আসলাম-সারোয়ারের সংসদে যোগদান ঝুলে আছে আদালতে
বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরী ও সারোয়ার আলমগীর/ফাইল ছবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের (এমপি) গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ অনুষ্ঠিত হয় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। তবে আদালতের আদেশে চট্টগ্রামের দুটি আসনের ফল ঘোষণা করা হয়নি। যদিও আসন দুটিতে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন। কিন্তু আইনি জটিলতায় তাদের ফলাফল স্থগিত রাখা হয়েছে।
আসন দুটি হলো চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) ও চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড)। এই দুটি আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা হলেন যথাক্রমে সরোয়ার আলমগীর ও মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী। এই আসন দুটির নির্বাচনের ফলাফল ও গেজেট কখন প্রকাশ করা হবে তা নির্ভর করছে আদালতের আদেশের ওপর।
নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ অনুষ্ঠিত হয় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। তবে আদালতের আদেশে চট্টগ্রামের দুটি আসনের ফল ঘোষণা করা হয়নি। যদিও আসন দুটিতে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন। কিন্তু আইনি জটিলতায় তাদের ফলাফল স্থগিত রাখা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে করা লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই দুই আসনের ফল স্থগিত থাকবে বলে আদেশ দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ফলে বিএনপি থেকে মনোনীত দুই প্রার্থী বিজয়ী হলেও তাদের ফলাফল ও গেজেট প্রকাশ করা হয়নি। তারা নিতে পারেননি শপথও।
আরও পড়ুন
আসলাম চৌধুরী ও সারোয়ার আলমগীরের ধানের শীষে ভোট করতে বাধা নেই
ভোটে বিজয়ী হলেও তাদের ‘ভাগ্য নির্ধারণ’ হবে আদালতে
চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বাতিল
ফটিকছড়িতে বিপুল ভোটে জয়ী বিএনপির সরওয়ার আলমগীর
চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর মনোনয়ন বৈধ
যদিও গুঞ্জন রয়েছে চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর ঋণখেলাপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আসনটিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকীর সমঝোতার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। জামায়াত ও বিএনপির প্রার্থীর আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
এদিকে নির্বাচনে বিজয়ী হলেও মূলত চারজন প্রার্থীর ফলাফল স্থগিত থাকবে বলে আদেশ দিয়েছিলেন আদালত। এর মধ্যে পরে দুজনকে সংসদ সদস্য হিসেবে বিজয়ী ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ ও শপথ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়েছে। তারা হলেন—শেরপুর-২ আসনের ফাহিম চৌধুরী ও কুমিল্লা-১০ আসনের প্রার্থী মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেন তারেক রহমানসহ বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা/ছবি: সংগৃহীত
বাকি দুই আসনের প্রার্থীর গেজেট ও শপথ এখনো আটকে আছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আদেশের অপেক্ষায়। এখন দেখার পালা সেই অপেক্ষার প্রহর কবে শেষ হয়।
যা বলছেন আসলাম চৌধুরীর আইনজীবীরা
চট্টগ্রাম-৪ আসনের প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর পক্ষে সিনিয়র কাউন্সিলর হিসেবে আইনি লড়াইয়ে নিয়োজিত সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মো. আহসানুল করিম জাগো নিউজকে বলেন, চট্টগ্রাম-৪ আসনের প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর মামলাটি অবকাশ শেষে সুপ্রিম কোর্ট খোলার পর শুনানির চেষ্টা করবো। এ সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো সমঝোতার আলোচনা হয়নি। তবে আমরা মামলাটি নিয়ে আশাবাদী।
আসলাম চৌধুরীর অন্যতম আইনজীবী রুকন উদ্দিন মো. ফারুক জাগো নিউজকে বলেন, খেলাপি ঋণের সংশ্লিষ্ট ব্যাংক (যমুনা) ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকীর সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ সংক্রান্ত বিষয়ে সমঝোতার আবেদন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানির জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে। যদিও এ সংক্রান্ত বিষয়ে আপিল আবেদনের ওপর শুনানির জন্য আগামী ২৮ এপ্রিল দিন নির্ধারিত রয়েছে।
আবেদনকারীদের পক্ষের আইনজীবী আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী জাগো নিউজকে জানান, হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী ও যমুনা ব্যাংক পৃথক লিভ টু আপিল করেছিলেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েও আসলাম চৌধুরীর গেজেট কিংবা শপথ কোনোটিই হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানির পর বিষয়টি নিষ্পত্তি হলে তার শপথ নেওয়া না নেওয়ার বিষয়টি সামনে আসবে।
খেলাপি ঋণের সংশ্লিষ্ট ব্যাংক (যমুনা) ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকীর সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ সংক্রান্ত বিষয়ে সমঝোতার আবেদন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানির জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে। —রুকন উদ্দিন মো. ফারুক, আসলাম চৌধুরীর অন্যতম আইনজীবী
চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল রেখে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে করা লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) মঞ্জুর করেছেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগ গত ৩ ফেব্রুয়ারি এ আদেশ দেন।
হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী ও যমুনা ব্যাংক পৃথক লিভ টু আপিল করে।
আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন জানান, আপিল বিভাগ লিভ মঞ্জুর করেছেন। আদালত বলেন, আসলাম চৌধুরী নির্বাচন করতে পারবেন। কিন্তু ফলাফলটা আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে, ফলাফল গেজেটে আকারে প্রকাশ হবে না।
আরও পড়ুন
৩ আসনের ফল ঘোষণা করবে না ইসি
মনোনয়ন বৈধ করলাম, ব্যাংকের টাকাটা কিন্তু দিয়ে দিয়েন
শপথ নিলেন বিএনপির নবনির্বাচিত এমপিরা
এর আগে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা গত ৩ জানুয়ারি আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বৈধ ঘোষণা করেছিলেন। তবে তার বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে ঋণখেলাপির অভিযোগ এনেছিলেন জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী। পরে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকও পৃথক আপিল করে।
শুনানি নিয়ে গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন দুটি আবেদনই খারিজ করে। ফলে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল থাকে। পরে ইসির সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আনোয়ার সিদ্দিকী ও ব্যাংক পৃথক রিট করে। গত ২৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট রিট খারিজ করে দেন। এক্ষেত্রেও আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল থাকে।
পরে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আনোয়ার সিদ্দিকী ও সংশ্লিষ্ট যমুনা ব্যাংক আপিল বিভাগে আবেদন করেন, যা গত ২৯ জানুয়ারি চেম্বার আদালতে শুনানির জন্য ওঠে। সেদিন চেম্বার আদালত আবেদনটি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান।

সুপ্রিম কোর্ট, ফাইল ছবি: জাগো নিউজ
এর মধ্যে হাইকোর্টের আদেশের প্রত্যায়িত অনুলিপি পেয়ে আনোয়ার সিদ্দিকী লিভ টু আপিল করেন। লিভ টু আপিল ও ব্যাংকের করা আবেদনের ওপর শুনানি শেষে ফলাফল স্থগিতের আদেশ দেন আপিল বিভাগ।
শপথ নিতে পারছে না সারোয়ারও
চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা ফিরিয়ে দিতে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে জামায়াতের প্রার্থীর করা লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ গত ৩ ফেব্রুয়ারি এ আদেশ দেন।
আদেশের পর সারোয়ার আলমগীরের আইনজীবী আহসানুল করিম জানিয়েছেন, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন সারোয়ার আলমগীর। লিভ মঞ্জুর হওয়ায় আপিলের ওপর শুনানি হবে। আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা যাবে না।
হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিলটি করেছিলেন চট্টগ্রাম-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিন। আপিল বিভাগের আদেশের পর তার আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন বলেন, আপিল বিভাগ লিভ মঞ্জুর করেন। আদালত বলেন, সারোয়ার আলমগীর নির্বাচন করতে পারবেন। কিন্তু ফলাফলটা আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে, ফলাফল প্রকাশিত হবে না।
এর আগে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা সারোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বৈধ ঘোষণা করেছিলেন। তবে তার বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগে ইসিতে আপিল করা হয়েছিল। জামায়াত প্রার্থী নুরুল আমিন অভিযোগটি করেছিলেন।
শুনানি নিয়ে গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন সারোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বৈধতার বিরুদ্ধে করা আপিল মঞ্জুর করেন। এতে তার প্রার্থিতা বাতিল হয়। এর বৈধতা নিয়ে প্রার্থিতা ফিরে পেতে সারোয়ার আলমগীর গত ১৯ জানুয়ারি হাইকোর্টে রিটটি করেন।
গত ২৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট রুল দিয়ে সারোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বাতিলের ইসির সিদ্ধান্ত স্থগিত করেন। একই সঙ্গে তার মনোনয়নপত্র গ্রহণ করতে ও ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দিতে ইসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ আদেশের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেন নুরুল আমিন।
আদালতের নির্দেশে প্রার্থিতা ফিরে পেয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়লাভ করেন সারোয়ার আলমগীর। কিন্তু ঋণখেলাপির অভিযোগে করা লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এমপি হিসেবে তিনিও শপথ নিতে পারছেন না।
এফএইচ/এমএমকে/এমএমএআর