চট্টগ্রামে সিলিন্ডার গ্যাসের জন্য হাহাকার, বাড়ছে ক্ষোভ
চট্টগ্রাম নগরে এলপিজি গ্যাস সংকট দিন দিন আরও প্রকট আকার ধারণ করছে। সরকার কর ও ভ্যাট কমানো এবং ব্যবসায়ীরা ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও বাস্তবে খুচরা বাজারে গ্যাসের দেখা মিলছে না। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দোকানের সামনে সারি সারি খালি সিলিন্ডার পড়ে থাকলেও ভরা সিলিন্ডার নেই; যেন গ্যাসের জন্য হাহাকার বিরাজ করছে। নগরীতে এমন চিত্রই যেন এখন নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় নগরের একাধিক এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ খুচরা দোকানে এলপিজির কোনো মজুত নেই। কোথাও কোথাও অল্পসংখ্যক সিলিন্ডার এলেও তা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। দ্বিগুণ দাম দিয়েও অনেক গ্রাহককে খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে।
সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে
এলপিজির এই সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন হোটেল-রেস্টুরেন্ট, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও চা দোকানিরা। রান্নার খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক দোকান বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। কেউ কেউ আবার বাধ্য হয়ে কেরোসিন বা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছেন।
কাজীর দেউড়ি এলাকার চায়ের দোকানি রহমত আলী বলেন, ২০০-৪০০ টাকা বেশি দিয়েও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা কেরোসিন জ্বালিয়ে কোনোমতে কাজ চালাচ্ছি।
আরেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. সোহেল বলেন, গ্যাস না থাকায় সংসার চালানো কষ্ট হয়ে গেছে। আমরা দ্রুত এর সমাধান চাই।
ডিলাররা সরবরাহ করছেন না: অভিযোগ খুচরা বিক্রেতাদের
হালিশহর, মেহেদিবাগ, কাজীর দেউড়ি, জামাল খান, ব্যাটারি গলি ও আশপাশের এলাকার খুচরা বিক্রেতারা জানান, ডিলারদের কাছ থেকে নিয়মিত সরবরাহ না পাওয়ায় তারা গ্যাস বিক্রি করতে পারছেন না।
হালিশহর ঈদগাহ কাঁচা রাস্তার মাথার জাহেদ স্টোরের মালিক জাহেদ জাগো নিউজকে বলেন, ডিলাররা সপ্তাহে এক-দুইবার মাত্র সিলিন্ডার দেন। এক সপ্তাহে ১৫–২০টি পাই, যা একদিনেই শেষ হয়ে যায়। আমাদের ধারণা, কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন
এলসি জটিলতায় এলপিজি সংকট, ‘ঘি ঢালছেন’ ডিলার-খুচরা বিক্রেতা
দ্বিগুণ দামেও মিলছে না এলপিজি
১২৫৩ টাকার এলপিজি ২০০০ টাকা, দায় কার?
তিনি জানান, ডিলারদের কাছ থেকে প্রতি সিলিন্ডার ১ হাজার ৪৫০ টাকায় কিনে সার্ভিস চার্জসহ ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকায় বিক্রি করতে হয়। আবার কখনো কখনো ডিলার পর্যায়েই ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দামে কিনতে হয়।

মেহেদিবাগ এলাকার ফারহান ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডের মালিক মিজানুর রহমান বলেন, আজ সারাদিন কোনো সিলিন্ডারই আসেনি। ডিলাররা বলছেন, কাল (বুধবার) থেকে কিছু আসতে পারে। গ্রাহকদের বোঝানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
কোম্পানি থেকে সরবরাহ নেই: দাবি ডিলারদের
এদিকে ডিলাররা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, মূল সংকট কোম্পানি পর্যায়ে। বাকলিয়া এলাকার বেক্সিমকোর ডিলার সো. রাসেল জাগো নিউজকে বলেন, কোম্পানি থেকে কোনো গ্যাস পাচ্ছি না। আগে যখন ছিল, তখন ১ হাজার ৩৭০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন সরবরাহ না থাকায় বিক্রি বন্ধ।
নিউমার্কেট এলাকার বিএম এলপি গ্যাসের ডিলার সাজ্জাদ বলেন, গ্রাহকরা প্রতিদিন চাপ দিচ্ছে। কিন্তু কোম্পানি থেকে গ্যাস না পেলে আমরা কী করবো?
ভোক্তা অধিকার সংগঠনের অভিযোগ: সিন্ডিকেটের কারসাজি
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, এটা পুরোপুরি সিন্ডিকেটের খেলা। আমদানিতে সমস্যা হলে অন্তত এক মাস আগেই জানানোর কথা। হঠাৎ শীতে লাইনের গ্যাস কমলেই এলপিজি উধাও হয়ে যায়, এটা স্পষ্ট কারসাজি।
তিনি বলেন, ভোক্তা অধিদপ্তর অভিযান চালালে দোকান বন্ধ করে দেওয়া, পালিয়ে যাওয়া কিংবা ধর্মঘট ডাকা সবই আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর শামিল। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের চেষ্টা চলছে।
কোম্পানির বক্তব্য: বন্দরে গ্যাস আসেনি
চট্টগ্রাম বিএম এলপি গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান বলেন, আমরা এক মাস আগেই এলসি করেছি। কিন্তু বন্দরে এলপিজি না আসায় সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের কোনো সিন্ডিকেট নেই। সরবরাহ পেলেই বাজারে গ্যাস ছাড়বো।
কবে কাটবে সংকট?
সরকারি সিদ্ধান্ত, ব্যবসায়ীদের ঘোষণা আর মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা- সব মিলিয়ে চট্টগ্রামে এলপিজি সংকট এখনো কাটেনি। সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই সংকট কবে শেষ হবে, আর এর দায় নেবে কে, এখন সেই প্রশ্নই করছেন নগরবাসী।
এমআরএএইচ/ইএ