ঢাকা-২

যানজট-ভূমিখেকো-মাদকমুক্ত কেরানীগঞ্জ চান ভোটাররা

মফিজুল সাদিক
মফিজুল সাদিক মফিজুল সাদিক , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৩৯ পিএম, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ঢাকা-২ আসনের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী/জাগো নিউজ

ঢাকার ঠিক পাশের উপজেলা কেরানীগঞ্জ। অথচ উপজেলাবাসীকে ঢাকায় প্রবেশ করতে গিয়ে পড়তে হয় সীমাহীন দুর্ভোগে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকতে হয় যানজটে। রাস্তার অবস্থাও ভয়াবহ। গ্যাস থাকে না, আছে মাদকের সহজলভ্যতা। সংসদ নির্বাচনে যে প্রার্থী এসব সমস্যা সমাধানে বেশি মনোযোগী জয়ের পাল্লা তার দিকেই ঝুঁকবে বলে মনে করেন ভোটাররা।

কেরানীগঞ্জ উপজেলার কালিন্দী, বাস্তা, শাক্তা, রোহিতপুর, তারানগর, কলাতিয়া, হযরতপুরসহ সাতটি ইউনিয়ন ও পার্শ্ববর্তী সাভার উপজেলার আমিনবাজার, ভাকুর্তা ও তেঁতুলঝড়ার তিনটি ইউনিয়ন নিয়ে ঢাকা-২ নির্বাচনি আসনের সীমানা।

সরেজমিনে দেখা যায়, বছিলা ব্রিজ হয়ে মোহাম্মদপুরে পৌঁছাতে জটলায় হিমশিম খেতে হয় কেরানীগঞ্জবাসীকে। অন্যদিকে বাবুবাজার ব্রিজ হয়ে ঢাকা প্রবেশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথেই নষ্ট হয়। বছিলা ব্রিজ থেকে মোহাম্মদপুর পর্যন্ত ঘণ্টার পর ঘণ্টা জটলায় আটকে থাকতে হয়। ঢাকার প্রবেশদ্বার জটলামুক্ত চান ঢাকা-২ আসনের বাসিন্দারা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি-জামায়াতের পাশাপাশি ভোটের মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও। আসনটিতে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন ডাকসুর সাবেক ভিপি, চারবারের সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান। জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী কর্নেল (অব.) মো. আব্দুল হক। ঢাকা-২ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৯ হাজার ২১৫। ভোটকেন্দ্র ১৪১টি।

মূল সমস্যা ভাঙা সড়ক-যানজট

আঁটিবাজারের ফল ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম জুবায়ের বলেন, ‘প্রতিদিন ব্যবসায়িক কাজে ঢাকার মিরপুরে যেতে হয়। কিন্তু বছিলা ব্রিজ থেকে মোহাম্মদপুর সড়কে ভয় লাগে। এই সড়কে সব সময় জটলা লেগে থাকে। এছাড়া বাবুবাজার গুলিস্তান হয়ে ঢাকায় প্রবেশ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে জটলায় পড়েন এলাকাবাসী। আমরা এ সমস্যার সমাধানের নিশ্চয়তা চাই।’

ঢাকার কেরানীগঞ্জের প্রাণকেন্দ্র কদমতলী গোলচত্বর ঢাকা জেলার প্রধান দুটি মহাসড়কের সংযোগস্থল। স্থানীয় দুটি সড়কও যুক্ত হয়েছে এখানে। সড়কগুলো দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করে ট্রাক, মালবাহী কাভার্ডভ্যান, পিকআপভ্যান, দূরপাল্লার বাস, গণপরিবহনসহ শত শত যানবাহন। এছাড়া গোলচত্বর এলাকা দিয়ে প্রতিদিন পারাপার হয় শিক্ষার্থী, নারী, শিশুসহ হাজারো পথচারী। অথচ ওই এলাকায় সড়ক পারাপারে নেই কোনো পদচারী সেতু, জেব্রা ক্রসিং কিংবা আন্ডারপাস। ফলে প্রায়ই সেখানে ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।

ঢাকা-২ আসনের খোলামোড়ার ভোটার ওয়াদুদ হোসেন। ছোট মুদির দোকান আছে তার। ব্যবসার কাজে প্রায়ই ঢাকার গুলিস্তানে যেতে হয় তাকে। কিন্তু সহজেই ঢাকায় আসতে পারেন না তিনি।

ওয়াদুদ হোসেন বলেন, কেরানীগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসার কথা মনে পড়লে ভয় লাগে। মাঝে মধ্যে বাবুবাজার সেতুতে বসে থাকতে হয়। পৃথিবীর কোথাও ব্রিজের ওপর বাস স্টপেজ নেই। কিন্তু বাবুবাজার ব্রিজের ওপর সব বাস থেমে থাকে যাত্রী নেওয়ার জন্য। আমরা চাই কেরানীগঞ্জ থেকে গুলিস্তানে দ্রুত যাতায়াতের উন্নত সড়ক।’

কেরানীগঞ্জের অধিকাংশ অলিগলির সড়কের বেহাল দশা। ঘাটারচর থেকে আঁটিবাজার যোগাযোগ সড়কও খানাখন্দে ভরা। এ সড়কে একটি সেতু নির্মিত হয়েছে। কিন্তু সংযোগ সড়ক না থাকায় মিলছে না সুবিধা।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের বাস্তা ইউনিয়নের রাজাবাড়ি এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ সড়কেরও বেহাল দশা। দীর্ঘদিন রাস্তাটি সংস্কার না হওয়ায় একটু বৃষ্টি হলেই মরণফাঁদে পরিণত হয়। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণেও চরম ভোগান্তিতে থাকেন বাসিন্দারা। কেরানীগঞ্জের ওয়াশপুর থেকে নয়াবাজার পর্যন্ত রাস্তার দশাও বেহাল। শুভাঢ্যা ইউনিয়নের সড়ক দেখে বোঝার উপায় নেই এটি ঢাকার কোনো সড়ক। শুভাঢ্যা সাবান ফ্যাক্টরি সড়কের অবস্থা আরও বেহাল। অথচ ভূমি অফিস ও এসিল্যান্ড অফিসে সেবা নিতে আসা সেবাগ্রহীতাদের দুর্ভোগ পোহাতে হয় গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কে।

রোহিতপুর বাজারের ব্যবসায়ী জুবায়ের ফয়সাল বলেন, এই সড়কে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। বড় বড় ট্রাক বিকল হয়ে মাঝে মধ্যেই যানজট সৃষ্টি করে রাস্তায়।’

হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক

কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন কালিন্দী ইউনিয়নের মাদারীপুর এলাকায় মাদকের ভয়াবহতা বেড়েছে। এলাকায় সংঘবদ্ধ একটি চক্র প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করছে। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে তৈরি হয়েছে চরম উৎকণ্ঠা ও নিরাপত্তাহীনতা। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান চান ভোটাররা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রামের কান্দার এক বাসিন্দা বলেন, ‘এখানকার ছেলেরা এখন সেভাবে খেলাধুলা করে না। অথচ রাত হলেই সংঘবদ্ধ হয়ে মাদক সেবন করে।’



গ্যাস সংকট

এলাকাবাসীর অভিযোগ, দিনে-রাতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কার্যত এক ঘণ্টাও নিয়মিত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। প্রায় দুই মাস ধরে গভীর রাত, বিশেষ করে ৩টার দিকে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস এলেও গত ১৬ দিন ধরে তাও বন্ধ। কেরানীগঞ্জ উপজেলার আঁটিবাজার, কালিন্দি, নেকড়োজবাগ, বামুনসুর, কলাতিয়া, আঁকছাইল, নিশানবাড়ি, বেলনা, তালেপুর, মোরাগুনা, জয়নগর ও ভাওয়ালসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, প্রায় সব এলাকায়ই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ। লাইনের গ্যাস না থাকায় সিলিন্ডার এখন প্রধান ভরসা। সেটার দামও দ্বিগুণ।

আঁটিবাজার সুজন হাউজিংয়ের বাসিন্দা তারিকুল ইসলাম বলেন, সাড়ে ১৩শ টাকার গ্যাস ২ হাজার ৩০০ টাকায়ও পাচ্ছি না। রাতের আঁধারে গ্যাস হাওয়া হয়ে যায়। যিনি নির্বাচিত হবেন আমরা তার কাছে এসব সমস্যার সমাধান চাই।

ভূমিদখল

ঢাকার পাশের উপজেলা হওয়ায় কেরানীগঞ্জের জমির দাম অনেক বেশি। ফলে জমি নিয়ে দুশ্চিন্তায় মালিকরা। জোর করে রাতের আঁধারে জমি দখল করে বালু ভরাট করা হচ্ছে। কোনো আবাসন ব্যবসায়ী হয়তো ১০ একর জমি কিনেছেন। অথচ জোর করে আশপাশের আরও জমি তিনি বালু ভরাট করে দখল করে নেন। ফলে বাধ্য হয়ে জমি বিক্রি করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘শাক্তা ইউনিয়নে আমার ছয় শতাংশ জমি ছিল। অথচ আমাকে না বলে রাতারাতি বালু ভরাট করে ফেলা হয়। জমিতে আম-কাঁঠালের গাছও ছিল। এসব গাছসহ ভরাট করা হয়। ভয়ভীতি দেখিয়ে জোর করে কিছু টাকা দিয়ে জমি আমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়। যেই নির্বাচিত হোক আমাদের দাবি ভূমিদস্যুরা যেন কারও জমি দখল না নিতে পারে।’

এমওএস/এএসএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।