নিহতের পরিবারই যখন ফেরারি
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়ায় গত বছরের ২৮ জানুয়ারি সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিজ ঘরেই খুন হয়েছিলেন সাজ্জাদ হোসেন স্বপন (২৫)। তিনি খুন হন প্রকাশ্যেই। এখন খুনিদের হুমকিতে ফেরারি জীবন যাপন করছেন নিহতের পরিবারই।
খুনিদের হুমকিতে ইতোমধ্যে নিজ এলাকা ছেড়েছেন নিহতের পরিবারের সদস্যরা। এছাড়া মামলা তুলে নিতে মামলার বাদী নিহতের ভাই মোশারফ হোসেনকেও হুমকি দিচ্ছেন সন্ত্রাসীরা।
ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্ত্রাসীরা বীরদর্পে ঘুরে বেড়ালেও তাদেরকে গ্রেফতার করছে না পুলিশ। স্বপন হত্যার মামলার তদন্ত ভার এখন ডিবি পুলিশের হাতে।
এ ব্যাপারে ডিবি পুলিশ জানায়, আসামীরা গা ঢাকা দিয়েছে। অভিযান চালিয়েও আসামিদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
এব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে নিহতের নাম হেলেনা বেগম জাগোনিউজকে বলেন, খুনীরা বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছে মামলা তুলে নেয়ার জন্য। এব্যাপারে সংশ্লিষ্ট থানায় একাধিকবার লিখিতভাবে অভিযোগ করা হলেও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি পুলিশ।
তিনি আরও বলেন, মামলা করেছি যারা আমার ছেলেকে খুন করেছে তাদের গ্রেফতার করে শাস্তির জন্য। কিন্তু আসামীরা তো গ্রেফতার হচ্ছেই না বরং তাদের হুমকিতে থাকতেই হচ্ছে। এক্ষেত্রে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো ধরণের নিরাপত্তা পাচ্ছেন না তিনি।
তিনি বলেন, আসামিরাই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের হুমকিতে প্রাণভয়ে এখন অপর দুই ছেলেকে নিয়ে একরকম পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। একদিকে সন্ত্রাসীদের হুমকি, অন্যদিকে দরিদ্র সংসারে অসুস্থ স্বামী সুলতান মিয়া, স্বপনের স্ত্রী বিপাশা আক্তার ও তার আড়াই বছরের মেয়ে সামিয়ার চিন্তায় দিশেহারা তিনি।
হেলেনা বেগম জানান, হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য নির্মাণাধীন ভবনের সামনের মাঠ দখল করে অনিক নামে স্থানীয় সন্ত্রাসীর নেতৃত্বে একটি গ্রুপ রেন্ট-এ কার ব্যবসার আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের ব্যবসা করতো।
তাদের বসতঘরের পাশের কয়েকটি পরিত্যক্ত কক্ষও অস্ত্র ও মাদক মজুদের জন্য সন্ত্রাসীরা ব্যবহার করত। সেখানে মাদকের আসর ও অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচা হতো। অস্ত্র ও মাদক কেনাবেচায় বড় ছেলে স্বপন এসবের প্রতিবাদ করে।
এঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে গত বছরের ২৮ জানুয়ারি সকালে স্থানীয় সন্ত্রাসী সুন্দরী অনিক, কোমল, বাবু, ফারুক, মনির, ঝুমুর, চান মিয়া, বিল্লাল ও মোসলেমসহ কয়েকজন যুবক ঘরে ঢুকে স্বপনের মাথায় গুলি করে হত্যা করে।
মা হেলেনার অভিযোগ, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়ায় স্বপনকে একাধিকবার প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছিল সন্ত্রাসীরা। এর ১৫ ঘণ্টা না পেরুতেই সন্ত্রাসীরা ছেলে স্বপ্ননকে হত্যা করে।
ছেলে হত্যার বিচারের জন্য মামলা বা অন্য কোনো ধরণের আইনী ব্যবস্থা যাতে গ্রহণ করতে না পারি এজন্য তাঁকেও মারধর করে সন্ত্রাসীরা সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে তিনি শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করার পর পড়েন আরও বিপদে।
হেলেনা বেগম বলেন, মামলা দায়েরের পর থেকে প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছে আসামিরা। গত বছরের ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায় বাসায় এসে ওই মামলার আসামি কোমল, ঝুমুর, চান মিয়া, বিল্লাল, ফারুক ও মোসলেমসহ কয়েকজন মামলা তুলে না নিলে জীবননাশের হুমকি দেয়।
এর ৩ মাস পর ৩১ জুলাই সন্ধ্যায় আবারও তারা বাসায় এসে হামলা চালায়। এসব বিষয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় দুটি জিডি করলেও তারা পুলিশের নাগালের বাইরেই রয়ে গেছে।
৭ আগস্ট রাতে তারা আবারও বাসায় এসে হেলেনা ও তার স্বামীকে পুড়িয়ে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। কিছুদিন আগেও আসামিরা প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে। বিষয়টি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হলেও কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
মামলাটি প্রথমে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ তদন্ত করলেও বর্তমানে ঢাকা মহানগর ডিবি পুলিশ তদন্ত করছে। আসামিদের মধ্যে দুজন অস্ত্রসহ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়। কিন্তু জামিনে বেরিয়ে এসে মামলা তুলে নিতে অব্যাহতভাবে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে ওই আসামীরা। অন্য আসামিরা প্রকাশ্যে এলাকায় ঘোরাঘুরি করছে। ফলে তার অন্য ছেলেরা বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
মালার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির এসআই আবদুল হাকিম এ বিষয়ে বলেন, স্বপন হত্যা মামলা তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে। ৪ আসামীকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। অন্য আসামীদের ধরতে চেষ্টা চলছে। নিহতের পরিবারের দাবি সম্পর্কে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা দাবি করেন, মামলার তদন্তে ও আসামীদের ধরতে কোনো ধরণের গাফিলতি করা হচ্ছে না।
জেইউ/এএইচ/পিআর