নির্বাচনি রাজনীতিতে ক্রাউডফান্ডিং

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে সম্ভাবনা, সীমাবদ্ধতা ও নীতিগত করণীয়

ড. মো: হাছান উদ্দীন
ড. মো: হাছান উদ্দীন ড. মো: হাছান উদ্দীন , পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: ০৬:১৭ পিএম, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬

বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরপর্ব অতিক্রম করছে। আসন্ন ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যা নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নতুনভাবে সচল করার প্রত্যাশা তৈরি করেছে। নির্বাচনি বাস্তবতায় একজন সংসদ সদস্য প্রার্থীকে ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে জনসভা, সমাবেশ, মিছিল, সভা-সেমিনারসহ বহুমুখী জনসংযোগ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়, যার জন্য প্রয়োজন হয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আর্থিক সম্পদের। এ ব্যয়ের পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রেই একজন সাধারণ নাগরিকের সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়। ফলে নির্বাচনি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে বিত্তবান শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এ বাস্তবতা চ্যালেঞ্জ করার একটি বিকল্প হিসেবে ক্রাউডফান্ডিং (Crowdfunding) নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ক্রাউডফান্ডিং মূলত একটি বিকল্প অর্থায়ন পদ্ধতি, যেখানে বৃহৎ কোনো একক দাতার ওপর নির্ভর না করে সাধারণ জনগণের কাছ থেকে ছোট ছোট অঙ্কের অনুদান সংগ্রহ করা হয়। রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রাউডফান্ডিংয়ের ধারণা নতুন নয়। বিশ্বব্যাপী এর প্রথম বড় প্রয়োগ দেখা যায় ২০০৮ সালের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে, যখন বারাক ওবামা ঘোষণা দেন যে তিনি সাধারণ জনগণের অনুদানের মাধ্যমেই নির্বাচনি তহবিল সংগ্রহ করবেন। বিভিন্ন গবেষণা ও তথ্য অনুযায়ী, তার নির্বাচনি ব্যয়ের প্রায় ৬৬ শতাংশ এসেছিল এই জনভিত্তিক অর্থায়ন থেকে। এর মাধ্যমে নির্বাচনি রাজনীতিতে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ ও সম্পৃক্ততার একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়, যা পরে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে অনুসৃত হতে শুরু করে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলই এই পদ্ধতি গ্রহণ করে এমনকি ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও ক্রাউডফান্ডিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

নির্বাচনি অর্থায়নে ক্রাউডফান্ডিংয়ের কয়েকটি মৌলিক সুবিধা রয়েছে। প্রথমত, এটি অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ায় বিশেষ করে সীমিত আয়ের নাগরিকরাও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান। দ্বিতীয়ত, এটি নতুন ও অপ্রচলিত নেতৃত্বের উত্থান সহজ করে, যারা বড় ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সহায়তা ছাড়াই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। তৃতীয়ত, প্রার্থী ও ভোটারের মধ্যে একটি আগাম ও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক জবাবদিহিতা জোরদার করতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে, এটি কালো টাকার প্রভাব কমাতেও সহায়ক হতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও ক্রাউডফান্ডিং ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন সংসদ সদস্য প্রার্থী এই পদ্ধতির মাধ্যমে নির্বাচনি ব্যয় নির্বাহ করে গণমাধ্যমে আলোচনায় এসেছেন। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা, যিনি ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ৪৭ লাখ টাকা সংগ্রহ করেন। একইভাবে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) প্রার্থী ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একাধিক প্রার্থী, যেমন নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আব্দুল্লাহ ও হান্নান মাসুদ- এই পদ্ধতিতে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা বা উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। শহরকেন্দ্রিক শিক্ষিত তরুণ ভোটারদের মধ্যে এটি সীমিত আকারে ইতিবাচক সাড়া ফেললেও, এখনো এটি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আইনসম্মত কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হচ্ছে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনানুষ্ঠানিক অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা স্বচ্ছতা ও নিরীক্ষার প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।

ক্রাউডফান্ডিংয়ের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তথ্য অসমতা (Information Asymmetry) । অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জনগণকে শুধু মোট সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ জানানো হয়, কিন্তু ডোনারের পরিচয় ও অনুদানের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয় না। ফলে অর্থ আসলে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী থেকে এলেও তা ‘সর্বস্তরের জনগণের অনুদান’ হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ থেকে যায়। ফলে নির্বাচনের পর জনপ্রতিনিধির আচরণে ব্যবসায়িক বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের প্রতিফলন ঘটতে পারে।

বাংলাদেশে এ ঝুঁকি আরও তীব্র হয়, কারণ বর্তমানে রাজনৈতিক ক্রাউডফান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে ডোনারের পরিচয়, অনুদানের অঙ্ক ও অর্থের উৎস বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশের কোনো সুস্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ আইন নেই। ফলে বড় ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী যদি আড়ালে বড় অঙ্কের অনুদান প্রদান করেন, তবে নির্বাচনের পর সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর ওপর তাদের স্বার্থ রক্ষার চাপ সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাস্তবতায় দেখা যায়, কিছু ক্ষেত্রে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির আচরণে এই স্বার্থসংঘাতের প্রতিফলনও পাওয়া যায়, যা গণতান্ত্রিক নীতির পরিপন্থি।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের ওয়েবসাইট পুনর্গঠনের মাধ্যমে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের জন্য অনলাইন ডোনেশনের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, যা দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক অর্থায়নের ধারা থেকে একটি ভিন্ন ও আধুনিক চিন্তার প্রতিফলন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে এ উদ্যোগ রাজনৈতিক অর্থায়নে ডিজিটাল ও অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতি হিসেবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়, যা প্রশংসার দাবি রাখে, বিশেষত স্বচ্ছ ও জনগণনির্ভর অর্থায়নের ধারণা সামনে আনার জন্য।

যদি বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল ভবিষ্যতে ক্রাউডফান্ডিংকে কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য করতে চায়, তবে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। প্রথমত, ডোনারের পরিচয় ও অনুদানের পরিমাণ নির্দিষ্ট সীমার ঊর্ধ্বে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য ডোনেশন ক্যাপ (ঊর্ধ্বসীমা) নির্ধারণ। তৃতীয়ত, দলীয় পর্যায়ে স্বতন্ত্র অডিট ও আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ। চতুর্থত, বড় ডোনারের ক্ষেত্রে Conflict of Interest (স্বার্থসংঘাত) নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। এখানে Conflict of Interest নীতিমালা  বলতে এমন একটি নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বোঝায়, যার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে কোনো রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি বা সিদ্ধান্তগ্রহণকারী ব্যক্তি তার দায়িত্ব পালনের সময় ব্যক্তিগত, পারিবারিক, আর্থিক বা ডোনার–সংশ্লিষ্ট স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন কি না। এই নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য হলো জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া এবং এমন পরিস্থিতি প্রতিরোধ করা, যেখানে নির্বাচনি অনুদান বা ব্যক্তিগত লাভের বিনিময়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। কার্যকর Conflict of Interest নীতিমালা না থাকলে রাজনৈতিক ক্রাউডফান্ডিং সহজেই বড় ডোনারের প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে, যা গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও নৈতিক শাসনের জন্য ক্ষতিকর।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয় হলো, ক্রাউডফান্ডিংয়ের আগে স্পষ্ট নির্বাচনি ইশতেহার ও রাজনৈতিক আদর্শ জনগণের সামনে উপস্থাপন করা। বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনেক রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য আগে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি উপেক্ষা করে। যদি কোনো দল ক্রাউডফান্ডিংয়ের সময় দেওয়া অঙ্গীকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে নীতিগতভাবে সেই অর্থ জনগণকে ফেরত দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা উচিত। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছু নেতার পদত্যাগ ও স্বতন্ত্র নির্বাচনের ঘোষণার মাধ্যমে এই নৈতিক সংকটের ইঙ্গিতও আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, যা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। ক্রাউডফান্ডিং বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতিতে একটি সম্ভাবনাময় কিন্তু সংবেদনশীল ধারণা। এটি তখনই গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে কার্যকর হবে, যখন তা পূর্ণ স্বচ্ছতা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হবে। আবেগ বা প্রযুক্তিগত চমক নয় বরং প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছাই পারে এ পদ্ধতি জনগণের আস্থার জায়গায় পৌঁছে দিতে।

অধ্যাপক
ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী
[email protected]

এমআইএইচএস/এমএফএ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।