নারী সেজে ফাঁদ-ব্ল্যাকমেইল-ধর্ষণ: জিডির সূত্রে গ্রেফতার রাব্বি

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:২৬ পিএম, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
গ্রেফতার রাশেদুল ইসলাম রাব্বি

রাজধানীর মিরপুরে নারী সেজে তরুণীদের ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল, ধর্ষণ ও পর্নোগ্রাফি তৈরির অভিযোগে একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

পুলিশ বলছে, গ্রেফতার রাশেদুল ইসলাম রাব্বি (৩০) প্রথমে নারী সেজে ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সী তরুণীদের সঙ্গে সক্ষতা গড়ে তোলেন। এরপর ফাঁদে ফেলে তাদের ব্ল্যাকমেইল করে ধর্ষণ করেন। এরপর ভুক্তভোগীর মোবাইল ফোন নিয়ে তা বিক্রি করে দেন। পরে ভুক্তভোগীরা মোবাইল ফোনের বিষয়ে জিডি করেন। এমন একটি জিডির সূত্র ধরে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।

গ্রেফতার রাব্বি যাকে বিয়ে করেছেন তাকেও এমন ফাঁদে ফেলে বিয়ে করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

বুধবার (১৫ এপ্রিল) দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে একটি অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করা হলেও পরে একের পর এক অভিযোগ আসতে থাকে। এখন পর্যন্ত একই ধরনের ১০টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত ১৩টি ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

গ্রেফতার রাব্বির অপরাধের ধরণ ছিল ভিন্ন ও কৌশলী। প্রথমে কোনো এক তরুণীকে ব্ল্যাকমেইল করে তার মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিতেন। এরপর সেই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তার বন্ধু তালিকায় থাকা অন্যান্য তরুণীদের সঙ্গে নারী পরিচয়ে যোগাযোগ করতেন।

ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে বিভিন্ন অজুহাতে দেখা করতে ডাকতেন। কখনো গিফট পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে নির্দিষ্ট স্থানে আসতে বলতেন। পরে নিজেকে আত্মীয় পরিচয় দিয়ে ভুক্তভোগী মেয়েদের নিয়ে যেতেন নির্জন বাসায়।

মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী আরও বলেন, যাত্রাবাড়ীর দনিয়া কলেজ এলাকার দুটি বাসা ব্যবহার করে এসব অপরাধ সংঘটিত হতো। সেখানে নিয়ে গিয়ে ভুক্তভোগী তরুণীদের ব্ল্যাকমেইল করা হতো এবং অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে।

যেভাবে অপরাধ করতেন রাব্বি

রাব্বি প্রথমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি ফেক আইডি খোলেন এবং মেয়ে কণ্ঠে কথা বলে তরুণীদের কাছ থেকে কৌশলে তার মোবাইলটি নিয়ন্ত্রণে নেন। এরপর ওই ফোনে লগইন করা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ও সিম ব্যবহার করে নারী কণ্ঠে কথা বলে ভুক্তভোগী তরুণীর বন্ধু তালিকায় থাকা স্কুল ও কলেজের ছাত্রীদের টার্গেট করতেন।

নারী কণ্ঠে কথা বলে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে তোলার পর উপহার আদান-প্রদানের কথা বলে ভুক্তভোগীদের যাত্রাবাড়ীর গোয়ালবাড়ী মোড়ে একটি নির্মাণাধীন ভবনের পঞ্চম তলায় নিয়ে যেতেন। সেখানে ভুক্তভোগীদের ধর্ষণ এবং সেই দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করে রাখতেন।

jagonews24

পরে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে থাকা নগদ টাকা, মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নিতেন। ধারণকৃত ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল বা পর্নো সাইটে আপলোড করার হুমকি দিয়ে তিনি ভুক্তভোগীদের পুনরায় শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করতেন এবং নিয়মিত টাকা আদায় করতেন।

গত ২০ মার্চ দুপুর ১টা ২০ মিনিটের দিকে একজন মেয়েকে ফ্যামিলি মিট-আপের কথা বলে একটি নির্মাণাধীন ভবনে নিয়ে যান রাব্বি। সেখানে পৌঁছানো মাত্রই তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নগ্ন করে ভিডিও ধারণ করা হয়। পরে সেই নগ্ন ভিডিও ডার্ক পর্নো সাইট ও টেলিগ্রামে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে তাকে শারীরিক সম্পর্কের জন্য নিয়মিত চাপ দিতে থাকেন।

পরে রাব্বি প্রথম ভুক্তভোগীর মোবাইল ব্যবহার করে তার ফ্রেন্ড লিস্টে থাকা অপর এক ভুক্তভোগী নারীকে টার্গেট করেন। গত ৬ এপ্রিল পোশাক ডেলিভারি দেওয়ার কথা বলে দ্বিতীয় ভুক্তভোগী নারীকে যাত্রাবাড়ীর গোয়ালবাড়ি মোড় সংলগ্ন একটি নির্মাণাধীন ভবনের চতুর্থ তলায় ডেকে নেন। সেখানে তাকে দুই ঘণ্টা আটকে রেখে ধর্ষণ করা হয় এবং তার মোবাইল ও নগদ টাকা লুটে নেওয়া হয়।

ওয়ারী বিভাগের ডিসি আহসান সামী আরও বলেন, মানসম্মানের ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী নারী প্রকৃত ঘটনা গোপন করে শুধু মোবাইল হারানোর জিডি করেছেন। এসব জিডির সূত্র ধরেই ধীরে ধীরে ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করা হয়।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত পুলিশ তিনটি মামলা করেছে এবং আরও অন্তত চারটি জিডি রয়েছে।

অধিকাংশ ভুক্তভোগীর বয়স ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে এবং তারা সবাই মিরপুর এলাকার বাসিন্দা।

এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, অভিযুক্ত প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ ও অত্যন্ত ধুরন্ধর হওয়ায় তাকে গ্রেফতারে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। এমনকি তাকে ধরতে পুলিশের সদস্যদের রিকশা চালিয়েও অভিযান চালাতে হয়েছে।

রাব্বির বিরুদ্ধে এর আগেও কদমতলী থানায় একই ধরনের একটি মামলা রয়েছে। তার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

আরও অনেক ভুক্তভোগী নারী থাকতে পারেন যারা এখনো সামনে আসেননি। এ কারণে ভুক্তভোগীদের এগিয়ে এসে অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।

এ ধরনের অপরাধ রোধে সচেতনতা জরুরি। কোনো অপরিচিত ব্যক্তি বা অনলাইনে পরিচিত কারও ডাকে একা কোথাও না যাওয়ার জন্য সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন ওয়ারী বিভাগের ডিসি মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী।

টিটি/ইএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।