ইমিগ্রেশন পার হতে গিয়ে জানলেন অস্ট্রেলিয়ার ভিসা ভুয়া
অস্ট্রেলিয়ার জালভিসা দেওয়া মানবপাচার চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব-৪)। গ্রেফতাররা হলেন- মো. তারেকুল ইসলাম (৪৫), মো. মাইনুদ্দিন ভূইয়া (৪৮), মো. নেওয়াজ (৪৫), আবু হাসান (৪৮)।
র্যাব বলছে, মূলত অস্ট্রেলিয়ার ভিসা পাওয়ার সব ধরনের নথিপত্র ওয়েবসাইটে দেওয়া হতো। এই প্রক্রিয়াকে অনুসরণ করে টিআই ট্রেডিং করপোরেশন নামক একটি মানবপাচারকারী প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অ্যাপের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন জানিয়ে ব্যক্তিপ্রতি হাতিয়ে নেন ২১ লাখ টাকা। পরে ভুক্তভোগী নির্ধারিত তারিখে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া শেষ করতে গিয়ে জানতে পারেন তাদের সব কাগজপত্র ভুয়া এবং বাংলাদেশে অবস্থিত অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনে গিয়ে তারা জানতে পারেন প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরের পাইকপাড়া র্যাব ৪ ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরে ‘অস্ট্রেলিয়ার জাল ভিসা দিয়ে মানবপাচার, সংঘবদ্ধ চক্রের মূলহোতাসহ চারজন গ্রেফতার ও আলামত জব্দ সংক্রান্ত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান র্যাব ৪ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মাহবুব আলম।
তিনি বলেন, র্যাব-৪ সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলের পাশাপাশি বিভিন্ন সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য কাজ করছে। এর আগে চায়না ও রাশিয়ায় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করে মানবপাচারকারী সংঘবদ্ধ চক্রকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল (২ মার্চ) গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র্যাব-৪ এর একটি যৌথ আভিযানিক দল ঢাকা মহানগরীর উত্তরা কাওলাবাজার ও যাত্রাবাড়ী শনির আখড়া এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে মানবপাচার মামলার চার আসামিকে গ্রেফতার করে।
তিনি আরও বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা টিআই ট্রেডিং করপোরেশন নামক ভিসা প্রসেসিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডায় মানবপাচার করে আসছিলেন। ভুক্তভোগী মো. শরীফ মোল্লা (২৮) গ্রেফতার আসামিদের পূর্ব পরিচত এবং তাদের মাধ্যমে এজেন্সির বাকি সদস্যদের সঙ্গে ভুক্তভোগীদের পরিচয় হয়।

ভুক্তভোগী মো. শরীফ মোল্লা (২৮), ও তার ভাতিজা ওমর ফারুক, চাচাতো ভাই আবুল কালাম এবং ভাগিনা সাজ্জাদ হোসেনকে বিদেশ পাঠানোর জন্য ২০২৫ সালের ১২ মে এবং পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে আসামি মো. তারেকুল ইসলাম (৪৫) এর পল্লবী থানায় বাসা ও অফিসে গিয়ে এশিয়া ব্যাংক টিআর গ্রুপ নামক হিসাব নম্বরে সর্বমোট ৯৪ লাখ টাকা পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা করেন। এরপর আসামিরা ভুক্তভোগীদের জানান, কয়েক দিনের মধ্যে তাদের অস্ট্রেলিয়ায় পাঠাবে। কিন্তু অনেক দিন অতিবাহিত হলেও আসামিরা তাদের বিদেশ পাঠাতে না পারায় ভুক্তভোগীরা আসামিদের অফিসে বারবার তাগাদা দেয়। এক পর্যায়ে টিআই ট্রেডিং করপোরেশন কর্তৃপক্ষ ভুক্তভোগীদের ভিসা ও টিকিট ইস্যু করে কিন্তু তারা অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের মাধ্যমে জানতে পারে যে ভিসা ও টিকিট দুইটাই ভুয়া। আসামিরা প্রতারক চক্রের সদস্য এবং তাদের সঙ্গে অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ করে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এছাড়াও টাকা ফেরতের কথা বললে বিভিন্ন ভয়ভীতি ও হুমকি দেখিয়ে তাদের তাড়িয়ে দেয়।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগীরা পল্লবী থানায় একটি মামলা করেন। র্যাব-৪ এর একটি আভিযানিক দল জড়িত আসামিদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করেন। গতকাল (২ মার্চ) আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করে ঢাকা মহানগরীর উত্তরা কাওলাবাজার ও যাত্রাবাড়ী শনির আখড়া এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে মূলহোতা মো. তারেকুল ইসলামসহ (৪৫) চারজনকে গ্রেফতার করা হয়।
তিনি বলেন, আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণার মাধ্যমে অনেক বাংলাদেশিকে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডায় পাঠানোর নামে টাকা আত্মসাৎ করে আসছেন। আসামিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় এনআই অ্যাক্ট এর গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ার ভিসা প্রক্রিয়ায় কারোর ভিসা হলে তার সব নথি অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতারক এই চক্রটি এই প্রক্রিয়াকে অনুসরণ করে নিজেদের তৈরি ভুয়া একটি অ্যাপের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন জানিয়ে ব্যক্তি প্রতি নির্ধারিত ২১ লাখ টাকা জমা নেয়। এরপর তারা ভুক্তভোগীদের সব টাকা জমা নিয়ে অফিস বন্ধ করে হারিয়ে যায় এবং নতুন স্থানে গিয়ে নতুন করে একই প্রক্রিয়ায় প্রতারণা শুরু করে।
তিনি বলেন, পরে ভুক্তভোগী নির্ধারিত তারিখে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া অতিক্রমের সময় তাদের আটকে দেওয়া হয় এবং তাদের জানানো হয় তাদের সব কাগজপত্র ভুয়া। এরপর ভুক্তভোগীরা বাংলাদেশে অবস্থিত অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনে গিয়ে জানতে পারেন প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
গ্রেফতার আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কেআর/এমআরএম