হাসান আজিজুল হকের ছোটগল্প: জীবনের নির্মোহ উচ্চারণ
অনন্য কাওছার
রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের অবিসংবাদিত কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক (১৯৩৯-২০২১)। ষাটের দশকের গদ্যশৈলীর বাঁক বদলের রূপকার হিসেবেও স্বনামখ্যাত। তিনি ছোটগল্পের রাজপুত্র। যবগ্রামে বেড়ে উঠতে দেশভাগের মর্মন্তুদ ট্রাজেডির স্বাক্ষী হয়েছেন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়াবহ দৃশ্যের মুখোমুখি হয়েছেন নির্মমভাবে, পরবর্তীতে এই উদ্বাস্তু জনমানুষের বেদনাবোধ রচনাশৈলীতে নির্মাণ করেছেন আমৃত্যু। পরিশীলন গদ্যের শৈল্পিক রূপায়নে সিংহভাগ গল্পের হৃদপিণ্ডে অঙ্কিত হয়েছে দেশভাগ, রাঢ়বঙ্গীয় জনজীবনের অসংগতি, দাঙ্গা, শ্রেণিসংগ্রাম ও শাসন-শোষণের বেদনার্ত উপাখ্যান। গদ্যের মর্মমূলে উঁকিঝুঁকি দেয় উদ্বাস্তুজীবন, উৎখাত ও বঞ্চনার প্রতীকী উচ্চারণ।
ষাটের দশকের পূর্বতন গল্পের উপকরণে প্রেমাবেগের তীব্রতা, একমুখী নির্মাণশৈলীর প্রবণতা অধিক পরিমাণে প্রচলিত ছিল। সেই একঘেয়ে আঙ্গিক পরিবর্তন করে ভিন্ন ও বহুমাত্রিক আঙ্গিকে নির্মাণ করেছেন গল্পের শরীর। বিষয়বৈচিত্র্যে ও অকৃত্রিম সংলাপে গভীর দার্শনিক উৎকর্ষতা উন্মোচিত হয়। শব্দকুশলী, রূপাশ্রিত প্রতীকী ব্যঞ্জনা ও স্বাতন্ত্র্যিক রচনাশৈলীর ভাঙা-গড়ার মাধ্যমে হাসান আজিজুল হকের সদর্পে পদচারণ।
দেশভাগের মর্মন্তুদ হাহাকার রক্তমাংসে পীড়নপূর্ণ অভিঘাত সৃষ্টির ফলে গদ্যশৈলীর পরতে পরতে নির্মোহ উচ্চারণ ও বেদনাবিধুর সংলাপ জীবন্ত বীজের মতো সজীব উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কোথাও উদ্ভাসিত হয়েছে জনজীবনের দুর্ভোগ, দুর্মোচ্য ট্রাজিক দৃশ্য। আবার কোথাও ফুটে উঠেছে বাঙালির অবক্ষয়ের কালো অধ্যায়, শাসন-শোষণের দৌরাত্ম্যের পদচিহ্ন এঁকেছেন বহুমাত্রিক আঙ্গিকে। গ্রামীণ চরিত্রচিত্রণ ও আঞ্চলিক সংলাপে কোথাও কোথাও পরিব্যাপ্ত হয়েছে সমকালীন প্রেক্ষাপটের জীবনবাস্তবতা।
হাসান আজিজুল হকের ছোটগল্পের নির্মাণশৈলী ও বহুরৈখিক প্রতীকী রূপায়ন একেকটা চরিত্রচিত্রণে অসামান্য কৃতিত্বের পরিচায়ক। এ ছাড়া যেসব বীভৎসতা প্রকট হয়ে উঠেছিল হাসান আজিজুল হকের ছোটগল্পের নিভাঁজ দৃশ্যে-সংলাপে; তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে উদ্বাস্তুজীবন ও নিম্নবর্গ জনমানুষের শ্রেণিসংগ্রাম। উদ্বাস্তু, দিশেহারা মানুষের শোচনীয় পরিণতির নেপথ্যে ছিল দেশভাগ। আমাদের কারোরই অজ্ঞাত নয় যে, দেশভাগের তীব্র হলাহল ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ট্রাজিক অধ্যায়। এটিই যেন হাসান আজিজুল হকের গল্পের হৃৎপিণ্ডে জীবন্ত হয়ে উঠেছে প্রতিবার।
অবশ্য, দেশভাগের লেলিহান বিভীষিকা ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তাঁর গদ্যের নৈপুণ্যে উচ্চকিত হয়েছে বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায়। এ ছাড়া পচনশীল সমাজচিত্র, রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক, দাঙ্গার নৃশংসতা চোখের আড়ালে থাকেনি। তিনি সেগুলোও গল্পের ভাঁজে নীলপদ্মের মতো চিত্রিত করেছেন। বিশেষত রাঢ়বঙ্গ অঞ্চলের জীবনযন্ত্রণা এবং নারী চরিত্রের দুর্মোচ্য ট্রাজিক গল্পকারের অন্তর্লোকে বিভীষিকার তাণ্ডব চালিয়েছে বারবার। তিনি এ সমস্ত দুর্দহনে পীড়িত হয়ে নির্মাণ করেছেন অজস্র মানুষের পীড়নপূর্ণ অভিঘাতের মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনার খণ্ডচিত্র। মূলত সেগুলো পরবর্তীতে হাসান আজিজুল হকের কলমের শৈল্পিক আঁচড়ে হয়ে উঠেছে ‘শকুন’, ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’, ‘আমৃত্যু আজীবন’, ‘জীবন ঘষে আগুন’, ‘খাঁচা’, ‘শোণিত সেতু’ ইত্যাদি।
হাসান আজিজুল হকের আত্মপ্রকাশ বা নাক্ষত্রিক উদয়ন ‘শকুন’ গল্পের মাধ্যমে। সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকায় ১৯৬০ সালে গল্পটি প্রকাশিত হলে সাহিত্যমহলে পরিচিতি আসে। গদ্যশৈলীর চমৎকারিত্বে পাঠকের অন্তর্লোক দখলে নিয়েছেন অবলীলায়। বহুমাত্রিক আঙ্গিকে লিখেছেন নানাবিধ গল্প। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য গল্পগুলোর একটি ‘শকুন’। রাঢ়বঙ্গের একদল কিশোরের নাটকীয় কর্মকাণ্ডের গভীরে গল্পকার উন্মোচন করেছেন অবক্ষয়ের কালো অন্ধকার। বাঙালির সমাজদর্পণের বাস্তবিক রূপায়ন ‘শকুন’ গল্পের দিকে তাকালেই উপলব্ধি করা যায়।
আরও পড়ুন
লেখার ভাবনা কখনো ছেড়ে যায় না: পাপড়ি রহমান
বশির আহমেদ: সংগীতের এক কিংবদন্তি নাম
গল্পটিতে কেবল সুদখোর অঘোর বোষ্টমের শোষণের লোলুপতা অঙ্কিত হয়নি, বহুমাত্রিক প্রতীকী ব্যঞ্জনায় ফুটে উঠেছে গোটা বাঙালির অবক্ষয়ের নিরেট জীবনবাস্তবতা। অন্যদিকে রাঢ়বঙ্গীয় কাদু শেখের বিধবা বোন আর জমিরুদ্দির অবৈধ যৌনমিলনে বিবর্জিত সদ্যোজাত শিশুটির মৃতদেহ মরা শকুনের পাশেই। সবাই দেখতে এলেও কাদু শেখের বিধবা বোন আসে না। লম্পট চরিত্রে দাঁড়িয়ে থাকে জমিরুদ্দি। নারীদের অসহায়ত্বের সুযোগে কীভাবে বিভীষিকাময় হয়ে ওঠে পৃথিবী, বাঙালি জনজীবনের বাস্তবিক চরিত্রচিত্রণ করেছেন হাসান আজিজুল হক।
‘শকুন’ গল্পটি বহুমাত্রিক আঙ্গিকের প্রতীকী নির্মাণ। গল্পভাষ্যের একঝলক: ‘ন্যাড়া বেলতলা থেকে দূরে প্রায় সকলের চোখের সামনেই গতরাতের শকুনটা মরে পড়ে আছে। মরার আগে সে কিছু গলা মাংস বমি করেছে। কত বড়ো লাগছে তাকে! ঠোঁটের পাশ দিয়ে খড়ের টুকরো বেরিয়ে আছে। দলে দলে আরো শকুন নামছে তার পাশেই। কিন্তু শকুন শকুনের মাংস খায় না। মরা শকুনটার পাশে পড়ে রয়েছে অর্ধস্ফুট একটি মানুষের শিশু।’
‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গল্পের পটভূমিতে দেশভাগের দগদগে ক্ষতের পীড়নপূর্ণ অভিঘাত চিত্রায়িত হয়েছে। সাতচল্লিশের উদ্বাস্তু জনজীবনের যন্ত্রণাবোধ গল্পের কলেবরে নীলোজ্জ্বল। করবী গাছের প্রতীকী রূপায়নে দেশভাগের মর্মন্তুদ ট্রাজেডি ও নারী চরিত্রের অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে পুঙ্খানুপুঙ্খ। অনবদ্য রচনাশৈলীর মর্মমূলে করবী গাছের বহুমুখী চিত্রকল্পের সংমিশ্রণে গল্পটি হয়ে উঠেছে বাঙালি জনজীবনের নির্মোহ উচ্চারণ।
গল্পের প্রারম্ভে প্রকৃতিসিদ্ধ কাব্যিক উপস্থাপন পাঠকের অন্তর্লোকে কৌতূহল উদ্রেক করে অবলীলায়। গল্পটি প্রথমে লিখতে গিয়ে হাসান আজিজুল হকের মনে হয়েছিল সমরেশ বসুর গল্পের আদলে হয়ে যাচ্ছে। তাৎক্ষণিক ফেলে দিয়েছেন। পরবর্তীতে গদ্যশৈলীর স্বকীয়তা টেনে নির্মাণ করেছেন ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’। গল্পভাষ্য: ‘এখন নির্দয় শীতকাল, ঠাণ্ডা নামছে হিম, চাঁদ ফুটে আছে নারকেল গাছের মাথায়। অল্প বাতাসে একটি বড়ো কলার পাতা একবার বুক দেখায় একবার পিঠ দেখায় ওদিকে গঞ্জের রাস্তার মোড়ে রাহাত খানের বাড়ির টিনের চাল হিম ঝক ঝক করে।’
তিনি দেশভাগের মর্মবেদনা গল্পের হৃৎপিণ্ডে অঙ্কিত করেছেন ভাষা নৈপুণ্যে। করবী গাছের মর্মমূলে উদ্বাস্তু দারিদ্র্যপীড়িত একজন নিরীহ বৃদ্ধ পিতার হাহাকার ও আত্মজার অসহায়ত্বের নির্মম বাস্তবতা গল্পকার তুলে এসেছেন। এটি কেবল আত্মজার নিয়তিখর্ব ট্রাজেডি নয়, গোটা বাঙালি নারীদের অলিখিত যন্ত্রণা শৈল্পিকভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন গল্পকার। গ্রামীণ পটভূমিতে সাতচল্লিশের দেশভাগে বাস্তবতার নিরিখে নির্মিত গল্পই ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’। বৃদ্ধের রোপিত করবী গাছটি যেন বিষবৃক্ষ হয়ে দেশভাগের উদ্বাস্তু জীবন সংগ্রামের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। রুকু চরিত্রটি বাঙালি নারীদের অসহায়ত্বের প্রতীক। বৃদ্ধের কণ্ঠে বেদনার তর্জমা: ‘আমি একটি করবী গাছ লাগাই বুঝলে? ...বিচির জন্যে, বুঝেছ, করবী ফুলের বিচির জন্যে। চমৎকার বিষ হয় করবী ফুলের বিচিতে।’
হাসান আজিজুল হকের গল্পের হৃৎপিণ্ডে বেদনার উপাখ্যান, বাঙালি জনজীবনের নির্মোহ উচ্চারণ, গ্রামীণ সমাজের নিরিখে সমাজবাস্তবতা, দেশভাগের মর্মন্তুদ ইতিহাস, নারীদের অসহায়ত্ব ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উচ্চকিত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে। সত্তরের দশকে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য গল্পের কলেবর। তিনি ছোটগল্পের জগতে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে আজও প্রাসঙ্গিক, স্বমহিমায় প্রোজ্জ্বলিত।
এসইউ