নিজেকে যিশুখ্রিষ্ট হিসেবে দেখানোয় তীব্র সমালোচনার মুখে ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে যিশু খ্রিস্ট হিসেবে উপস্থাপন করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি একটি ছবি প্রকাশ করার পর সমর্থক ও বিরোধী- উভয় পক্ষ থেকেই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। রোববার (১২ এপ্রিল) প্রকাশিত ওই ছবিটি এতটাই সমালোচনার মুখে পড়ে যে সোমবারের মধ্যেই তিনি তা মুছে ফেলেন।
মার্কিন ইতিহাসের প্রথম আমেরিকান পোপ- পোপ লিও চতুর্দশের সঙ্গে বিরোধের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প এমন পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। পরে হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, আমি ভেবেছিলাম, ছবিটি আমাকে একজন চিকিৎসক হিসেবে দেখাচ্ছে ও এটি রেড ক্রসের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তিনি আরও বলেন, এটি আমাকে একজন চিকিৎসক হিসেবে দেখানোর কথা, যিনি মানুষকে সুস্থ করে তোলে। আমিও মানুষকে সুস্থ করি, অনেক ভালো করি।
তবে ছবিটি দেখে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, ট্রাম্পকে একটি আলখাল্লা পরা অবস্থায় দেখানো হয়েছে, তার হাত জ্বলজ্বল করছে ও তিনি একটি বিছানায় শুয়ে থাকা, চোখ বন্ধ একজন ব্যক্তির কপালের ওপর হাত রাখছেন। খ্রিস্টান ও মুসলিম- উভয় ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, যিশু খ্রিস্ট অসুস্থ ও অন্ধদের সুস্থ করার অলৌকিক ক্ষমতা রাখতেন বলে বিশ্বাস করা হয়।
ব্যাপক নিন্দা
ভারমন্টের ডেমোক্র্যাট সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এক্সে লিখেছেন, যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে ট্রাম্প এখন পোপকে আক্রমণ করছেন ও একই সঙ্গে নিজেকে মসিহা হিসেবে উপস্থাপন করে ছবি দিচ্ছেন।
স্যান্ডার্স আরও বলেন, এটি শুধু আপত্তিকর নয়, এটি বিকারগ্রস্ত ও আত্মকেন্দ্রিক আচরণ। কংগ্রেসের রিপাবলিকানরা কবে এই বিপজ্জনক ও নিয়ন্ত্রণহীন ব্যক্তিকে অন্ধভাবে অনুসরণ করা বন্ধ করবে?
ম্যাসাচুসেটসের ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান জিম ম্যাকগভর্ন এক্সে লিখেছেন, এই ছবি দেখে আমি ঘৃণিত বোধ করছি। এটি চরম আপত্তিকর, অসম্মানজনক ও ধর্ম অবমাননাকর। স্পষ্টতই তিনি সুস্থ নন। একজন আমেরিকান, একজন ক্যাথলিক ও একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আমি ক্ষুব্ধ।
ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটির সরকারি এক্স অ্যাকাউন্ট মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও হাউস স্পিকার মাইক জনসনকে উদ্দেশ করে লিখেছে, এ বিষয়ে আপনারা কিছু বলবেন?
ভ্যান্স ২০১৯ সালে ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণ করেন ও এ নিয়ে একটি বইও লিখেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-ও ক্যাথলিক। জনসন একজন ধর্মপ্রাণ ব্যাপ্টিস্ট।
সব পক্ষ থেকেই দ্রুত প্রতিক্রিয়া এলেও সোমবার (১৩ এপ্রিল) সন্ধ্যা পর্যন্ত কংগ্রেসে দায়িত্বে থাকা রিপাবলিকানদের কাছ থেকে কোনো মন্তব্য আসেনি। ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি, যিনি একজন ব্যাপ্টিস্ট ধর্মযাজকও, এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি, যদিও ধর্মীয় ইস্যুতে তিনি প্রায়ই এক্সে মতামত দেন।
সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান মার্জরি টেইলর গ্রিন এক্সে লিখেছেন, আমি সম্পূর্ণভাবে এর নিন্দা জানাই ও এর বিরুদ্ধে প্রার্থনা করছি। সাবেক কংগ্রেসম্যান অ্যাডাম কিনজিঙ্গার লিখেছেন, যিশু খ্রিস্ট কোনো রসিকতার বিষয় নয়। তার ছবি রাজনৈতিক হাতিয়ার হতে পারে না। তার নাম কোনো ব্র্যান্ড নয়।
গ্রিন ও কিনজিঙ্গার দুজনই ট্রাম্প ও তার সমর্থকদের চাপের মুখে পুনর্নির্বাচনে অংশ নেননি।
সাবেক ট্রাম্প সমর্থক ও ক্যাথলিক কর্মী ক্যারি প্রেজিয়ান বোলার লিখেছেন, ট্রাম্প শুধু ধর্ম অবমাননাকারী নন, তিনি মিথ্যাবাদীও। কোনো খ্রিস্টান তাকে সমর্থন করতে পারে না।
সাবেক ফক্স নিউজ উপস্থাপক মেগিন কেলি ট্রাম্পের ‘চিকিৎসক’ যুক্তি নিয়ে সমালোচনামূলক একটি পোস্ট শেয়ার করেন।
ক্যাথলিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত সংগঠন নাইটস টেম্পলার ইন্টারন্যাশনাল জানায়, তারা এ ঘটনায় গভীরভাবে অপমানিত এবং প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানায়। তারা ২০১৬ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিল। সংগঠনটি বলেছে, এই আপত্তিকর ও ধর্ম অবমাননাকর ছবি দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে।
অন্যদিকে, ট্রাম্পপন্থি মন্তব্যকারি লরা লুমার ছবিটির পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ধর্ম অবমাননার কোনো আইন নেই ও এ নিয়ে ক্ষুব্ধ হলে মুসলিম দেশে যেতে পারেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় ইরানের দূতাবাসের এক্স অ্যাকাউন্ট ব্যঙ্গ করে প্রশ্ন তোলে, ছবিতে যে রোগীকে সুস্থ করা হচ্ছে তিনি কি জেফ্রি এপস্টেইন?
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান-ও পোস্টটির নিন্দা জানিয়ে বলেন, শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের নবী যিশুকে অবমাননা কোনো স্বাধীন মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
ট্রাম্প বনাম পোপ লিও
ছবিটি প্রকাশের কিছুক্ষণ আগেই ট্রাম্প পোপ লিও চতুর্দশের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করেন ও তার ভাইয়ের সঙ্গে বিভেদ তৈরির চেষ্টা করেন।
তিনি লেখেন, পোপ লিও অপরাধ দমনে দুর্বল এবং পররাষ্ট্রনীতিতে খারাপ। তিনি আরও বলেন, আমি এমন পোপ চাই না, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করেন।
পোপ লিও এর আগে ইরান যুদ্ধ, লেবানন সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনবিরোধী পদক্ষেপের সমালোচনা করেছিলেন। একই দিনে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কয়েকজন কার্ডিনালও ট্রাম্পের অবস্থানের সমালোচনা করেন।
শনিবার ওয়াশিংটনের আর্চবিশপ কার্ডিনাল রবার্ট ম্যাকএলরয় খ্রিস্টানদের শুধু প্রার্থনায় সীমাবদ্ধ না থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শুধু প্রার্থনা নয়, আমাদের কাজও করতে হবে।
গত সপ্তাহে একটি ক্যাথলিক প্রকাশনা জানায়, ভ্যাটিকানের যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা তলব করে সতর্ক করেছিলেন।
সোমবার (১৩ মার্চ) পোপ লিও সাংবাদিকদের বলেন, আমি ট্রাম্প প্রশাসনকে ভয় পাই না। আমি শান্তির বার্তায় বিশ্বাসী।
এদিকে, ইরাকি খ্রিস্টান ফাউন্ডেশন আসন্ন নির্বাচনে ট্রাম্প ও তার দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানায়। এমনকি, বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের মধ্যেও পোপ লিওর প্রতি সমর্থন দেখা যায়। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ ঘালিবাফ তার অবস্থানের প্রশংসা করেন।
আমেরিকান-ইসলামিক সম্পর্ক বিষয়ক কাউন্সিলও পোপের প্রতি সংহতি জানায় এবং ট্রাম্পের ধর্ম নিয়ে উপহাসকে ‘অপমানজনক’ বলে উল্লেখ করে।
মুসলিম-আমেরিকান প্রভাবশালী স্নিকো বলেন, আমরা পোপের পাশে আছি। ট্রাম্প বড় ধরনের ধর্ম অবমাননা করেছেন।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
এসএএইচ