন্টাইন। তিনি তরুণ তরুণীদের বিয়ে দিলেন। এভাবে চলতে গিয়ে অবশেষে ধরা পরলেন সম্রাটের হাতে। বন্দি অবস্থায় তার সঙ্গে সম্পর্ক হয় একটি মেয়ের। যে মেয়েটি প্রথমে অন্ধ ছিল বলে জানা যায়। কারাগারে থাকা অবস্থায় তাদের প্রেম হয়। পরবর্তীতে তিনি ধর্মযাজকের আইন ভেঙে মেয়েটিকে বিয়ে করেন বলেও শোনা যায়। এই খবর সম্রাটের কানে যাওয়া মাত্রই তার ফাঁসির রায় হয়। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে তার প্রেমিকার কাছে লেখা শেষ চিঠিতে লিখেছিলেন ‘লাভ ফ্রম ইওর ভ্যালেন্টাইন’।
দিনটি ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি। ৪৯৬ খ্রিষ্টাব্দে পোপ গেলাসিয়াস প্রথম এই দিনটিকে ভ্যালেন্টাইনস ডে হিসেবে ঘোষণা করেন। ১৭০০ শতাব্দীতে দিনটিকে জনপ্রিয়ভাবে পালন শুরু করে ব্রিটেন। ভালোবাসা দিবসের পেছনের ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে জনপ্রিয় ইতিহাস। ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের আগে রোজ ডে এবং প্রপোজ ডে থাকে। যদিও ঘটা করে এসব দিবস পালন করা হয় না। তবে ভালোবাসা দিবস সারাবিশ্বেই বেশ ঘটা করেই পালন করা হয়। এক সময় আমরা এসব দিবসের নামই জানতাম না। আজ প্রযুক্তির কল্যাণে তা জানি। যাই হোক, ফাল্গুনের শুরুতে ভালোবাসা দিবসের এই যে প্রথা আজ সারাবিশ্বে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে গেছে তা আমরা সঠিকভাবে বুঝতেও পারছি না, পালনও করছি না। ভালোবাসাকে আমরা বন্দি করে দিয়েছি দিবসের মাঝে।
পৃথিবী সৃষ্টির পর মানবসভ্যতা বিকাশ লাভ করতে শুরু করে। সেই তখন থেকে আজ পর্যন্ত মানব সভ্যতাকে টিকিয়ে রেখেছে যে অদৃশ্য বস্তুটি তা হলো ভালোবাসা। অথচ কতরকমভাবেই এই শব্দটিকে বিশ্লেষণ করা হয়। আর শেষপর্যন্ত তা কেবল ভিন্ন সম্পর্কের আবেগে গিয়ে ঠেকেছে। ভালোবাসা আগেও যেমন ছিল আজও তেমনি আছে। আমরা তা ভুল পথে চালিত করছি। ভালোবাসাকে ঘিরে বৈজ্ঞানিক কত রসায়ন হয়েছে। আসলে কি এই অদৃশ্য বস্তু? যার জন্য মানুষ ছুটছে। মানুষ তো আজ ভালোবাসার কাঙাল। সারা পৃথিবীতে আজ যা কমছে তা হলো ভালোবাসা। হিংসা, বিদ্বেষের চাপে ভালোবাসা তলানিতে ঠেকেছে। ভালোবাসার অর্থ যেন প্রকৃতিই বোঝে সবচেয়ে ভালো। এসব ভালোবাসার জন্যও দিবস দরকার হয়। সেই দিবসে নাাকি ভালোবাসা পূর্ণতা পায়। দিবস গেলেই ভালোবাসা উধাও। কত আয়োজন হয় তার হিসাব নেই। অথচ কি আশ্চর্য! প্রতিটি সেকেন্ড, প্রতিটি মিনিট ভালোবাসার হওয়া উচিত। কিন্তু সেটাকেও আমরা একটা নির্দিষ্ট দিনে বন্দী করে ফেলেছি। নিজের দায়িত্ব কর্তব্য পালনের মধ্যেও ভালোবাসার প্রকাশ ঘটে।
সময় যত গড়াচ্ছে, ভালোবাসা দিবস পালনের তোড়জোড় ততই বাড়ছে। ফুল বিক্রি বাড়ছে, নতুন সাজে প্রকৃতির চেহারা বদলে যাচ্ছে, প্রেমিক প্রেমিকা ঘুরছে, আনন্দ করছে। আমরা তো চাই এমন সুন্দর থাক বছরজুড়ে। কিন্তু তা থাকছে না। ভাঙছে আর ভাঙছে। ক্ষণিকের এক দিনে এক মুহূর্তে একটি দিবসের মাধ্যমেই শেষ হচ্ছে সেই দৃশ্যের। এটা যদি হয় তাহলে কাকে ভালোবাসা বলবো? ভালোবাসার সংজ্ঞা কি? হৃদয়ের যে আবেগ যা সেই সুদূর অতীতকাল থেকে মানুষে মানুষে একত্রিত করে রেখেছে, মায়ায়-মমতায় ধরে রেখেছে, একজনের বিপদে অন্যজনকে সামনে এনেছে, কারো হাত পরম নিশ্চিন্তে অন্য কারো হাতে ছেড়ে দিয়েছে তাই ভালোবাসা।
আজ কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না। যাকে ভালোবাসি বলে বিশ্বাস করছি, সেই তাকেই পরক্ষণে আবার সন্দেহ করছি-আরও সম্পর্ক আছে বলে অথবা সে আমার সাথে প্রতারণা করতে পারে বলে এই ভালোবাসার গুরুত্ব কতটুকু। যাকে সম্পর্ক বলে গণ্য করছি তা আদৌ সম্পর্ক কি না তা নিয়েই ভাবতে সময় পার হয়ে যাচ্ছে অনেকটা। এক্ষেত্রে সবাই যুগের কথা বলে অজুহাত দেখানো চেষ্টা করেন। কিন্তু এই যুগের দায় আসলে আমাদেরই। আমরাই বিশ্বাস ভাঙতে ভাঙতে যুগটাকে আজকের পর্যায়ে নিয়ে এসেছি যে একটি দিবস ছাড়া ভালোবাসা প্রায় উধাও একটি বস্তুতে পরিণত হয়েছে।
ভালোবাসা দিবসের এই দিনেও কি কারো স্বপ্নের ভালোবাসার অপমৃত্যু ঘটবে না তার কি গ্যারান্টি আছে। হরহামেশাই তো প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে ধর্ষণ বা গণধর্ষণের মতো জঘণ্য ঘটনাগুলো ঘটছে। ভালোবাসি বলে বিশ্বাস করেই তো এই নৃশংস ঘটনাগুলো ঘটছে। সেন্ট ভ্যালেন্টাইনসের কাছ থেকে যে ভালোবাসা দিবস আমরা আজ পালন করছি সেই ভালোবাসা থেকে সমাজ অনেক দূরে সরে গেছে। ভালোবাসা আজ কেবলই লৌকিকতা। অথচ ভালোবাসা অন্তরের বিষয় কোনো লৌকিকতা নয়। কোনোদিন ছিলও না। আমার ভালোবাসা প্রকাশ পাওয়া উচিত আমার কাজে।
ভালোবাসা বিহীন একটি দিনও পৃথিবীর কাটানো সম্ভব নয়। ভালোবাসার বিপরীতে থাকে ঘৃণা। ঘৃণার্ত জীবন নরকের সমান। পৃথিবীর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণী ভালোবাসার প্রত্যাশা করে। ভালোবাসা আছে বলেই আজও বন্ধন আছে। আর বন্ধন আছে বলেই মানব জাতি টিকে আছে। মানুষ মানুষকে ভালোবাসে। মানুষ পৃথিবীর প্রতিটি জীবকেও ভালোবাসে। এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে ভালোবাসার রকমে পরিবর্তন এসেছে। সেটা অন্য ব্যাপার। তবু ভালোবাসা আছে। ভালোবাসা থাকবে যতকাল টিকে থাকবে পৃথিবী নামক এই গ্রহ। ভালোবাসা দিবসের আগের সপ্তাহ জুড়েই যেন ভালোবাসা দিবস। এই সাতটি দিন হয়ে উঠুক আপন জনের।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
আরও পড়ুন
ইতিহাসে বিশ্ব নেতাদের আলোচিত উত্থান, পতন ও পরিসমাপ্তি
বিশ্বের কোন দেশে ভোটিং পদ্ধতি কেমন
কেএসকে