মেরুজ্যোতির শহর রোভানিয়েমি ভ্রমণ
রোভানিয়েমি শহর, ছবি: লেখকের সৌজন্যে
প্রতিটি মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ স্বপ্ন থাকে, যেগুলো কেবল ভ্রমণ নয়; সেগুলো একেকটা আত্মার ডাক। বহুদিন ধরে আমার ভেতরে এমনই একটি ডাক ছিল, কনকনে শীতের মধ্যে, মাইনাস ৪০ তাপমাত্রার নীরব রাজ্যে দাঁড়িয়ে নিজের চোখে মেরুজ্যোতি বা অরোরা দেখা। সেই স্বপ্নকে আর কাগজে আটকে রাখিনি, বাস্তবে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছি। পৃথিবীর একেবারে উত্তরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এই যাত্রা আমার কাছে শুধু একটি গন্তব্য নয়, এটি নিজের ভেতরের এক অদম্য ইচ্ছাকে ছুঁয়ে দেখার সাহস।
ফিনল্যান্ডের মাটিতে দাঁড়িয়ে যখন রোভানিয়েমির টিকিট কাটলাম, তখন মনে হলো স্বপ্নের পথে প্রথম পা ফেলা হয়ে গেছে। হেলসিঙ্কি থেকে প্রায় বারোশ কিলোমিটার দূরের শহরটি শুধু একটি শহর নয়, এটি আর্কটিক সার্কেলের প্রবেশদ্বার। এই দীর্ঘ পথ আমি গাড়িতে পাড়ি দেবো। প্রায় বারো ঘণ্টার যাত্রা রাতের অন্ধকার, বরফে ঢাকা রাস্তা, জানালার বাইরে স্থির হয়ে থাকা বন আর নিঃশব্দ প্রকৃতি। অবাক লাগে, এত লম্বা পথের টিকিট লেগেছে মাত্র ১৪ ইউরো বাংলাদেশি টাকায় প্রায় দুই হাজার। মনে হয়, কখনো কখনো স্বপ্নের পথে যাত্রা খুব বেশি দামি হয় না, শুধু সাহস লাগে।
এই যাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত আমার কাছে আলাদা গুরুত্ব বহন করে। রাত ৯টা ২০ মিনিটে হেলসিঙ্কির কাম্পি টার্মিনাল থেকে বাস ছাড়বে। শহরের আলো ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যাবে, আর সামনে খুলে যাবে অচেনা শীতল এক পৃথিবী। বাসের ভেতর বসে হয়তো আমি ভাববো কত মানুষ সারাজীবন এমন একটি দৃশ্য দেখার স্বপ্ন দেখে, আর আমি সেই স্বপ্নের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি। সময়ের হিসাব অনুযায়ী সকাল ৯টা ৫ মিনিটে পৌঁছাব রোভানিয়েমিতে। তখন হয়তো সূর্য উঠবে ধীরে কিংবা বরফে ঢাকা শহরটাকে ঘিরে থাকবে এক ধরনের নীলচে আলো।
পৃথিবীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে বহুবার। পাহাড়, সমুদ্র, মরুভূমি, বরফ সবই দেখেছি। কিন্তু মেরুজ্যোতি আলাদা। এটি শুধু চোখে দেখার বিষয় নয়, এটি অনুভব করার বিষয়। এর আগে আমি তীব্র শীত অনুভব করেছি মাইনাস ত্রিশ, চল্লিশ ডিগ্রি। সেই শীত শরীরকে কাঁপিয়ে দেয়, শ্বাসকেও ভারী করে তোলে। কিন্তু সেই শীতের মাঝেই যদি পুরো আকাশ পরিষ্কার থাকে, আর হঠাৎ করে আকাশজুড়ে নাচতে থাকে রঙিন আলো সবুজ, নীল, হলুদ, কখনো বেগুনি তাহলে সেই মুহূর্ত ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
- আরও পড়ুন
পর্তুগিজ আমলের রাস্তায় একদিন
মেরুজ্যোতি আমার কাছে প্রকৃতির এক অলৌকিক শিল্পকর্ম। এটি কোনো স্থির ছবি নয়, এটি এক চলমান কবিতা। আকাশের বুকে আলো যেন ঢেউ খেলিয়ে এগিয়ে যায়, কখনো ধীরে, কখনো হঠাৎ তীব্র হয়ে ওঠে। আমি আগেও অরোরার ছবি দেখেছি, ভিডিও দেখেছি, গল্প শুনেছি। কিন্তু স্বচোখে দেখা সেটা একেবারেই ভিন্ন অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতার টানেই আমি এত দূর এগিয়ে যাচ্ছি।
রোভানিয়েমি শুধু মেরুজ্যোতির শহর নয়, এটি শীতের নীরবতার শহর। এখানে রাত দীর্ঘ, আকাশ বিশাল, আর প্রকৃতি খুবই সংযত। এখানে দাঁড়িয়ে মানুষ নিজের ক্ষুদ্রতাকে অনুভব করে। হয়তো সেই কারণেই এই যাত্রা আমার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের কোলাহল, ব্যস্ততা, দায়িত্ব সবকিছু থেকে একটু দূরে গিয়ে প্রকৃতির সামনে নিজেকে সপে দেওয়ার সুযোগ এটি।

যাওয়ার পরিকল্পনাটা যতটা রোমাঞ্চকর, ফেরার পরিকল্পনাও ততটাই বাস্তব। ফিরে আসব বিমানে। দীর্ঘ সড়কযাত্রার পর আকাশপথে ফিরে আসা এটাও যেন যাত্রার এক ভিন্ন অধ্যায়। কিন্তু যাওয়ার পথটাই আসল গল্প। সেই বারো ঘণ্টার যাত্রা, জানালার বাইরে বরফে ঢাকা দৃশ্য, ভেতরে নিজের স্বপ্নের সঙ্গে কথোপকথন এই সময়গুলোই হয়তো আজীবন মনে থেকে যাবে।
আমি জানি না, সেই রাতে আকাশ কতটা পরিষ্কার থাকবে। জানি না, মেরুজ্যোতি কতটা তীব্র হবে। প্রকৃতি কারও কাছে প্রতিশ্রুতি দেয় না। তবুও এই আশা নিয়েই আমি এগিয়ে যাচ্ছি। কারণ কখনো কখনো সফলতা শুধু গন্তব্যে পৌঁছানো নয়, পথটুকু বেছে নেওয়াটাই সফলতা। আমি চেষ্টা করছি, সাহস করছি, নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দিচ্ছি এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
এই যাত্রা আমার জীবনের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। হয়তো আমি সফল হবো, হয়তো আকাশে সত্যিই নাচবে রঙিন আলো। আর যদি না-ও হয়, তবুও আমি জানবো আমি স্বপ্ন দেখেছি, আর সেই স্বপ্ন পূরণের পথে হাঁটতে ভয় পাইনি। পৃথিবীর একেবারে উত্তরের দিকে, কনকনে শীতের মাঝে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার এই সাহসটাই আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অর্জন।
এসইউ