ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. রাজনীতি

‘অলি’র পরাজয়ের পেছনে ৪ কারণ

ইকবাল হোসেন | চন্দনাইশ ঘুরে এসে | প্রকাশিত: ০১:২৭ পিএম, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • বিরূপ মন্তব্যে গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস
  • দল ও জোট বদলে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি
  • নিজের বদলে অচেনা ছেলেকে প্রার্থী
  • অর্থের প্রভাবের অভিযোগ

ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম। সারা দেশের মানুষ যাকে ‘কর্নেল অলি’ হিসেবেই চিনেন। জাতীয় রাজনীতির আলোচিত চরিত্র তিনি। এবার জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে সেই আলোচনাকে আরও উসকে দিয়েছেন। কারণ একাত্তরের রণাঙ্গনে বীরত্বের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দেওয়ার কারণে বীরবিক্রম খেতাব পান তিনি। খেতাবের সেই নামযশ নিয়েই বীরত্বের সঙ্গে চললেও জীবনসায়াহ্নে খেলেন হোঁচট।

যে চন্দনাইশের মানুষ কর্নেল অলি ছাড়া কিছুই বুঝতেন না, এলাকার অভিভাবক হিসেবে জানতেন, তারাই এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটযুদ্ধে তাকে হারিয়ে দিয়েছেন। নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) আসনে অলিপুত্র ওমর ফারুক মাত্র ১ হাজার ২৬ ভোটে হেরে যান।

কর্নেল অলি আহমদ এবার নিজে নির্বাচন না করে তার ছেলে ওমর ফারুককে দাঁড় করান। ওমর ফারুক জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সমর্থিত লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

চট্টগ্রাম-১৪ আসনের ভোটার ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে, এ হারের পেছনে কয়েকটি কারণ জানা গেছে। কর্নেল অলির নানাসময়ে নানা বিষয়ে বিরূপ মন্তব্য; বার বার দল ও জোট বদল; নিজের বদলে ছেলেকে প্রার্থী করা, যাকে এলাকার মানুষ তেমন জানেন-বুঝেন না এবং নির্বাচনে অর্থের প্রভাবকে দায়ী করছেন। শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চন্দনাইশের বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে।

আসনটিতে এবারের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জসীম উদ্দীন আহমেদ ৭৬ হাজার ৪৯৩ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ওমর ফারুক পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৪৬৭ ভোট। ২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক জসীম উদ্দীন আহমেদ।

‘অলি’র পরাজয়ের নেপথ্যে ৪ কারণ

অলির সাম্রাজ্য পতনের চার কারণ

চন্দনাইশ মানেই অলি, অলি মানেই চন্দনাইশ। এমন ধারণা ৪০ বছর ধরেই। চন্দনাইশে বড় বড় উন্নয়নের যাত্রা হয়েছিল অলির হাত দিয়েই। ৪০ বছর এসে সেই চন্দনাইশের মানুষের সঙ্গে চ্যুতি ঘটেছে অলির। পতন হয়েছে নিজের গড়া সাম্রাজ্যের। ছেলের নির্বাচনে হারার মাধ্যমে এ পতন ত্বরান্বিত হয়েছে।

পটিয়া উপজেলার শোভনদণ্ডী ইউনিয়নের হিলচিয়া গ্রামের সঙ্গে লাগোয়া চন্দনাইশের কানাইমাদারি গ্রাম। মধ্যখানে চামুদরিয়া খাল দুই গ্রাম এবং উপজেলাকে আলাদা করেছে। ২০০২ সালের দিকে চামুদরিয়া বাজার এলাকায় খালের ওপর সেতু নির্মাণ করে দুই উপজেলাকে যুক্ত করা হয়। সেতুটি উদ্বোধন করেন কর্নেল অলি। সেতুটি পেরিয়ে চন্দনাইশে প্রবেশ করতেই জসিম উদ্দিনের চা-দোকান। দোকানে বসে কয়েকজন যুবক নির্বাচনে অলির হেরে যাওয়া নিয়ে সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত।

তাদের আলাপে বোঝা গেলো- অলি সাহেবের বিভিন্ন সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্তে তাদের মধ্যে রয়েছে হতাশা। দোকানি জসিম বলেন, ‘চন্দনাইশ সুন্নী অধ্যুষিত এলাকা। অলি সাহেব জামায়াতের সঙ্গে জোট করায় অনেকে ভোট দেয়নি। বিএনপি থেকে এলডিপি এখন জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছে। আগে জামায়াতের বিরুদ্ধেও বলেছিল। তিনি কখনো এককথায় থাকতে পারেন না।’

আরও পড়ুন
চট্টগ্রাম-১৪ আসনে কারচুপির অভিযোগ অলি আহমদের
অলির এলডিপিতে ভাঙনের সুর
সরকার যেভাবে চলছে, এভাবে একটা দোকানও চলে না: অলি আহমদ
খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে ফিরোজায় অলি

চা খেতে আসা যুবক মো. দেলোয়ার বলেন, ‘ও (অলি) জাতীয় নেতা, কিন্তু যেখানে গেছেন, বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। আনোয়ারা নির্বাচনি প্রচারণায় গিয়ে বলেছেন- ওনি লোকজনকে প্যান্ট পরা শিখিয়েছেন। কানাইমাদারি এসে একদিন বলেছিলেন- তিনি রাস্তাঘাট না করলে নাকি এ গ্রামের মেয়েদের বিয়ে হতো না। ওনি (অলি) একজন পথভ্রষ্ট, জামায়াত রাজাকারের সঙ্গে মিশে গেছে।’

দেলোয়ার বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগ করি। আমি ভোট দিয়েছি, না ভোট দিয়েছি। আমরা আওয়ামী লীগ করলেও আমাদের ভোটগুলো সবসময় অলি সাহেব পেতেন। এখন আমার মতো অনেকেই তাকে ভোট দেননি।’

পাশের ফার্নিচার দোকানের মিস্ত্রি স্থানীয় কানাইমাদরি গ্রামের বাসিন্দা মো. মোস্তাক বলেন, ‘আমার আব্বা অলি সাহেবকে সম্মান করতেন। আমরা সবসময় অলি সাহেবকে ভোট দিয়ে আসছি। কিন্তু ওনি বার বার দল পরিবর্তন করেন। সেজন্য লোকজন তার কাছ থেকে ছুঁটে (সরে) গেছে। এলাকার রাস্তাঘাট ওনার হাত দিয়ে করা। ভোটতো ওনার পাওয়ার কথা ছিলো।’

‘অলি’র পরাজয়ের নেপথ্যে ৪ কারণ

মহাজন ঘাটা এলাকায় রিকশাচালক আজম খান বলেন, ‘ভোটে টাকার খেলা চলেছে। আওয়ামী লীগের অনেক লোকজন ধানের শীষে ভোট দিয়েছে।’

জানে আলম নামের আরেক রিকশাচালক বলেন, ‘অলি সাহেব বার বার নীতি পরিবর্তন করেন।’

কর্নেল অলি মন্ত্রী থাকার সময়ে চন্দনাইশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সরকারে ক্ষমতায় থাকলে উন্নয়ন তো হবেই। ওনি না করলে (উন্নয়ন), আরেকজন এলে করতো। উন্নয়ন তো হতোই।’

পশ্চিম হারলা রাস্তার মাথায় গন্তব্যে যেতে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন গাছবাড়িয়া কলঘর এলাকার বাসিন্দা বৃদ্ধ নুর কাদের। তিনি বলেন, ‘এখানে বেশিরভাগ সুন্নিপন্থি। জামায়াতের সঙ্গে যাওয়ায় ভোট কমেছে। ওনি পেতেন এমন অনেক ভোট মোমবাতি (বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের প্রতীক) পেয়েছে। টাকার খেলাও চলেছে।’

‘অলি’র পরাজয়ের নেপথ্যে ৪ কারণ

নুর কাদের বলেন, ‘চন্দনাইশের রাস্তাঘাট যেগুলো আছে, প্রায় অলি সাহেবের হাত দিয়ে তৈরি। অলি সাহেব বিএনপি ছেড়ে যখন এলডিপি করেছিলেন, তখনও চন্দনাইশের মানুষ তাকে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এবার দেননি।’

চন্দনাইশ পৌর সদরে কথা হয় দোকানদার মো. জসিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অলি আহমেদ ছেলেকে না দিয়ে নিজে দাঁড়ালে জিতে যেতেন। ছেলেকে তো ভোটাররা চেনেন না।’

একই মন্তব্য করেন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার মো. সেলিম। তিনি বলেন, ‘অলি সাহেবের ছেলে বিদেশে লেখাপড়া করেছেন। এলাকার কেউ তাকে চেনেন না।’

‘অলি’র পরাজয়ের নেপথ্যে ৪ কারণ

চন্দনাইশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে লাগানো নামফলকে দেখা যায় কর্নেল অলির নাম। ফলকটি ২০০৬ সালের ২৭ মে ৫০ শয্যার হাসপাতালের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের। এর আগে ৩১ শয্যার হাসপাতালটি কর্নেল অলির হাত দিয়ে স্থাপন করা।

হাসপাতালের সামনে কথা হয় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও এলডিপির শ্রমিক সংগঠনের নেতা মো. আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘চন্দনাইশ হাসপাতাল, দোহাজারী হাসপাতাল, চন্দনাইশ থানা, পৌরসভা, গাছবাড়িয়া কলেজ সবই অলি সাহেবের অবদান। চন্দনাইশের আনাচে কানাচে রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট এখন যেগুলো দেখা যাচ্ছে সবই অলি সাহেবের হাত দিয়ে গড়া।’

তিনি বলেন, ‘অলি সাহেব টাকার কাছে হেরে গেছেন। এক ভোট যদি তিন হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ওই জায়গায় হেরে গেছেন।’

চন্দনাইশ উপজেলার পুরনো ভবনের প্রবেশদ্বারে সাঁটানো নামফলকে লেখা কর্নেল অলি আহমদের নাম। ১৯৯১ সালের ২৬ অক্টোবর যোগাযোগ মন্ত্রী থাকাকালীন চন্দনাইশ উপজেলা পরিষদ সম্প্রসারণ ভবনের উদ্বোধন করার ফলক এটি।

‘অলি’র পরাজয়ের নেপথ্যে ৪ কারণ

তাছাড়া নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি চন্দনাইশের সংবাদকর্মী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন ১০ জনের সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের। তাদের সবার একই ভাষ্য, চন্দনাইশের উন্নয়নে অলি আহমদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু ওনি (অলি) লোকজনকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। এখনকার তরুণ যুবকরা তার নেতিবাচক বক্তব্য পছন্দ করেন না। এখন সমাজ পাল্টেছে।

এরমধ্যে দুইজনের মন্তব্য এমন- ‘চন্দনাইশে এবারের নির্বাচনে টাকা প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু টাকা ব্যবহারের কেউ প্রমাণ দিতে পারবে না।’

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে লড়েছিলেন কর্নেল অলি। ‘রাতের ভোট’ খ্যাত ওই নির্বাচনেও চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আসনের কয়েকটি কেন্দ্রে উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছিলেন কর্নেল অলি। কিন্তু এবারের নির্বাচনে ওইসব কেন্দ্রেও প্রভাব কমেছে তার ছাতা প্রতীকের।

স্থানীয় এক সংবাদকর্মী জাগো নিউজকে বলেন, ‘অলি সাহেবের নিজের ভোটকেন্দ্রে আগে তিনি একচেটিয়া ভোট পেতেন। প্রতিদ্বন্দ্বী যেই হোক ২০০ ভোটের বেশি পেতেন না। এবার ধানের শীষ ৪০০ ভোট পেয়েছে।’

আরও পড়ুন
অতিথি তালিকায় নাম নেই, ফিরে গেলেন অলি আহমদ
ভারতের প্রতিটি রাজ্যে শান্তিরক্ষী মোতায়েন করা উচিত: কর্নেল অলি
সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান অলির
বিএনপির নেতৃত্বে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করবো: অলি

২০১৮ সালের নির্বাচনে কেশুয়া উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ছাতা প্রতীকে কর্নেল অলি পেয়েছিলেন ১ হাজার ৪৪০ ভোট। ইসলামী ফ্রন্টের সেহাব উদ্দিন মুহাম্মদ আবদুস সামাদ মোমবাতি প্রতীকে পেয়েছিলেন ৩৯ ভোট। সেবার ওই কেন্দ্রে ভোটার ছিল ৩ হাজার ৭৭১ জন। এবারের আসনে ওই কেন্দ্রে অলি আহমদের ছেলে ওমর ফারুক পেয়েছেন ১ হাজার ২২৪ ভোট এবং মোমবাতি প্রতীকে মৌলানা মো. সোলাইমান পেয়েছেন ৪৬৬ ভোট। কেন্দ্রটিতে এবারে ভোটারের সংখ্যা ৪ হাজার ৬৬৫ জন।

বরমা ত্রাহিমেনকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র ২০১৮ সালের ভোটার ছিল ৩ হাজার ৫৮৪ জন। ওই নির্বাচনে অলি ছাতা প্রতীকে পেয়েছিলেন ৯৭৮ ভোট, মোমবাতি পায় ২৪ ভোট। এবারের নির্বাচনে ওই কেন্দ্রে ভোটারের সংখ্যা ৪ হাজার ৪৭৫ জন। কিন্তু তার ছেলে ওমর ফারুক পেয়েছেন ৯৮৩ ভোট। মোমবাতি পেয়েছে ২১৭ ভোট।

অলি আহমদের নিজের ভোটকেন্দ্র চন্দনাইশ পৌরসদর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ২০১৮ সালের ভোটার ছিল ১ হাজার ৮৩৮ জন। অলি আহমদ পেয়েছিলেন ৬৬০ ভোট, মোমবাতি পেয়েছিল ২৬ ভোট এবং নৌকা প্রতীকের নজরুল ইসলাম চৌধুরী পেয়েছিলেন ২৫৯ ভোট। এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ওই কেন্দ্রে ভোটার ২ হাজার ৮৬ জন। এরমধ্যে ছাতা প্রতীক পেয়েছে ৬৯৫ ভোট। মোমবাতি পেয়েছে ১৬৫ ভোট। কেন্দ্রটিতে ধানের শীষ পেয়েছে ৪০১ ভোট।

আরও পড়ুন
বিএনপি চট্টগ্রাম বন্দর দখলের জন্য পাগল হয়ে গেছে: অলি আহমদ
চট্টগ্রাম থেকেই স্বাধীনতার ঘোষণা, অলি বলেছিলেন ‘উই রিভল্ট’
আমি প্রথম বিদ্রোহ করেছি, জামায়াত আমিরের বক্তব্য ঠিক আছে: কর্নেল অলি
বিএনপি ভাড়াটেদের দলে পরিণত হয়েছে: অলি আহমদ

পাশের চন্দনাইশ আইডিয়াল স্কুল ভোটকেন্দ্রে ২০১৮ সালে ভোটার ছিল ১ হাজার ৬৬৭ জন। এরমধ্যে ছাতা পেয়েছিল ৮২৮ ভোট, মোমবাতি পেয়েছিল ৩৭ ভোট। ২৭৮ ভোট পেয়েছিল নৌকা। কিন্তু এবারের নির্বাচনে কেন্দ্রটিতে ছাতা পেয়েছে ৭৩৪ ভোট। মোমবাতি পেয়েছে ২২৫ এবং ধানের শীষ পেয়েছে ৩৯১ ভোট।

কী বলছে দুইপক্ষ

চন্দনাইশে অলিপুত্র অধ্যাপক ওমর ফারুকের প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট আকতার আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের ভোট কমেনি। এখানে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে। কিছু মানুষ টাকার কাছে জিম্মি হয়ে গেছে।’

টাকা ব্যবহারের প্রমাণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগের দিন সেনাবাহিনী ১০ লাখ টাকাসহ প্রার্থীর লোক আটক করেছিল। সাতকানিয়ার বহরম পাড়ায় টাকা বিলি করার সময় তিনটি গাড়িসহ ১৬ জনকে আটক করে সেনাবাহিনী। পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।’

আরও পড়ুন
ফ্রিস্টাইলে দেশ চলছে, যখন তখন মিছিল-রাস্তা অবরোধে ভোগান্তি চরমে
সব জায়গা থেকে শেখ পরিবারের নামফলক মুছে ফেলতে হবে: অলি আহমদ
অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ: অলি আহমদ
বেশি গুতাগুতি করলে কাউকে ছাড় দেবো না, ভারতকে অলি আহমদ

অলি সাহেবের দল-জোট বদল কিংবা নানান বিরূপ মন্তব্য প্রভাব ফেলেছে কী না জানতে চাইলে আকতার আলম বিষয়টি উড়িয়ে দেন। বলেন, ‘আমরা হেরে যাওয়ায় চন্দনাইশের মানুষ আপসোস করতেছে।’

পরে কথা হলে জয়ী প্রার্থী জসীম উদ্দীন আহমেদের নির্বাচনি প্রধান সমন্বয়ক এম এ হাশেম রাজু জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ বিজয় চন্দনাইশ-সাতকানিয়াবাসীর। এ বিজয় অহংকার অহমিকার বিরুদ্ধে, তুচ্ছতাচ্ছিল্যের বিরুদ্ধে। এ বিষয় শহীদ জিয়া, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের। এ বিজয় চন্দনাইশের মাটি মানুষের।’

নির্বাচনে অর্থের ছড়াছড়ির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা নির্বাচনে টাকা ব্যবহার করিনি। উপরন্তু আমাদের নির্বাচনি প্রতিপক্ষরাই নির্বাচনে টাকা ছড়িয়েছে।’

কারচুপির অভিযোগ অলি আহমদের

কারচুপির অভিযোগ অলি আহমদের

চট্টগ্রাম-১৪ আসনে ভোট কারচুরির অভিযোগ এনেছেন এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় কারচুপি হয়েছে। আমরা পরাজিত হইনি। পরাজিত হয়েছে আমার নির্বাচনি এলাকার জনগণ। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হয়েছে। আমরা লক্ষ্য করেছি বিকেল ৪টার পর থেকে বিভিন্ন জায়গায় কারচুপি হয়েছে। বিশেষ করে তিনটি জায়গায়। হাসিমপুর তরুণ সংঘ স্কুল, হাসিমপুর বড়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং দোহাজারী আবদুর রহমান হাই স্কুলে সাড়ে ৪টার পরে অপরিচিত কয়েকশ লোক জোরপূর্বক প্রবেশ করে। হয়তো ওখানে যারা প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ছিলেন, তাদের সঙ্গে পূর্বপরিকল্পনা ছিল এভাবে কাজ করার জন্য। তারা অনেকগুলো ব্যালট পেপার সেখানে ঢুকিয়ে দিয়েছেন।’

এলডিপির সভাপতি বলেন, ‘এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যারা ছিলেন, আড়াইটা-৩টার পর থেকে আমাদের যারা নেতাকর্মীরা কেন্দ্রের বাইরে দায়িত্বরত ছিলেন, তাদের পিটিয়ে বের করে দিয়েছে। প্রশাসনকে বারবার বলা সত্ত্বেও আমাদের যারা কাজ করছিলেন, তাদের মারপিট করেছে। অন্যদিকে জসীম ৬-৭টা মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করেছেন এবং সন্ধ্যার আগে-পরে প্রায় ৩০-৪০টা মাইক্রোবাস, ট্রাক নিয়ে মিছিল করে উপজেলা সদরে এসেছেন।’

বিপক্ষের জয়ী প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে অলি আহমদ বলেন, ‘আর্মি ক্যাম্প ছিল, থানা ছিল, প্রশাসন ছিল, তাকে (জসীম) বারণ করেনি। তারা (জসীমের কর্মী) উপজেলা হেডকোয়ার্টারে এসে তছনছ করেছে। আমার কর্মীদের আমি অনেক কষ্ট করে সুশৃঙ্খল রাখার চেষ্টা করেছি। এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং যারা নির্বাচনের দায়িত্বে ছিলেন, তারা একতরফাভাবে কাজ করেছেন। বিভিন্ন জায়গায় ছাতা প্রতীকের এজেন্টদের সাড়ে ৪টার পর বের করে দিয়েছেন। এছাড়াও ওমর ফারুকের প্রায় সাড়ে ৪ হাজার ভোট বাতিল বলে গণ্য করেছে। আমাদের এজেন্টরা যখন এটা চ্যালেঞ্জ করেছে, তাদের এগুলো দেখানো হয়নি। সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে ওমর ফারুককে পরাজিত করার জন্য ব্যবস্থা করেছে।’

‘অলি’র পরাজয়ের পেছনে ৪ কারণ

সামরিক কর্মকর্তা থেকে রাজনীতি ও সরকারে অলি

সেনাবাহিনীতে থাকার সময়ে ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সালের মধ্যবর্তী পর্যন্ত কর্নেল অলি আহমদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়কালে তিনি বিএনপি গঠনের প্রাথমিক প্রক্রিয়া ও সাংগঠনিক কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছা অবসর নেওয়ার পর ১৯৮০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। পরের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত উপ-নির্বাচনে তিনি চন্দনাইশ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হন। ওই বছরের ২৪ মার্চ এরশাদ সামরিক আইন জারি করার আগ পর্যন্ত তিনি প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।

১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হলে বিএনপি সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রী হন। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হলে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠন করলেও তাকে মন্ত্রী করা হয়নি। এতে তিনি বিএনপির ওপর ক্ষুব্ধ হন। ওই মেয়াদের সরকার পতনের পর দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিরোধ তৈরি হলে ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর তিনি বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেন এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) গঠন করেন। তিনি বর্তমানে এলডিপির সভাপতি। এরমধ্যে ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি এলডিপি থেকে ছাতা প্রতীকে ৮২ হাজার ৩৬ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগের ইঞ্জিনিয়ার আফসার উদ্দিন আহম্মদকে হারিয়ে জয়ী হন। আফসার উদ্দিন পান ৬১ হাজার ৬৪৬ ভোট। ২০১৪ সালের নির্বাচনে তিনি অংশ নেননি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি পেয়েছিলেন ২২ হাজার ২২৫ ভোট। আলোচিত ‘রাতের ভোটে’র নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে তাকে হারিয়ে আওয়ামী লীগের নজরুল ইসলাম চৌধুরী ১ লাখ ৮৯ হাজার ১৮৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে অংশ নেননি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজে মাঠ থেকে সরে ছেলেকে প্রার্থী করান।

এমডিআইএইচ/এমএমএআর/