গভর্নর ‘দলীয় লোক’: অপসারণের দাবি বিরোধীদলের, বিপক্ষে মত অর্থমন্ত্রীর

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:৩৭ পিএম, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দলীয় লোক দাবি করে তার অপসারণ চেয়েছে বিরোধী দল। অন্যদিকে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দলকে সমর্থন করে নির্বাচনি কার্যক্রমে সহায়তা করা মানে দলের লোক না।

বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) বিল পাসের পর সংসদে হওয়া অনির্ধারিত আলোচনায় এমনটা দাবি করে সরকারি ও বিরোধী দল।

এদিন  বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সংশোধন) বিল এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়। বিল দুটি পাসের জন্য আলাদাভাবে সংসদে তোলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা ছাড়া অন্য কেউ বিল দুটির জনমত যাচাই–বাছাই কমিটিতে প্রেরণের প্রস্তাব দেয়নি। ফলে রুমিন ছাড়া কোনো সদস্য বিলের ওপর আলোচনার সুযোগ পাননি। কিন্তু বিরোধী দলের একাধিক সদস্য বিলের ওপর আলোচনার জন্য হাত তোলেন।

বিল পাশের পর আলোচনার এক পর্যায়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, আর্থিক খাতে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়োগ দেওয়া হবে না।

এরপর বিরোধীদলীয় উপ-নেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, প্রধানমন্ত্রী কোনো ফাইনান্সিয়াল ইনস্টিটিউটের দলীয় লোক দেবেন না যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যদি এ রকমই হয় আমরা আনন্দিত। এটাকে আমি ধন্যবাদ দেব। কিন্তু এখনকার গভর্নর বাংলাদেশ ব্যাংকের যিনি আছেন, তার একটা পরিচয় কিন্তু আছে। সেটা হচ্ছে বিএনপির যে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি হয়েছিল, আমি যেহেতু জানি, তিনি এই কমিটির একজন মেম্বার ছিলেন। সুতরাং তথ্যগত যে বিভ্রান্তিটা তৈরি হয়েছে এটা কোনো দৃঢ়ভাবে.. এবং তার যদি এ রকম পরিচয় থাকে তাহলে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের আলোকে তাকে গভর্নর থেকে বাদ দিয়ে এই সিদ্ধান্তের আলোকেই একজন যোগ্য গভর্নর নিয়োগ করা হোক।

তখন স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, অর্থমন্ত্রী এ ব্যাপারে আপনি কিছু বলবেন কি না যে নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে থাকলে দলীয় পদ কি না নির্বাচন পরিচালনা কমিটি নট দল।

তখন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু বলেন, দলকে সমর্থন করা মানে দলের লোক না। আর কোনো দলকে সমর্থন করে নির্বাচনি কার্যক্রমে সহায়তা করা মানে দলের লোক না। নিশ্চয় আপনাদের দলের অনেক লোক আপনাদের নির্বাচনি কার্যক্রমে সহায়তা করেছেন। যারা আপনার দলের লোক না।

অর্থমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন বাংলাদেশে একটা বিশাল কর্মযজ্ঞ। এখানে অনেক সহযোগিতা করতে পারেন।

এর আগে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সংশোধন) বিল পাসের পর অন্য বিলটি আনা হয়। বিলের আলোচনায় রুমিন ফারহানা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম একটি স্তম্ভ বা পিলার হচ্ছে বিমা খাত। যদি নির্মহভাবে আমরা আলোচনা করি তাহলে বিমা খাতের অবস্থা বলতে হয় খুব বেশি ভালো নয়।

জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, তিনি সম্পূর্ণভাবে একমত বাংলাদেশে বিমা শিল্প খুবই কঠিন একটি অবস্থা পার করছে। অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় অনেকগুলো ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির জন্ম হয়েছে। যারা আইন কানুনের কোনো তোয়াক্কা করে না।

এ পর্যায়ে বিরোধী দলের একাধিক সদস্য কথা বলার সুযোগ চান। স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, এ পর্যায়ে কথা বলার সুযোগ নেই। তবে তিনি বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমানকে সুযোগ দেন।

বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, আসলে বেশিরভাগ সদস্য আমরা এখানে নতুন এসেছি। আমরা বিধি আস্তে আস্তে রপ্ত করছি।

তিনি বলেন, এই বিলটা কোনো সময়-সীমার মধ্যে বন্দী নয়। সময়ের কোনো বাধ্যবাধকতা নাই। এখানে বিধিটা মানাই তো উচিত ছিল। আমরা তো তিনদিন আগে একদিন আগেও তো পেলাম না। মেটেরিয়ালস। জাস্ট এখন ডেস্কে এসে পেয়েছি। আমি অনুরোধ করবো আমাদের এই অধিকার খর্ব করবেন না। আমাদের এ অধিকার আপনার মাধ্যমে সংরক্ষণ হোক। এই বিল দুটোই স্থগিত করে। যেহেতু দুইটার কাগজ আজকেই সরবরাহ করা হয়েছে।

তখন স্পিকার বলেন, বিধি অনুযায়ী গতকাল বিলের রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। সময় মার্জনার এখতিয়ার স্পিকারের আছে। তখন স্পিকার বিলটি পাসের প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যান। বিলটি পাস হয়।

এরপর এনসিপির আখতার বলেন, মাত্রই দুইটা আইন এখানে পাস করা হলো। আমরা জানি যে সরকার দল এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারা যেভাবে চাইবেন সেভাবে আইন পাস হবে। সেটাই হাউজের বাস্তবতা।

আখতার বলেন, সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের যে আইন এবং এই যে বীমা কর্পোরেশনের যে আইন দুইটা আইনের বয়সের যে বাধ্যতা ছিল সেই বাধ্যতাগুলোকে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, এটা কি কোনো ব্যক্তিকে মাথায় রেখে এটা করা হচ্ছে নাকি একটা পলিসিকে মাথায় রেখে এটা করা হচ্ছে? আমাদের যেটা ধারণার বিষয় যেভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটা নিয়োগ হয়েছে সেভাবে যদি কোনো বিশেষ ব্যক্তিদের মাথায় রেখে এ আইনের বয়সের যে বাস্তবতাটা ছিল সেটাকে যদি উঠিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে মন্ত্রী যেমন দক্ষ এবং যোগ্য লোকের কথা বলেছেন সেই জায়গাটা থেকে একটা কন্ট্রাডিকশন তৈরি করবে। আইন পাস হয়ে গেছে কিন্তু আমরা বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আমাদের কনসারগুলো এখানে জানিয়ে রাখছি।

আখতার বলেন, বিএনপি ২০০১ সালে যখন ক্ষমতায় এসেছিলেন তারা তত্ত্ববধায়ক সরকারের নিজেদের মতো করে উপদেষ্টা বসানোর জন্য প্রধান বিচারপতির বয়স যখন ৬৫ থেকে ৬৭ করেছিলেন। তারপর একটা দীর্ঘ ভোগান্তি জাতিকে পোহাতে হয়েছিল।

আখতারের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রীর কিছু বলার থাকলে বলার অনুরোধ করেন স্পিকার। তখন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যখন আইনটি হয়েছিল তখন গড় বয়স ছিল ৫৭। এখন ৭২। বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটি দেশে যেখানে সাকসেসফুলি এই সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন অপারেট করছে তাদের এখানে এ রকম কোনো বাধা নেই।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের আগামীর অর্থনীতির যে নতুন প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হচ্ছে এখানে যোগ্য দক্ষ ব্যক্তি যদি আসতে চান আপনাকে এগুলোকে মাথায় রাখতে হবে। এখানে ইমোশনের কোনো সুযোগ নেই।

এরপর দাঁড়ান বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, যোগ্য লোকদের যোগ্য জায়গায় স্পেস করে দেওয়া দরকার। দিনটা কেমন যাবে মর্নিং সোজ দ্যা ডে। সরকারের দুই মাসের যে সমস্ত কার্যকলাপ বেসিক জায়গাগুলোতে হাত দেওয়া হয়েছে, প্রত্যেকটা জায়গায় জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপক্ষে চলে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো আমি বেসিক জায়গা বলেছি। আমি কোনো কার্ড এগুলো বলিনি। নীতিগত যে জায়গাগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে যে কাজটা করা হয়েছে এবং সাবেক গভর্নরকে বিদায় দেওয়ার যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে, জাতি এটা দেখেছে। এখান থেকে শুরু করে আমি বারবার এগুলো মেনশন করতে যাচ্ছি না এ পর্যন্ত যে সমস্ত জায়গায় পরিবর্তন এসেছে সেগুলো জনগণ এবং ডেমোক্রেসি কোনোটাই সাপোর্ট করে না। এমনকি খেলার মাঠটা পর্যন্ত আমরা উন্মুক্ত রাখতে পারলাম না। ওখানেও গিয়ে আমরা ঝাপাইয়ে পড়লাম। 

বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, এভাবে যদি যোগ্যতা সিলেকশন হয় আমার প্রশ্ন দেশ আগাবে কীভাবে? আমরা তো কার ইন্টেনশন কি সেটা দেখতে পারব না। এটা মনের ব্যাপার। 

তিনি বলেন, সবকিছুকে পলিটিসাইজ করে ক্ষেত্র বিশেষে গোষ্ঠী পরিবার এগুলাকে প্রাধান্য দিয়ে আগালে দেশটা আগাবে না। আমরা তো সবাই মিলে চাই যে দেশটা এগিয়ে যাক।

জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, আসলে একটা বিল পাস হওয়ার পর এই ধরনের আলোচনার কোনো সুযোগ ছিল না। এখানে সেটাও রুলস অফ প্রসিডিউরের বাইরে হচ্ছে। যেহেতু তারা প্রশ্ন তুলেছেন আমাদের উত্তর দিতে হবে বিষয়গুলো।

অর্থমন্ত্রী বলেন, যতবার বিএনপি সরকারে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনে যতগুলো অ্যাপয়েন্টমেন্ট হয়েছে, সবগুলো নন পলিটিক্যাল।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কোনো দলের ব্যক্তি নয়। সে একটা দলের সমর্থক হতেই পারে। কিন্তু তার যদি যোগ্যতা থাকে… যদি কোন দলীয় কোন কিছু তার এইভাবে আপনার লক্ষ্য করে যে কোন প্রভাবিত হয়েছে তখন আপনি বলতে পারবেন। 

মন্ত্রী বলেন, এখন পর্যন্ত গভর্নরের যে পারফরমেন্স তারা দেখেছেন সেটা অন্য যে কোনো গভর্নরের পারফরমেন্সের চেয়ে ভালো।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আর আপনারা যখন বিগত দিনে এই বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যখন গভর্নরের বয়সটা বাড়িয়েছে তো সেই সময় তো আপনারা কোনো আপত্তি করেননি।

বিল দুটি পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়াম্যান ও কমিশনার পদে এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে সর্বোচ্চ বয়স সীমা তুলে দেওয়া হয়েছে।

এতদিন আইনে ছিল, কোনো ব্যক্তির বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হলে তিনি বাংলাদেশ সিকিউটিরিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান বা কমিশনার পদে নিযুক্ত হওয়ার উপযুক্ত বিবেচিত হন না বা পদে বহাল থাকতে পারেন না। বিলে এই বিধানটি বাদ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইনে বলা ছিল, কোনো ব্যক্তির ৬৭ বছর পূর্ণ হলে তিনি বীমা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বা সদস্য হতে পারবেন না। সংসদে পাস হওয়া বিলে এই বিধানটি বাদ দেওয়া হয়েছে।

এমওএস/এমআইএইচএস/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।