কেন কর্মজীবী মায়েদের জন্য ব্রেস্ট পাম্পিং গুরুত্বপূর্ণ
মা হওয়া জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতা, তবে কর্মজীবী মায়েদের জন্য এটি এক কঠিন যাত্রা। অফিসের চাপ, নির্দিষ্ট সময়সূচি, পরিবারের দায়িত্ব-সবকিছু সামলাতে গিয়ে সন্তানের পুষ্টি ও সুস্থতা নিশ্চিত করা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক এখানেই ব্রেস্ট পাম্পিং মায়েদের জীবনে অপরিহার্য হয়ে ওঠে। যার মাধ্যমে দুধ সংগ্রহ করে শিশুকে খাওয়ানো যায়। কর্মজীবী মায়েদের জন্য ব্রেস্ট পাম্পিং শুধু দুধ সংরক্ষণের কৌশল নয়, তাদের মাতৃত্ব এবং ক্যারিয়ারের ভারসাম্য রক্ষার এক অপরিহার্য সহায়ক।
ব্রেস্ট পাম্পিং কী
ব্রেস্ট পাম্পিং হলো মায়ের স্তন থেকে দুধ সংগ্রহ করার একটি বিশেষ প্রক্রিয়া। এটি হাত বা বৈদ্যুতিক পাম্পের মাধ্যমে করা হয়। পাম্প করার সময় স্তন থেকে দুধ বোতল বা যে কোনো পাত্রে সংগ্রহ করা যায়। পরবর্তীতে শিশুর প্রয়োজন অনুসারে খাওয়ানো যায়। এতে মা সরাসরি স্তন্যদান না পারলেও শিশুর পুষ্টি বজায় থাকে, একইসঙ্গে মা শিশুর জন্য দুধ উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারেন।
২০১৭ সাল থেকে প্রতি বছর ২৭ জানুয়ারি বিশ্ব ব্রেস্ট পাম্পিং দিবস পালিত হয়ে আসছে। ব্রেস্ট পাম্প করা মায়েদের কষ্ট, উৎসর্গ এবং ভালোবাসাকে স্বীকৃতি ও সম্মান জানাতে দিবসটি পালিত হয়। বিশেষ করে কর্মজীবী মায়েদের কাজের প্রতি সমর্থন ও সচেতনতা বৃদ্ধিই এই দিবসের মূল লক্ষ্য। এছাড়া এই দিনটি স্তন্যপান করানোর বিকল্প পথ হিসেবে পাম্পিংকে উৎসাহিত করে।

জেনে নিন কেন কর্মজীবী মায়েদের জন্য ব্রেস্ট পাম্পিং গুরুত্বপূর্ণ-
১. শিশুর পুষ্টি ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত
মায়ের দুধ শিশুদের জন্য সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ খাবার। কর্মজীবী মা হিসেবে, সরাসরি স্তন্যদান সবসময় সম্ভব হয় না। তাই ব্রেস্ট পাম্পিংয়ের মাধ্যমে মা শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় দুধ সংরক্ষণ করতে পারেন। পরে শিশুর প্রয়োজন অনুসারে তা খাওয়ানো যায়। এতে সঠিক সময়ে শিশু দুধ পান। এতে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের কোনো সমস্যা হয় না।
২. দুধের উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য
দুধের উৎপাদন ঠিক রাখার জন্য মায়ের স্তন নিয়মিত খালি করতে হবে। তবে কর্মজীবী মায়েরা অফিস বা কাজের কারণে সরাসরি স্তন্যদান করতে না পারেন। তাই পাম্পিংয়ের মাধ্যমে আগেই দুধ সংরক্ষণ করলে উৎপাদন বজায় রাখে। একইসঙ্গে মায়ের স্বাস্থ্যও ঠিক থাকে, কারণ দুধ জমে গেলে স্তন ব্যথা বা সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
৩. মা ও সন্তানের মধ্যে সংযোগ বজায় রাখে
স্বাভাবিকভাবে অনেকেই ভাবেন, সরাসরি খাওয়ানোর বিকল্প হিসেবে পাম্প করা দুধ মা ও সন্তানের মধ্যে কম সংযোগ তৈরি করে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে যে কোনো মাধ্যমেই খাওয়ানো হোক না কেন শিশুর কাছে মায়ের দুধই সবচেয়ে নিরাপদ। তাই দুধ বোতলে দিলেও শিশুর জন্য এটি মানসিক এবং শারীরিক সুরক্ষা দেয়।

৪. কাজ ও মাতৃত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা
একজন কর্মজীবী মা দিনে অনেক কাজ সামলান অফিসের চাপ, পরিবারের দায়িত্ব, শিশুর যত্ন। পাম্পিং তাদের সময় পরিকল্পনায় সহায়তা করে। অফিসে বা যে কোনো কাজের ফাঁকে সুবিধাজনক সময়ে পাম্পিং করে দুধ সংরক্ষণ করা যায়। এটি মায়েদের জন্য কর্মক্ষেত্র ও মাতৃত্বের ভারসাম্য রক্ষা করার একটি কার্যকর উপায়।
৫. মানসিক চাপ কমায়
কর্মজীবী মায়েদের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হচ্ছে শিশুর দুধ খাওয়ানো নিয়ে। কারণ বেশিরভাগ কর্মস্থলে দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা নেই, আর থাকলেও কাজের চাপের কারণে সঠিক সময়ে তা শিশুকে খাওয়ানো হয় না। তবে যখন মা জানেন যে শিশুর দুধ সংরক্ষিত আছে, তখন মানসিক চাপ কমে যায়। একই সঙ্গে কাজের প্রতি মনোযোগ বাড়ে। এটা মায়ের মানসিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৬. স্বাস্থ্যগত সুবিধা প্রদান
পাম্পিং শুধু শিশুর জন্য নয়, মায়ের স্বাস্থ্যেও ভালো প্রভাব ফেলে। দুধ পাম্প করার মাধ্যমে স্তনে জমে থাকা দুধ বের হয়, যা স্তনের ব্যথা কমায় এবং সংক্রমণের ঝুঁকি হ্রাস করে। এছাড়া এটি মায়ের দেহকে ধীরে ধীরে শারীরিকভাবে পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করে। তাই কর্মজীবী মায়েদের জন্য পাম্পিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

৭. ক্যারিয়ার সচল রাখতে সহায়ক
কর্মজীবী মায়েদের অনেকেই ব্রেস্টফিডিংয়ের কারণে চাকরির সময় নিয়ে সমস্যায় পড়েন। পাম্পিং তাদের চাকরির চাপ ও মাতৃত্বের দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতে সাহায্য করে। অফিসেও সংরক্ষিত দুধ ব্যবহার করে শিশুর জন্য পুষ্টি নিশ্চিত করা যায়। এতে অফিসের কাজ ও সময় নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা করতে হয় না।
৮. ভবিষ্যতের জন্য সুরক্ষা তৈরি করে
পাম্পিংয়ের মাধ্যমে দুধ সংরক্ষণ করা শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের জন্যও সুরক্ষা দেয়। কখনো অসুস্থতার কারণে বা অনিয়মিত সময়সূচিতে সরাসরি স্তন্যদান সম্ভব হয় না। এতে সংরক্ষিত দুধই শিশুর পুষ্টির মূল উৎস হয়ে দাঁড়ায়। যা মা ও শিশুর জন্য একটি নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করে।
কর্মজীবী মায়েরা প্রতিদিন অসংখ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। তাদের দায়িত্ব শুধু ক্যারিয়ার নয়, সন্তানের পুষ্টি ও সুরক্ষাও। ব্রেস্ট পাম্পিং এই চ্যালেঞ্জগুলোকে সামলানোর একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এটি শুধু দুধ সংরক্ষণ নয়, বরং শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক দিক থেকে মায়ের জন্য সহায়ক।
আরও পড়ুন
পিসিওএস রোগীরা যে ধরনের খাবার খাবেন
বিয়ের আগে যাদের জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খেতে হয়
কেএসকে