ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. সাহিত্য

বাংলা নববর্ষের সংস্কৃতি ও কবিতালাপ

সাহিত্য ডেস্ক | প্রকাশিত: ০৯:৩২ এএম, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

মোমিন মেহেদী

নিমগ্ন ভালোবাসা-সুন্দর আর সৃজনশীলতার জন্য নতুন করে সুখ-শান্তি আর সমৃদ্ধির প্রত্যাশায় প্রিয় বাংলায় বাংলা নববর্ষ উদযাপনের যে চিত্র দেখা যায়, সেই চিত্র তৈরি হওয়ার ইতিহাস সরল-স্বচ্ছ ও সুন্দরের উদাহরণ। আর এই উদাহরণ নির্মিত হয়েছে মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে। বাংলা সন গণনা শুরু হওয়ার পর খাজনা আদায়ের পর যে উৎসব থেকে বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিল, তাও এই বিশ্বব্যাপী আলোচিত আকবরের আমলে। তা সময়ের সাথে সাথে বিবর্তিত হয়ে বর্তমান রূপ লাভ করেছে। এই ধারাবাহিকতায় কখনো আগের বিভিন্ন নিয়ম বাদ দেওয়া হয়েছে, আবার কখনো নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে এই উৎসবের সাথে।

বিভিন্ন সময়ে বাংলা নববর্ষ উদযাপন বাঙালির প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর আইয়ুব খানের আমল এবং আশির দশকের শেষের দিকে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা ছিল বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতেও পাওয়া যায় মিল এভাবে, সম্রাট আকবর তার রাজত্বে খাজনা তোলার প্রক্রিয়া সহজ করতে ১৫৮৪ সালের ১০ বা ১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন। নতুন সনটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ফসলি সন’। পরে যা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিতি পায়।

আরেক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলা সন প্রবর্তনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তৎকালীন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ও চিন্তাবিদ ফতেউল্লাহ সিরাজীকে। তিনি সৌর সন ও আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে বাংলা সন ও তারিখ নির্ধারণ করেন। আর এই ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকার নাম দেওয়া হয় ‌‌‘তারিখ-ই-এলাহী’। এই পুরো কাজটি করা হয়েছিল ফসল উৎপাদনের ঋতুচক্রের সাথে সামঞ্জস্য রেখে। যাতে ফসল ওঠার সময়টাতেই খাজনা আদায় করা যায়। এমন নিরন্তর বাংলা নববর্ষ সব সময় আলোর পথ ধরে এগিয়েছে ছন্দিত তানে আর গানে।

সেই সাথে কবিতায়ও উঠে এসেছে অমোঘ উচ্চারণ। যেমন কবি সুনির্মল বসু তাঁর ‘বৈশাখী ভোর’-এ লিখেছেন, ‘পূব-আকাশের কালো পর্দায়/ সোনালী-সবুজে-নীলে-জর্দায়/ আলোকের সমাবেশ;/ চৈত্র-রজনী শেষ।’ অবশ্য সুন্দরের প্রতিধ্বনিময় অনন্য এ কবিতা স্মরণ করিয়ে দেয় সেই ইতিহাস। যেখানে দেখা গেছে, কৃষকেরা চৈত্রমাসের শেষদিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূ-স্বামীর খাজনা পরিশোধ করতেন। এর পরের দিন অর্থাৎ বৈশাখ মাসের প্রথম দিন ভূ-স্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ উপলক্ষে তখন মেলা বসতো। আয়োজন করা হতো নানা অনুষ্ঠানের।

সম্রাট আকবরের অনুকরণে সুবেদার ইসলাম চিশতি তার বাসভবনের সামনে প্রজাদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ ও বৈশাখী উৎসব পালন করতেন। এ উপলক্ষে খাজনা আদায় ও হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি মেলায় গান-বাজনা, গরু-মোষের লড়াই, কাবাডি খেলা হতো। ছবি তোলার জন্য রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো ফারিয়াকে। আগে অবশ্য বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। এটি পুরোটাই অর্থনৈতিক এবং গ্রামে-গঞ্জে ব্যবসায়ীরা নতুন বছরের শুরুর দিনে তাদের পুরোনো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষে তারা তাদের নতুন-পুরোনো খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি মুখ করাতেন। এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে এসে অনেক খদ্দের তাদের পুরোনো দেনার পুরোটা বা কিছু অংশ শোধ করে নতুন খাতায় হিসাব হালনাগাদ করতেন।

সেই সময় বাঙালি সংস্কৃতির সাথে জড়িত একটি বিষয় ছিল বিদায় বা বর্ষ বিদায়। আর এর জন্য প্রতিমাসের শেষে একটি সংক্রান্তি পালন করার রীতিও বহু বছর আগে থেকেই চালু ছিল। বাংলা মাসের নামকরণ করা হয়েছিল নক্ষত্র অনুযায়ী। নববর্ষে চৈত্র মাস বা চিত্রা নক্ষত্র থেকে বৈশাখ বা বিশাখা নক্ষত্রে গমন বা সংক্রমণই হচ্ছে চৈত্র সংক্রান্তি। প্রতি মাসেই এ সংক্রমণ ঘটে। যেমন বাঙালি সংস্কৃতিতে পৌষ সংক্রান্তি এখনো উদযাপন করা হয়। কিন্তু প্রতি মাসে সব সংক্রান্তি পালন করাটা বাঙালিদের জন্য ঝামেলার হয়ে যায় অর্থনৈতিক কারণে। যেমন কার্তিক মাসে কার্তিক সংক্রান্তি পালন করা হতো না। কারণ ওই সময় অভাব থাকতো। সবচেয়ে বেশি চৈত্র সংক্রান্তি পালন করা হয়েছে। যেহেতু এ সময় পুরো একটি বছর শেষ হয়ে গিয়ে নতুন একটি বছর আসে।

চলতে চলতে ইতিহাস বলতে বলতে যখন নিরেট কাব্যচর্চার কথা মনে পড়ে; তখনই ভেসে ওঠে স্মৃতিপটে এমন নির্মল উচ্চারণ, ‘ঘর ছেড়ে আমি চলি মাঠ-পারে,/ পল্লীপ্রান্তে নদীটির ধারে।/ ঝুরি-নামা বুড়ো বটগাছ-তলে/ বয়ে যায় নদী কল-কল্লোলে;/ তারি তীরে অতি পুরাতন ঘাট,/ চারিধারে তার ধরিয়াছে ফাট;/ দূবো-ঘাস আর সবজে পানায়/ ভরে আছে তার কানায় কানায়।’

কবি বয়ে চলেন কাব্যজীবন নৌকায় চরে। আর সেই কবিতা গড়গড় করে বলে অধির আগ্রহে হন্যে হয়ে ছোটা বৈশাখের কথা। যে বৈশাখ আসার আগে চৈত্র সংক্রান্তি আসে সুখজ আশায়। এই চৈত্র সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে যে মেলা হতো এবং তাতে জনগণের যে অংশগ্রহণ হতো, তা চৈত্র মাসের শেষ দিন ছাপিয়ে পরের বৈশাখ মাস বা পরের বছরের প্রথম দিনগুলোতেও থাকতো। চৈত্র সংক্রান্তির এ মেলাকে মূলত সর্বজনীন লোকজ মেলা বলা হতো। স্থানীয় কৃষিজাত পণ্য, কারুপণ্য, হস্ত ও মৃৎ শিল্প, কুটির শিল্পজাত সামগ্রী, লোকজ খাবার যেমন- চিড়া, মুড়ি, খৈ, বাতাসা, বিভিন্ন রকমের মিষ্টি ছিল এসব মেলার মূল আকর্ষণ।

এ ছাড়া বিনোদনের অংশ হিসেবে থাকতো যাত্রা, পালাগান, কবিগান, জারিগান, গম্ভীরা গান, গাজীর গান ইত্যাদি। তবে সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে মেলারও পরিবর্তন ঘটে। বর্তমানে শহর বা গ্রামাঞ্চলে চৈত্র সংক্রান্তির মেলার পাশাপাশি বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। জানা যায়, ‘মুসলিম শাসনের ৫০০ বছর থেকেই এটি শুরু হয়েছে। এরপরের ইংরেজ আমলের পৌনে দুইশ বছরে সংক্রান্তি থেকে নববর্ষের দিকে উদযাপিত হয়েছে। তারপরে পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরে এটি সাংস্কৃতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। সেখানে ম্লান হয়ে গেছে চৈত্র সংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখই উদযাপনটিই মুখ্য হয়ে উঠেছে।’

বাঙালি জীবনের সর্বজনীন একটি উৎসব হলো পহেলা বৈশাখ, বর্ষবরণের দিন, শুভ নববর্ষ। দিনটি প্রত্যেক বাঙালির জীবনে নিয়ে আসে উৎসব আমেজ আর ফুরফুরে বাতাসের দিন বসন্ত। আল্পনা আঁকা শাড়ি আর পাঞ্জাবি ছাড়া যেন এ দিনটিকে আর পালন করাই যায় না। সঙ্গে লাল সবুজ আর সাদার মিশেলে হাতে, গালে ফুলকি আঁকা এখন হালফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছরই ক্রমশ বাড়ছে বর্ষবরণের আমেজ। স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের সরাসরি সম্প্রচার, রমনার বটমূল থেকে পুরো ঢাকা হয়ে প্রতিটি বিভাগীয় শহর, জেলা শহর, উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামে গ্রামে পালন করা হয়। শুধু গ্রাম নয়, শহর-উপশহর রাজধানী ঢাকারও বিভিন্ন অলিগলিতে বসে বৈশাখী মেলা। পান্তা-ইলিশ, বাঁশি, ঢাক-ঢোলের বাজনায় আর শোভাযাত্রায় পূর্ণতা পায় বাঙালির উৎসবমুখরতা।

শুনলে অবাক হবেন, বাংলা মাসের নামগুলো বিভিন্ন তারকার নাম থেকে নেওয়া হয়েছে। যেমন- বিশাখা থেকে বৈশাখ, জেষ্ঠ্যা থেকে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়া থেকে আষাঢ়, শ্রবণা থেকে শ্রাবণ, ভাদ্রপদ থেকে ভাদ্র, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক, অগ্রইহনী থেকে অগ্রহায়ণ, পূষ্যা থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, ফল্গুনি থেকে ফাল্গুন এবং চিত্রা থেকে চৈত্র। আগেকার দিনে অগ্রহায়ণ মাসে ধান কাটা শুরু হতো বলে এ মাসকে বছরের প্রথম মাস ধরা হতো। তাই এ মাসের নামই রাখা হয় অগ্রহায়ণ। অগ্র অর্থ প্রথম আর হায়ণ অর্থ বর্ষ বা ধান।

সম্রাট আকবরের সময়ে একটি বিষয় ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য, তা হলো মাসের প্রতিটি দিনের জন্য আলাদা আলাদা নাম ছিল; যা কি না প্রজাসাধারণের মনে রাখা খুবই কষ্ট হতো। তাই সম্রাট শাহজাহান সাত দিনে সপ্তাহ ভিত্তিক বাংলায় দিনের নামকরণের কাজ শুরু করেন। ইংরেজি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় ইংরেজি সাত দিনের নামের কিছুটা আদলে বাংলায় সাত দিনের নামকরণ করা হয়। যেমন- সানডে- রবিবার। সান অর্থ রবি বা সূর্য আর ডে অর্থ দিন। এভাবে বর্ষ গণনার রীতিকে বাংলায় প্রবর্তনের সংস্কার শুরু হয় মোগল আমলে।

নতুন বছর শুধু বাংলাদেশেই নয়; বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন বছরের উৎসব পালিত। যেমন- ইরান। ইরানে এতই গুরুত্ব সহকারে তাদের নতুন বছর পালিত হয়, জাকজমক দেখে সবাই অবাক হয়ে যায়। ১৯৭২ সালের পর থেকে রমনা বটমূলে বর্ষবরণ জাতীয় উৎসবের স্বীকৃতি পায়। ১৯৮০ সালে শোভাযাত্রার মাধ্যমে একধাপ বাড়তি ছোঁয়া পায় বাংলা নববর্ষ বরণের অনুষ্ঠান। ছড়িয়ে পড়ে সবার অন্তরে অন্তরে। প্রতি বছরই তাই কোটি কোটি বাঙালির অপেক্ষা থাকে কবে আসবে বাংলা নববর্ষ। সেই বাংলা নববর্ষ সুর্নিমল বসুর কবিতায় আপ্লুত হয় ঠিক এভাবে, ‘খান্ খান্ হয়ে ঠিরিয়ে যায়।/ ফুলঝুরি ঝরে গগনের গায়।/ ঐ ওঠে রবি ঝিলমিল-ঝিল,/ হেসে ওঠে যেন বিশ্ব নিখিল,/ বাঁধ ভেঙে নামে বন্যা আলোর,/ হ’ল হ’ল আজ বৈশাখী ভোর...’

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক পূর্বাভাস।

এসইউ

আরও পড়ুন