ঢাকা-১৪ আসনে দখল, মাদক আর জলাবদ্ধতাই ভোটের বড় ইস্যু
ঢাকার ব্যস্ততম এলাকা গাবতলী। সেখানে নির্বাচনি আমেজ শুধুমাত্র ব্যানার-ফেস্টুনে। নিয়ম মেনে দূরপাল্লার গাড়ি আসছে-যাচ্ছে। মানুষের কোলাহলও থেমে নেই। এর মধ্যেই কথা হয়, সাইদুল নামের এক কাউন্টার ম্যানেজারের সঙ্গে। তিনি বলেন, নির্বাচন নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা ব্যস্ত। আমাদের কাজ করে খেতে হয়। আমাদের কষ্টার্জিত টাকা নিয়ে নির্বাচন করে, উড়ায়।যখন যে আসে সবাই এগুলো করে।
১৯৯৮ সাল থেকে পরিবহন সেক্টরের সঙ্গে জড়িত এই সাইদুল। শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার। কুড়িগ্রামের এই বাসিন্দা গাবতলী মাজার রোডের কাউন্টারের পেছনের এক রুমেই কাটিয়ে দিয়েছেন ২৮ বছর। দীর্ঘদিন ধরে থাকার ফলে এলাকায় বিভিন্ন দলের ভিন্ন ভিন্ন নেতার উত্থান ও পতন দেখেছেন। ২০২৪ এর এত বড় আন্দোলনের পরও পরিবর্তন হয়নি, এই আক্ষেপ তার। তিনি বলেন, আগে যা করতো, যা হতো, তাই হচ্ছে। খালি পরিবর্তন হয়েছে সাইনবোর্ড।
দখল, চাঁদাবাজি, অপরিচ্ছন্নতা, জলাবদ্ধতা ও ত্রাসের রাজত্ব কমেনি। আমরা মুখ খুলে বলতে পারি না। স্থানীয় বাসিন্দা যারা মুখ খুলে বলবেন, তারা বেশিরভাগ অপকর্মে নানানভাবে জড়িত।
‘এবার তো পরিবর্তনের কথা বলছেন প্রার্থীরা। তাহলে পরিবর্তনের জন্য যোগ্য প্রার্থী বেছে নেবেন।’ জবাবে তিনি বলেন, তা নিশ্চয়ই। দীর্ঘদিন পর ভোট দেওয়ার সুযোগ আসছে। আমি গ্রামের (কুড়িগ্রাম) ভোটার। গিয়ে ভোট দিয়ে আসবো।
একই এলাকার ডিম বিক্রেতা (নাম প্রকাশে অনাগ্রহী) বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা দখলবাজি ও চাঁদাবাজি। নির্বাচিত হলে এগুলো যারা বন্ধ করার কথা তারাই নিজেরাই জড়িয়ে যান। এর বাইরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জলাবদ্ধতা তো এখানকার দীর্ঘদিনের সমস্যা। সমাধান হয় অস্থায়ীভাবে। স্থায়ী সমাধান কেউ করে না।

একটু দূর এগিয়ে টেকনিক্যাল মোড়ে কথা হয় পাইকপাড়ার বাসিন্দা সেলিম মোল্লার সঙ্গে। এলাকার সমস্যা নিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন আমি এই এলাকায় থাকি। এখানকার বড় সমস্যা মাদক, কিশোর গ্যাং আর দখলবাজি।
গাবতলী টার্মিনাল, কল্যাণপুর, মিরপুর ১ এর কাঁচাবাজার, মিরপুর ১০; এসব এলাকায় আছে চাঁদাবাজি। পাশাপাশি অল্প বৃষ্টিতে জলাবদ্ধ হয়। অফিসগামী মানুষ ও স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়ে। নেই কোনো খেলার মাঠ।
তিনি বলেন, আসলে এলাকার সমস্যারতো শেষ নেই। প্রধান দুই দলের যারা নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন, সদিচ্ছা থাকলে সমাধান করতে পারবেন, সে যোগ্যতা তাদের আছে। তবে এখানে বিএনপির যিনি প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলি; একজন সাহসী ও বিপ্লবী নারী। শেখ হাসিনার আমলে গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাদের নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। তাকে নির্বাচিত করা উচিত। তার মতো বিপ্লবীরা হেরে গেলে কেউ আর বিপ্লবী হবে না।
মানুষের এসব সমস্যার কথা দ্বারে দ্বারে গিয়ে শুনছেন খোদ প্রার্থীরা। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন সমাধানের। সবুজ পরিচ্ছন্ন নিরাপদ ঢাকা গড়ার প্রত্যয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন বিএনপির মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলি। এরই অংশ হিসেবে মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও দুপুরে তামান্না পার্ক এলাকায় প্রচারণা চালিয়েছেন তিনি। এসময় তিনি নেতা নয়, সেবক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে বলেন, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা-১৪ আসনকে সন্ত্রাস, মাদক ও দখলবাজমুক্ত একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য এলাকা হিসেবে গড়ে তুলবো।
একইভাবে চাঁদাবাজ, মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত সমৃদ্ধ ঢাকা-১৪ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করছেন জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম (আরমান)। তার দৃঢ় প্রত্যয়-চাঁদাবাজি করিনি, করবো না, করতে দেবও না। মাদকমুক্ত সমাজ গড়বো। কেউ মাদকাসক্ত হয়ে গেলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেবো। প্রতিটি ওয়ার্ডে খেলার মাঠের ব্যবস্থা করবো। কাউন্দিয়া ও বনগাঁওয়ের মানুষের জন্য ব্রিজ করে দেবো। জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি রোডম্যাপ করে কাজ করবো।

মঙ্গলবার মিরপুর ২ নম্বর মসজিদ মার্কেট ও রূপনগর আবাসিক এলাকায় গণসংযোগ করেন আরমান। এসময় তিনি বলেন, জামায়াত চায়, জবাবদিহিতামূলক স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালিত ইনসাফভিত্তিক এক বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমরা একসঙ্গে কাজ করবো।
‘ক্লিন ঢাকা গ্রিন ঢাকা’ স্লোগানে মাঠে সক্রিয় স্বতন্ত্র ফুটবল প্রতীকের প্রার্থী (বিএনপির বিদ্রোহী) সৈয়দ আবু বকর ছিদ্দিক (সাজু)। তিনিও বলেন, ‘আমার মার্কা যেহেতু ফুটবল, সেহেতু যেখানে যাই সবার দাবি মাঠ। আমি স্থানীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে খেলার মাঠ তৈরির উদ্যোগ নেবো। স্পোর্টস একাডেমি, আইটি হাব সেন্টার করতে চেষ্টা করবো। জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করবো।’

কাউন্দিয়া, বনগাঁও এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৭, ৮, ৯, ১০, ১১ ও ১২ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৪ আসন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ডজনখানেক প্রার্থী। এর মধ্যে বিএনপির সানজিদা ইসলাম তুলি, জামায়াতের মীর আহমাদ বিন কাসেম, স্বতন্ত্র (বিএনপির বিদ্রোহী) প্রয়াত এমপি এসএ খালেকের ছেলে সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক (সাজু), জাতীয় পার্টির হেলাল উদ্দিন, এলডিপির সোহেল রানা, এবি পার্টির মনিরুজ্জামান, জেএসডির নুরুল আমিন, কমিউনিস্ট পার্টির রিয়াজ উদ্দিন, গণফোরামের জসিম উদ্দিন, ইসলামী আন্দোলনের আবু ইউসুফ, রিপাবলিকান পার্টির মো. লিটন ও সুপ্রিম পার্টির ওসমান আলী।
এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪৪। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩২ হাজার ৬৬, নারী ভোটার ২ লাখ ২৩ হাজার ৯৭৪ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার চারজন।
এসইউজে/এমআইএইচএস