টাঙ্গাইল-৭ আসনে ভোটের আমেজ কম, কেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে শঙ্কা
ভোটের আমেজ কম টাঙ্গাইল-৭ আসনে, ছবি: জাগো নিউজ
টাঙ্গাইলের মির্জাপুর শহর থেকে কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজের গলি পার হতেই লৌহজং নদী। বাঁশের সাঁকোয় নদী পার হয়ে যেতে হয় বাবু বাজার এলাকার সাহাপাড়ায়। জনপ্রতি গুণতে হয় পাঁচ টাকা।
এলাকাটি মির্জাপুর পৌরসভার অংশ। পড়েছে টাঙ্গাইল-৭ (মির্জাপুর) আসনে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র পাঁচ দিন বাকি। আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে নির্বাচন নিয়ে চোখে পড়ার মতো আমেজ নেই বললেই চলে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচন ঘিরে ভোটারদের মধ্যে যেমন কৌতূহল রয়েছে, তেমনি রয়েছে এক ধরনের শঙ্কা ও ভয়।
কেননা মির্জাপুর পৌরসভার ভোটারদের বড় অংশই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের। নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে বরাবরই ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে তাদের ভোট। নির্বাচনি আমেজ কতটা পৌঁছেছে এই আসনে, তা জানতেই জাগো নিউজ হাজির হয় এই এলাকায়।

কুমুদিনী হাসপাতালসহ মির্জাপুর শহরে যেতে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে যেতে হয় সাহাপাড়ার লোকজনকে। এই এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি লৌহজং নদীর ওপর পাকা সেতু বানানো হোক।
আরও পড়ুন:
গোপালগঞ্জে ‘কারাগার বনাম মাঠ’ ত্রিমুখী লড়াই
আব্বাস-পাটওয়ারীর আসনে সমস্যার শেষ নেই
সমস্যায় জর্জরিত ঢাকা-৪, প্রতিশ্রুতির বাইরে বাস্তব সমাধান চান ভোটাররা
লৌহজং নদীর ঘাট ইজারা নিয়ে জনপ্রতি পাঁচ টাকা করে আদায় করেন মহসিন নামের একজন। তিনি বলেন, ‘যতদূর জানি মন্ত্রণালয় পর্যন্ত কাগজ গেছে। যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, ব্রিজ আশা করি হয়ে যাবে।’
সাহাপাড়ার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে যা জানা গেলো, ভোট নিয়ে সনাতন ধর্মের মানুষদের মধ্যে এক ধরনের সংশয় কাজ করছে। নির্বাচনে ভোট কেন্দ্রের পরিবেশ কতটা শান্ত থাকবে আর মানুষ নিরাপদে ভোট দিতে পারবে কি না, সেটি নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে তারা। তারা চান নিরাপদে ভোট দিতে। সামগ্রিক পরিবেশ দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন ভোট দিতে যাবেন কি না। কারণ তারা যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে চলতে চান।
তেমনই একজন বাসিন্দা পঙ্কজ সাহা। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখন আওয়ামী লীগ নাই, যার যার পছন্দে হয়তো ভোট দেবে। আমাদের মধ্যে সবার একটা ধারণা, যারা সনাতন ধর্মের তারা সবাই আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়। তাই জামায়াতে ইসলামীর লোকজনও তেমন একটা ভোট চাইতে আসে না। তারা রোডে রোডে প্রচারণা চালিয়ে চলে যায়। বিএনপির লোকজন আসছে বাড়ির ভেতরে। প্রতিদিনই আসছে, দুই-তিন বারও আসছে। দেখা যাক, কী হয়। একটা ভয় তো আছেই, ভোটের দিন কেমন থাকে পরিবেশ!’

‘এখন যার যেদিকে সুবিধা সে ঐ দিকে ভোটটা দেবে। আমাদের এখানকার লোকজন তো আওয়ামী লীগেই ভোট দিতো। এখন কিছু লোক আছে বিএনপিতে দেবে। আবার কিছু লোক আছে একেবারে ভোট দিতে যাবেই না।’
সাহাপাড়ার চায়ের দোকানি চল্লিশোর্ধ্ব সুবীর সাহা বলেন, ‘মির্জাপুর পৌরসভায় মোট ১১টি ওয়ার্ড। এদিকে, মাত্র ২০ শতাংশ ভোট দিতে যাবে কি না, সন্দেহ। মনে ভয় আছে। মূল কারণ হলো প্রার্থীরা এসে বলেন না যে, আপনাদের সমস্যা নাই, ভয় নাই, ভোট দিতে যাবেন। এমন কথা কেউ বলেন না। আসেন আবার পোস্টার দিয়া চলে যান।’
পাশের মাঝিপাড়ার বাসিন্দা সত্তোরোর্ধ্ব মঙ্গলী রাজবংশী বলেন, ‘কী জানি কেমন ভোট হবে। জঞ্জাল না হলেই হয়। ভগবান জানে কী হবে। যদি দেখি নিরিবিলি তাহলে হয়তো যাবো। ভগবান নিলে যাবো। এহনই কিছু বলতে পারছিনে।’
এবার সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটও হবে। তবে সেই গণভোটের বিষয় নিয়ে অজ্ঞ অপেক্ষাকৃত বয়োজ্যেষ্ঠরা।
মরিয়ম বেগম নামের এক নারী বলেন, ‘লোকজন ভোট চাইতে আসে। কাগজ দিয়ে যায়। আগের মতো রাস্তায় পোস্টার টানানো দেহা যায় না। গণভোট জানি না, এইডা কী ভোট!’
মির্জাপুরের বাসিন্দা মামুন খান বলেন, ‘পুরো উপজেলায় সনাতন ধর্মের ভোটার অনেক। প্রচারণা কম। প্রার্থীরা কম আসেন এদিকে। কর্মীরা এসে ভোট চান। নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা কম মনে হচ্ছে।’

মির্জাপুরের গোড়াই বাজার, সোহাগপুর বাজার, দেওহাটা বাসস্ট্যান্ড এলাকা ঘুরে নির্বাচনি প্রচারণায় তেমন কোনো আমেজ পাওয়া যায়নি। তবে কুতুববাজারের আন্ধরা এলাকায় ব্যানারের ছবি চোখে পড়ে। অন্যদিকে, মির্জাপুর সদর এলাকায় প্রার্থীদের প্রচারণা বেশ জোরালো দেখা গেছে। বিভিন্ন মোড়ে, সড়কের পাশে ব্যানার টানানো থাকতে দেখা গেছে।
স্থানীয়রা বলছেন, অনেকটা শান্ত এলাকা হওয়ায় বরাবরই নির্বাচনি আমেজে টাঙ্গাইলের অন্য আসনগুলোর তুলনায় পিছিয়ে থাকে এই আসন।
অটোরিকশাচালক হারুন বলেন, ‘মিছিল হয়, তবে খুব কম। অন্য এলাকার মতো এখানে নির্বাচনি আমেজ নাই।’
মির্জাপুর উপজেলা শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ডের চায়ের দোকানি রাজ্জাক বলেন, ‘টাঙ্গাইলের সবচেয়ে ঠান্ডা এলাকা এটি। প্রথমে সবাই ভাবছিল এখানে বিএনপি জিতে যাবে। তবে গত কয়েকদিন জামায়াতের মিছিল দেখে সবার তো কপালে হাত। এত লোক কীভাবে হলো! এখন নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না, কে জিতবে?’
শুধু মির্জাপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত টাঙ্গাইল-৭ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৪৩৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮৭১ জন, নারী ১ লাখ ৮৬ হাজার ৫৬০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ৬ জন।
টাঙ্গাইল জেলার আটটি আসনের মধ্যে এই ৭ নম্বর আসনে সবচেয়ে কম তিনজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আসনটিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ এবনে আবুল হোসেন এবং বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির (বিআরপি) মো. তোফাজ্জল হোসেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
১৯৭৩ সাল থেকে টাঙ্গাইল-৭ আসনে ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা সাতবার, বিএনপি চারবার ও জাতীয় পার্টি একবার জয়ী হয়েছে। বিএনপির বর্তমান প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী ১৯৯৬ সালে দুটি নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এনএস/এসএনআর/এমএমএআর