বগুড়া-শেরপুরে ভোটগ্রহণ শেষের আগেই গণনা শুরু: এএফইডির পর্যবেক্ষণ 

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:১৩ পিএম, ১১ এপ্রিল ২০২৬
নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা অ্যালায়েন্স ফর ফেয়ার ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসির (এএফইডি) সংবাদ সম্মেলন/ছবি: জাগো নিউজ

শেরপুর-৩ আসনে নির্বাচন ও বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার আগেই গণনা শুরুর ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা অ্যালায়েন্স ফর ফেয়ার ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসির (এএফইডি) পর্যবেক্ষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে। 

সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদিও অধিকাংশ কেন্দ্রে নির্ধারিত নিয়ম মেনে ভোটগ্রহণ শেষে গণনা শুরু হয়, তবে কিছু ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে সরকারি সময়সীমা পূর্ণ হওয়ার আগেই ব্যালট গণনা শুরু করা হয়।

শনিবার (১১ এপ্রিল) এক সংবাদ সম্মেলন করে এই পর্যবেক্ষণ তথ্য তুলে ধরা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত এই পর্যবেক্ষণে এএফইডি ৫৩ জন পর্যবেক্ষক মোতায়েন করে। যার মধ্যে ৩০ জন ছিলেন বগুড়া-৬ আসনে এবং ২৩ জন শেরপুর-৩ আসনে।

সংবাদ সম্মেলনে এএফইডি’র মুখপাত্র হারুন-অর-রশিদ বলেন, ভোটাররা সাধারণভাবে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরেছেন। তবে ভোটকেন্দ্রের প্রবেশযোগ্যতা, প্রক্রিয়াগত শৃঙ্খলা এবং নির্বাচনি আচরণবিধি মানার ক্ষেত্রে আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা সাধারণভাবে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়া লক্ষ্য করেছি, যেখানে ভোটাররা অংশগ্রহণ করতে পেরেছেন। একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি আনা গেলে নির্বাচনের প্রতি আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।

ভোটগ্রহণ ও অনিয়মের চিত্র
পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনে শুরু হয় এবং ব্যালট বাক্স খালি দেখিয়ে সিল করা হয়। ভোটের গোপনীয়তাও বজায় ছিল। তবে ৩২ শতাংশ ভোটকেন্দ্র প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য যথাযথভাবে প্রবেশযোগ্য ছিল না।

ভোটের দিন ১০৩টি পর্যবেক্ষণের মধ্যে মাত্র তিনটিতে সারি ব্যবস্থাপনায় সমস্যা দেখা গেছে। তবে ১২ শতাংশ ক্ষেত্রে ভোটার পরিচয় যাচাই প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এ ছাড়া ১১ শতাংশ কেন্দ্রে প্রক্সি ভোটের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একটি কেন্দ্রে শারীরিক সহিংসতা বা ভয় প্রদর্শনের ঘটনাও লক্ষ্য করা হয়েছে।

আচরণবিধি লঙ্ঘন
এএফইডি জানায়, প্রায় ৪৭ শতাংশ ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্রের আশপাশে প্রচারণার সামগ্রী দেখা গেছে, যা নির্বাচনি আচরণবিধির পরিপন্থী। ১২টি ক্ষেত্রে অনুমোদনহীন ব্যক্তিদের ভোটকেন্দ্রের বাইরে নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে এবং ১৫টি ক্ষেত্রে ভোটারদের ভোট দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া প্রায় অর্ধেক কেন্দ্রে ভোটারদের দলবদ্ধভাবে একই যানবাহনে আনা হয়েছে, যা সংগঠিত পরিবহনের ইঙ্গিত দেয়।

ভোটার উপস্থিতি কম
এই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় কম ছিল। পর্যবেক্ষণে সর্বোচ্চ ৬৪ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন ৩১ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি দেখা গেছে। অনেক কেন্দ্রে দীর্ঘ সময় ভোটার উপস্থিতি ছিল না বলেও উল্লেখ করা হয়।

শেরপুর-৩ আসনে নির্বাচন বর্জন
শেরপুর-৩ আসনে ভোট চলাকালীন অনিয়মের অভিযোগ তুলে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী মো. মাসুদুর রহমান নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। তিনি ব্যালট বাক্সে অতিরিক্ত ভোট প্রদান এবং এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। তবে এই ঘোষণার তাৎক্ষণিক প্রভাব ভোটারদের ওপর পড়েনি বলে জানায় এএফইডি।

গণনা ও ফল প্রকাশ
ভোটগ্রহণ শেষে সারিতে থাকা সব ভোটারকে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। অধিকাংশ কেন্দ্রে দ্রুত গণনা শুরু হলেও কিছু ক্ষেত্রে বিলম্ব হয়েছে এবং কয়েকটি কেন্দ্রে নির্ধারিত সময়ের আগেই গণনা শুরু করার ঘটনাও দেখা গেছে।

দুটি কেন্দ্র ছাড়া সব কেন্দ্রে ফলাফল প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা হয়েছে। চারটি ক্ষেত্রে এজেন্টদের আংশিকভাবে গণনা পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়।

ডাকযোগে ভোটে অংশগ্রহণ কম
বগুড়া-৬ আসনে ডাকযোগে প্রদত্ত ভোটের অংশগ্রহণ ছিল সীমিত। ৩,৭৩৬টি ব্যালটের মধ্যে ফেরত এসেছে ১,০৬৮টি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যালট যথাযথ ঘোষণাপত্র ছাড়া জমা পড়েছে এবং কিছু বাতিল হয়েছে।

এএফইডির মতে, ডাকযোগে ভোটের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হলেও অংশগ্রহণ ও নিয়ম মেনে চলার ক্ষেত্রে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

সুপারিশ

পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এএফইডি কয়েকটি সুপারিশ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে—
১. নির্বাচন কমিশনকে ভোটকেন্দ্র কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ আরও জোরদার করতে হবে, যাতে সব সময় প্রক্রিয়াগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়।
২. প্রতিটি ভোটকেন্দ্র যেন সব ভোটারের জন্য প্রবেশযোগ্য হয়, যার মধ্যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত, তা নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।
৩. রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনের দিনে প্রচারণা-নিষিদ্ধ নিয়ম মেনে চলতে হবে এবং এমন কোনো কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে হবে যা প্রভাব বিস্তার বা ভয় প্রদর্শন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
৪. দেশীয় ও বিদেশি ভোটগ্রহণের পাইলট কার্যক্রম থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা এই প্রক্রিয়াকে আরও উন্নত করতে ব্যবহার করা উচিত।
৫. ডাকযোগে ভোট প্রদানের যোগ্যতা সম্প্রসারিত করে অতিরিক্ত সেইসব কমিউনিটিকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত যারা সরাসরি ভোট প্রদানে বাধার সম্মুখীন হন বা সুযোগ পান না—যেমন অনুমোদিত নির্বাচন পর্যবেক্ষক, গণমাধ্যমকর্মী এবং প্রতিবন্ধী ভোটাররা।

এক প্রশ্নের উত্তরে ডেমোক্রেসি ওয়াচের চেয়ারপারসন এবং এএফইডি বোর্ড সদস্য তালেয়া রহমান বলেন, পুরো দুনিয়াতেই ভোটে কিছু বিচ্যুতি থাকে। আমাদের এখানেও হয়।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন রাইট যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক এবং এ ডর্প’র চেয়ারপারসন এইচ এম নওমান।

এমএএস/এমএমকে

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।