ছাত্র রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কমছে


প্রকাশিত: ০৪:০১ এএম, ০৮ মার্চ ২০১৫

ছাত্র রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ আশংকাজনকভাবে কমছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, বেশ কয়েকটি ছাত্র সংগঠনে নারীদের অংশগ্রহণ শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারী সমান তালে এগিয়ে চললেও ছাত্র রাজনীতিতে সুবিধাজনক অবস্থান তৈরির সুযোগ কমে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ নারী নেতৃত্ব নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

সিনিয়র নেতাদের যৌন হয়রানি, দলীয় শীর্ষ পদে নারী নেতৃত্বের সংস্কৃতি না থাকা, সংগঠনে নারীদের বাড়তি সুবিধা না দেয়া এবং ছাত্রীদের রাজনীতিকে ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরতে না পারাকেই ছাত্র রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার মূল কারণ হিসেবে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, নারীদের প্রতি সম্মানের জায়গা এখানে এখনও সীমিত। তাই ছাত্র রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কমছে।

বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের কয়েক নেত্রী জানান, বিভিন্ন সময়ে তারা সিনিয়র নেতাদের যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। অনেক সময় নেতাদের কুপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। বঞ্চিত হতে হয়েছে দলীয় পদ থেকে। সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানাভাবে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। তবে সিনিয়রদের ভয়ে তারা প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। বেশ কয়েকটি ছাত্র সংগঠনে এ ধরনের বিরোধ অনেকটা ওপেন সিক্রেট।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, রাজনীতির জগতেই নারীর অংশগ্রহণ কমছে। নানা কারণে নারী এ জগতে ঢুকতেই ভয় পায়। যেখানে ছাত্রীরা শিক্ষাঙ্গনে এসে পড়াশোনা করতেই যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে, সেখানে একই কারণে রাজনীতিতে প্রবেশেও সে ভয় পাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে নারী-পুরুষ উভয়কেই এগিয়ে আসতে হবে। নারীকে তার পাওনা বুঝে নিতে হবে, পুরুষকেও নারীর প্রাপ্য পাওনা দিতে হবে।

দেশের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির বর্তমান অবস্থাতে ছাত্র রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার চিত্র ফুটে ওঠে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্যমতে, ১৭৮ জন কেন্দ্রীয় নেতার মধ্যে মাত্র নয়জন নারী রয়েছেন। তাদের মধ্যে সহসভাপতির ৩০টি পদ এবং ২৪টি সম্পাদক পদের একটিতেও নারী নেই। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের ৯ পদের মাত্র একটি পদে এবং সাংগঠনিক সম্পাদকের ৭ পদের মাত্র একটিতে নারী রয়েছেন। তবে নারী যুগ্ম সম্পাদক এবং সাংগঠনিক সম্পাদক দুজনের অবস্থান তালিকার শেষে। ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্যমতে, ৯ নম্বর যুগ্ম সম্পাদক শারমিন সুলতানা লিলি এবং ৭ নম্বর সাংগঠনিক সম্পাদক আফরিন নুসরাত।

২৪টি সম্পাদক পদের একটিতেও মেয়ে নেই। ৯১ উপসম্পাদক পদের মাত্র ২টি পদে নারী রয়েছেন। তারা হলেন- উপসাংস্কৃতিক সম্পাদক ফারহানা জুঁথি এবং উপগণশিক্ষা সম্পাদক ফাতেমা ইসরাত জাহান বাঁধন। ১৫ সহসম্পাদক পদের মাত্র ৫টিতে নারী রয়েছেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এই সংগঠনটির কেন্দ্রীয় ছাত্রীবিষয়ক কোনো পদই নেই। তবে ছাত্রলীগ সভাপতি এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ বর্তমানে কেন্দ্রীয় কমিটিতে ২০ ভাগই নারী রয়েছেন এমন দাবি করেন বলেন, পরবর্তী কমিটিতে আমাদের ইচ্ছা আছে ৩৫ ভাগ পদেই মেয়েদের সুযোগ দেয়ার। এ সময় তিনি যৌন হয়রানির কারণে নারীদের অংশগ্রহণ কমছে না বলে মন্তব্য করেন।

ছাত্রদলের দফতর সূত্রে জানা যায়, সংগঠনটির ২০১ সদস্যের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটিতে মাত্র ১০ জন নারী রয়েছেন। এর মধ্যে সহসভাপতির ৩৩ পদের মাত্র ১টিতে ৩১ নম্বর সহসভাপতি হিসেবে আছেন মনিরা আক্তার রিক্তা। যুগ্ম সম্পাদকের ৩৫ পদের মাত্র ৩টিতে মেয়ে রয়েছেন। তারা হলেন- সেলিনা সুলতানা নিশিতা, শওকত আরা উর্মি ও শাহিনুর নার্গিস। সহসাধারণ সম্পাদকের ২৭ পদের মাত্র ২টিতে আরিফা সুলতানা রুমা, নাসিমা আক্তার কেয়া নামের দুজন নেত্রী রয়েছেন। সাংগঠনিক সম্পাদকের একটি পদ আছে। সেটিতে পুরুষ নেতৃত্ব রয়েছে। সহসাংগঠনিক সম্পাদকের ২৮ পদের ৩টি পদে আছেন শাহীনুর বেগম সাগর, নাদিয়া পাঠান পাপন ও আফরোজা খানম নাসরিন। ২৫টি সম্পাদক পদের মাত্র একটিতে ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন ফাহমিদা মজিদ ঊষা। এ ছাড়া বাকি তিনটি সদস্যপদেও কোনো মেয়ে নেই। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি নাজমুল হাসান বলেন, দেশে চলমান অবস্থার কারণে বিভিন্ন স্থানে কমিটি দেয়া সম্ভব হয়নি। এ জন্য নারীর অংশগ্রহণ কমছে।

বাম ছাত্র সংগঠনসমূহ : ছাত্র ইউনিয়নের দফতর সূত্রে জানা যায়, সংগঠনটির ৪১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির মাত্র ৩ পদে নারী রয়েছেন। তারা হলেন- সাধারণ সম্পাদক লাকী আক্তার, সমাজকল্যাণ ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক ইউনা ইসলাম এবং সদস্য তাহমিনা আক্তার স্বর্ণা। সংগঠনটিতে ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদকের কোনো পদ নেই। জানতে চাইলে সভাপতি হাসান তারেক বলেন, মেয়েদের রাজনীতিতে আসার অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে। সামাজিক ও বাস্তবিক কারণে সংগঠন করতে গেলে ছেলেরা কিছু বাড়তি সুবিধা পায়, যা মেয়েরা পায় না। এ ছাড়া নারীদের চলাফেরায় নিরাপদ অবস্থা তৈরি না করা এবং সংগঠনের অভ্যন্তরেও তাদের বাড়তি সুবিধা দেয়ার চর্চা না থাকাই এর মূল কারণ।

ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় দফতর সূত্রে জানা যায়, সংগঠনটির ২৯ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে মাত্র ২ জন নারী রয়েছেন। তারা হলেন- সহসভাপতি তাহমিদা তানিয়া এবং সদস্য উম্মে হাবিবা বেনজির। সংগঠনটিতে ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদকের কোনো পদ নেই। জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় সভাপতি সৈকত মল্লিক বলেন, আমরা নারী-পুরুষকে সমান করে দেখি না। তাই আলাদা পদবি নেই। ছাত্র রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কম হওয়ার কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান সমাজে নারীর নিরাপত্তাহীনতা ও পরিবেশ পরিস্থিতি নারীর অনুকূলে না থাকায় অংশগ্রহণ কমছে। মফস্বলে অবস্থা বেশি ভয়াবহ । সূত্র : যুগান্তর

এসএইচএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।