বয়ামে বাঘ-সিংহ, খাঁচায় নীল তিমি

সাইফুল হক মিঠু
সাইফুল হক মিঠু সাইফুল হক মিঠু
প্রকাশিত: ০২:১১ পিএম, ১৮ মে ২০২৬
জাদুঘরে বয়ামে বাঘ-সিংহের বাচ্চা ও খাঁচায় রয়েছে নীল তিমির কঙ্কাল/ ছবি- জাগো নিউজ

শাবক কোলে মা শিম্পাঞ্জি, কোথাও কালো বাঘ, পাহাড়ি সিংহ, বনরুই কিংবা লাল পান্ডা। ডানা মেলে আছে পাখিও। বাদ যায়নি কুমির, মাছ, নীল তিমিও। তবে এদের কেই-ই জীবিত নয়, এখানে মৃতদের নানান প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করে রাখা হয়। এখানে বয়ামে রাখা রয়েছে বাঘ-সিংহের বাচ্চাসহ নানান প্রাণী। লোহার বড় খাঁচায় রাখা আছে নীল তিমির কঙ্কাল।

jagonews24.com

রাজধানীর বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানার এক কোণে নীরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে এ জাদুঘর। এখানে রয়েছে বহু মৃত প্রাণীর সংরক্ষিত অবয়ব। কোথাও শাবক কোলে মা শিম্পাঞ্জি, কোথাও কালো বাঘ, পাহাড়ি সিংহ, বনরুই কিংবা লাল পান্ডা। তারা কেউ জীবিত নয়; মৃত্যুর পর বিশেষ প্রক্রিয়ায় তাদের চামড়া, মুখমণ্ডল ও কঙ্কাল সংরক্ষণ করে তৈরি করা হয়েছে জীবন্তসদৃশ অবয়ব। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বিলুপ্ত ও দুর্লভ প্রাণীদের পরিচয় তুলে ধরতেই গড়ে উঠেছে এই প্রাণী জাদুঘর।

জাদুঘরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে বিশাল এক তিমির কঙ্কাল। কাচে ঘেরা সেই কঙ্কাল দর্শনার্থীদের বিস্মিত করে। ভেতরে রয়েছে নানান ধরনের সংরক্ষিত প্রাণী, ডিম ও ভ্রূণ। কোথাও বোতলভর্তি ফরমালিনে রাখা সাপ, মাছ কিংবা কচ্ছপের ডিম; কোথাও আবার স্টাফিং করা বাঘ, শিম্পাঞ্জি বা জিরাফ।

তবে, এই জাদুঘরে পিরানহা মাছের মতো আরও কয়েক জাতের মাছ অ্যাকুরিয়ামে সংরক্ষিত আছে। আছে কচ্ছপ, ক্যাট ফিশ, জেব্রা তেলাপিয়া, রেইনবোন শার্ক, সিলভার ডলার, অ্যানজেল ফিশ, টাইগার বার্ব (মাছ), ব্লু গোরামি, কিসিং গোরামি, কমেট ফিশের মতো জলজ প্রাণী। তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, জনবল সংকটসহ নানান কারণে এখন জাদুঘরটির অনেক সংগ্রহই নষ্ট হওয়ার পথে।

jagonews24.com

জাদুঘরটিতে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। মাত্র ১০ টাকার টিকিটে দুর্লভ অনেক মৃত পশু-পাখির দেখা মিলবে এখানে। সঙ্গে রয়েছে অ্যাকুরিয়ামে নানান জাতের মাছ দেখার সুযোগ।

আরও পড়ুন
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে যা আছে দেখার 
ঢাকার নগর জাদুঘর দেখতে যায় না ‘কেউ’ 
চার দশকেও অন্তরালে ওসমানী জাদুঘর 

চিড়িয়াখানায় প্রবশে করতেই বানরের খাঁচা। সেখানেই মেলে এই জাদুঘরের টিকিট। টিকিট কাউন্টার থেকে দক্ষিণ দিকে প্রায় ১০ মিনিট হাঁটার দূরত্বে হাতির খাঁচার সঙ্গেই জাদুঘরটির অবস্থান। জাদুঘরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে বিশাল এক তিমির কঙ্কাল। কাচে ঘেরা সেই কঙ্কাল দর্শনার্থীদের বিস্মিত করে। ভেতরে রয়েছে নানান ধরনের সংরক্ষিত প্রাণী, ডিম ও ভ্রূণ। কোথাও বোতলভর্তি ফরমালিনে রাখা সাপ, মাছ কিংবা কচ্ছপের ডিম; কোথাও আবার স্টাফিং করা বাঘ, শিম্পাঞ্জি বা জিরাফ। দুটে রুমে সংরক্ষিত আছে এসব প্রাণী। এছাড়া এক রুমে বিভিন্ন অ্যাকুরিয়ামে রয়েছে মাছসহ নানান জলজ প্রাণী।

jagonews24.com

মূলত তিনটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় প্রাণী সংরক্ষণে- স্টাফিং, স্কেলিটন ও স্পেসিম্যান। স্টাফিং পদ্ধতিতে মৃত প্রাণীর চামড়া ও মাথা সংরক্ষণ করে ফোম বা তুলাজাতীয় উপকরণ দিয়ে আগের অবয়ব তৈরি করা হয়। এভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে শিম্পাঞ্জি, বনমানুষ, কালো বাঘ, উদ, বনরুই, ম্যাকাউ পাখি, লাল পান্ডা ও মণিরাজ সাপসহ শতাধিক প্রাণী।

জাদুঘরটির বর্তমান অবস্থা নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। দীর্ঘদিন এখানে নেই কোনো ট্যাক্সিডার্মিস্ট — যাদের কাজ মৃত প্রাণী সংরক্ষণ ও পরিচর্যা করা। ফলে চিড়িয়াখানায় মারা যাওয়া বহু প্রাণী সংরক্ষণ না করে মাটিচাপা দিতে হয়েছে।

স্কেলিটন পদ্ধতিতে প্রাণীর হাড় দিয়ে তৈরি করা হয় পূর্ণাঙ্গ কঙ্কাল। বর্তমানে জাদুঘরে দুটি বৃহৎ নীল তিমি, একটি কুমির, একটি মুরগি ও একটি কবুতরের কঙ্কাল সংরক্ষিত আছে। স্পেসিম্যান পদ্ধতিতে মৃত প্রাণীকে হুবহু ফরমালিনে সংরক্ষণ করা হয়। এভাবে রাখা হয়েছে পঙ্খিরাজ সাপ, বংকরাজ সাপ, শকুনের ডিম, হাঙর, চিতা বাঘের শাবক ও সামুদ্রিক ছুরি মাছসহ আরও ৭৪টি নমুনা।

jagonews24.com

শিশুদের কাছে এটি যেন বিস্ময়ের এক জগৎ। গাজীপুর থেকে আসা এক খুদে দর্শনার্থী মুশফিক বিশাল কালো বানর দেখে বিস্মিত হয়ে বলে ওঠে, ‘এত বড় বানর!’ আবার কেউ কেউ প্রথমবারের মতো কাছ থেকে কালো বাঘ বা লাল পান্ডা দেখে অভিভূত হয়। ছোট শিশু আইমিনার প্রশ্ন প্রাণীগুলো নড়াচড়া করে না কেন?

আরও পড়ুন
ঢাকার কোন জাদুঘর কখন খোলা থাকে 
ঘুরে আসুন ভাষা জাদুঘর 
সোনারগাঁও জাদুঘরে যা যা দেখবেন 

তবে জাদুঘরের জায়গা ছোট হওয়ায় ও পর্যাপ্ত আলো-বাতাস না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন কোনো কোনো দর্শনার্থী। গাজীপুরের কোনাবাড়ি থেকে আসা মিনহাজুল বলেন, এমন লাইটিং কিছুই পরিষ্কার করে দেখা যায় না। কয়েকজন ঢুকলেই গাদাগাদি করে দেখতে হয়। এখানে জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কেউ নেই। বাইরে লেখা— ছবি তোলা নিষেধ, অথচ ভেতরে দেদারসে সবাই ছবি-ভিডিও নিচ্ছে।

jagonews24.com

জাদুঘরটির বর্তমান অবস্থা নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। দীর্ঘদিন এখানে নেই কোনো ট্যাক্সিডার্মিস্ট — যাদের কাজ মৃত প্রাণী সংরক্ষণ ও পরিচর্যা করা। জাদুঘরে ট্যাক্সিডার্মিস্টের দুটি পদ থাকলেও কয়েক বছর ধরে শূন্য। ফলে চিড়িয়াখানায় মারা যাওয়া বহু প্রাণী সংরক্ষণ না করে মাটিচাপা দিতে হয়েছে।

বর্তমানে এ জাদুঘরে ছয়জন কর্মরত থাকলেও অধিকাংশই পরিচ্ছন্নতা ও সাধারণ রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করেন। দক্ষ জনবল না থাকায় সংরক্ষিত অনেক প্রাণীর অবয়ব নষ্ট হয়ে গেছে। সাদা হনুমান, উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি ও চশমা বানরের মতো স্টাফিং করা প্রাণীর দেহ বিবর্ণ হয়ে গেছে। আবার কিছু পাখির পালক ঝরে পড়েছে।

jagonews24.com

জানতে চাইলে জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার জাগো নিউজকে বলেন, জাদুঘর আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয়েছে। এর কলেবর বাড়ানোও প্রয়োজন। জায়গা বাড়িয়ে যাতে দর্শনার্থীরা সুন্দরভাবে পরিদর্শন করতে পারেন, সেজন্য কাজ করা দরকার। নমুনাগুলো আরও ভালোভাবে রাখাও প্রয়োজন। দর্শনার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্য দিতে ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা, আলো বাতাসের ব্যবস্থা করা দরকার। এজন্য ভৌত কাঠামোর পরিবর্তন প্রয়োজন। সেগুলো নিয়েও কাজ করছি আমরা।

jagonews24.com

দীর্ঘদিন এখানে ট্যাক্সিডার্মিস্ট পদে কেউ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এসব পদে দ্রুত লোকবল প্রয়োজন। সেটা দ্রুত সমাধান হবে। এ জাদুঘরের মূল উদ্দেশ্য বিরল ও হারিয়ে যাওয়া প্রজাতিগুলোর দেহাবশেষ সংরক্ষণ করা, এর মাধ্যমে দর্শনার্থীদের প্রাণীদের ধারণা দেওয়া। জাদুঘরে ৭০টি প্রাণীর স্পেসিম্যান রাখা আছে। সংরক্ষিত আছে আরও বেশকিছু প্রাণীর চামড়া, ডিম ও কঙ্কাল।

এসএম/কেএসআর/এমএফএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।