জলবায়ু ধর্মঘট
নবায়নযোগ্য জ্বালানির অগ্রাধিকার নিশ্চিতে রোডম্যাপ দাবি
ঢাকায় বৈশ্বিক জলবায়ু ধর্মঘটে অংশ নেওয়া তরুণ জলবায়ুকর্মীরা ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সরকারি পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দাবি করেছেন তারা। একই সঙ্গে খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সেক্টর মহাপরিকল্পনায় (ইপিএসএমপি) নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানো এবং ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন তরুণরা।
শুক্রবার (৮ মে) জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত এক কর্মসূচিতে এসব দাবি জানানো হয়।
ইয়ুথনেট গ্লোবাল ও ইয়ুথ ফর এনডিসির উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে দুই শতাধিক তরুণ জলবায়ুকর্মী অংশ নেন। ব্যানার, পোস্টার ও স্লোগানের মাধ্যমে তারা তেল, গ্যাস ও কয়লা আমদানির আর্থিক চাপ এবং পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরেন। ‘ভুয়া সমাধান নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি চাই’ এমন স্লোগানে মুখর ছিল পুরো এলাকা।
সমাবেশে ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান বলেন, দ্রুত ১০,০০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করতে হবে। খসড়া ইপিএসপিএম- এ নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমদানিনির্ভর ব্যয়বহুল এলএনজির আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই, এখান থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে।
তরুণরা সতর্ক করেন যে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অব্যাহত নির্ভরতা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু সহনশীলতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
ইয়ুথ ফর এনডিসির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক আমান উল্লাহ পরাগ বলেন, বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা, অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মূল্য আমরা আর দিতে পারি না। বিদ্যুৎ-জ্বালানির খরচ বহন করতে গিয়ে আমাদের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে এবং প্রতিদিন বেঁচে থাকা আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। আমাদের আরও সাশ্রয়ী জ্বালানি দরকার, আর সে জন্য এখনই নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে হবে।

এবারের জলবায়ু ধর্মঘট এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক সংকটের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারকে উচ্চমূল্যে এলএনজি, তেল ও কয়লা আমদানি করতে হচ্ছে। এতে সরকারের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি অর্থনীতির ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় রুপ্তানিমুখী শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে বাংলাদেশকে বার বার বৈশ্বিক সংকটে চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হচ্ছে। দাম বাড়ছে এবং বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের চাপে সাধারণ মানুষ বিপর্যস্ত। তারা সতর্ক করেন, নতুন করে জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানো হলে এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর।
তরুণদের ভাষ্য, জীবাশ্ম জ্বালানির কাছে আমাদের ভবিষ্যৎ বিক্রি করা যাবে না। এখন আমার বিদ্যুৎ আমি উৎপাদন করবো। সরকার শুধু সেই ব্যবস্থাটা করে দেবে। তরুণদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়তে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই।
জলবায়ুকর্মীরা বলেন, বাস্তবায়নে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। তারা স্মরণ করিয়ে দেন, সরকারি ভবনগুলোতে ২০২৫ সালের মধ্যে ৩ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পূর্বঘোষিত লক্ষ্য এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
তারা বলেন, সৌর সরঞ্জামের ওপর উচ্চ কর, বিনিয়োগে জটিলতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তা নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে বাধা তৈরি করছে। তাই সৌর সরঞ্জামের ওপর কর কমানো, দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের দাবি জানান তারা। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) সম্প্রসারণের সাম্প্রতিক সরকারি ঘোষণাকে স্বাগত জানালেও তরুণরা বলেন, শুধু নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়-বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে আন্দোলনকারীরা বলেন, কার্বন নিঃসরণ কমানো এখন আর বিকল্প কোনো বিষয় নয়। বিশ্ব জলবায়ু চুক্তিগুলোর স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিচ্ছন্ন শক্তিতে রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে হবে, তারা বলেন।
তারা উন্নত দেশগুলোর প্রতি জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরে দ্রুত আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
তরুণদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যানশিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বলেন, বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ দেশটি এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। তিনি বলেন, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নে নানা পরিকল্পনা নিচ্ছে, যা ইতিবাচক। তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট কৌশল ও কার্যকর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকতে হবে।
ওয়াটারকিপার্স বাংলাদশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসা এখন আর শুধু একটি দাবি নয়। চলমান বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের বাস্তবতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়নের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন আমাদের স্বাধীনতার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। আমাদের যত দ্রুত সম্ভব সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে। বাংলাদেশে কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য অধিগ্রহণ করা অনেক অব্যবহৃত জমি পড়ে আছে, যেগুলো দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ব্যবহার করা উচিত।
আয়োজকরা জানান, একই সময়ে দেশের ৫০টি জেলায়ও অনুরূপ জলবায়ু ধর্মঘট কর্মসূচি পালিত হয়েছে, যেখানে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। সমাবেশ থেকে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়, বাংলাদেশকে জরুরি ভিত্তিতে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে একটি কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করতে হবে।
এনএস/এসএনআর