ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছেন স্বল্প আয়ের মানুষ


প্রকাশিত: ০৩:০৫ এএম, ২৪ মার্চ ২০১৫

চলমান অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ও হরতালের প্রভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ায় ভাসমান শ্রমিকদের কাজের সংস্থান কমে গেছে। ফলে ঢাকায় অবস্থান করা অনেক ভাসমান শ্রমিক যেমন কাজ পাচ্ছেন না, তেমনি ঢাকার বাইরে থেকে এসেও অনেকে কাজ পাচ্ছেন না। ফলে কাজ না পেয়ে অনেক শ্রমিক ঢাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।

এর প্রভাবে স্বল্প আয়ের মানুষ বসবাস করে এমন সব এলাকার বাসা ভাড়া কমে গেছে। কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় স্বল্প আয়ের মানুষের কষ্ট যেমন বেড়েছে, তেমনি কমে গেছে তাদের জীবনযাত্রার মান। রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, মিরপুর পল্লবীর গার্মেন্ট অঞ্চল, প্রেসক্লাব, মোহাম্মদপুর এলাকা ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, প্রায় আড়াই মাস ধরে দেশে চলা টানা অবরোধ ও হরতালের কারণে মানুষের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে। সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। কোনো অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়তে পারে না। বরং তা কমে যায়। যেমনটি হয়েছে গত আড়াই মাসে। ওই সময়ে সরকারি কর্মকাণ্ড যেমন স্থবির হয়েছে তেমনি বেসরকারি খাতের উন্নয়ন কাজের গতিও কমেছে। এতে বাজারে টাকার হাতবদল কমেছে। ফলে মানুষের কাজের সংস্থান কমে যাচ্ছে। আর কাজের সংস্থান না হলে মানুষ ঢাকায় থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক।

কাজ না থাকায় সাব কনট্রাক্টের ভিত্তিতে কাজ করে এমন ৫ শতাধিক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এসব কারখানা সরাসরি বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডার নিতে পারে না। ফলে বড় কারখানাগুলো ক্রেতাদের কাছ থেকে যে রফতানির আদেশ পায়, তা থেকে সাব কনট্রাক্টের ভিত্তিতে তারা কাজ করে। রাজনৈতিক অস্থিরতার পর থেকে বিদেশি ক্রেতাদের রফতানির আদেশ দেয়ার পরিমাণ কমে যাওয়ায় তাদের কাজও কমে গেছে। ফলে বাধ্য হয়ে তারা কারখানাগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন। এতে ওই সব কারখানার হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন।

মদিনা সোয়েটার্সের জিএম কবির উদ্দিন আহমেদ বলেন, সাধারণত সাব কনট্রাক্টের কারখানাগুলোতে জানুয়ারি থেকে কাজ শুরু হয়। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জানুয়ারি থেকেই রফতানির আদেশ কমতে থাকে। ফলে বড় কারখানাগুলো ছোট কারখানাগুলোকে কাজ দিতে পারছে না।

গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহসভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম বলেন, বিভিন্ন কারণে এ পর্যন্ত তাদের ২৮০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এসব কারখানার শ্রমিকরা বেকার। তিনি বলেন, বড় কারখানায় কাজ নেই। সেখানে সাব কনট্রাক্টের কারখানা কীভাবে কাজ করবে।

ঢাকা ছাড়ছে স্বল্প আয়ের মানুষ : ঢাকায় ভাসমান শ্রমিকদের একটি বড় অংশ কাজ করছে নির্মাণ খাতে। আরও একটি অংশ কাজ করছে ঘাট শ্রমিক হিসেবে। দুই খাতেই এখন কাজের বাজার মন্দা। অর্থনৈতিক মন্দায় বিক্রি কমে যাওয়ায় অবিক্রীত ফ্ল্যাটের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। রিহ্যাবের হিসাবে এখন পর্যন্ত অবিক্রীত ফ্ল্যাটের সংখ্যা প্রায় এক হাজার। রিহ্যাবের নিবন্ধন নেই এমন সব কোম্পানি মিলে এর সংখ্যা আরও বেশি হবে। ফলে নির্মিত ফ্ল্যাট বিক্রি করতে না পেরে তারা এখন নতুন প্রকল্পে হাত দিচ্ছেন না।

কমলাপুর রেলস্টেশনে কথা হয় ভাসমান নির্মাণ শ্রমিক হাশেম আলীর সঙ্গে। তিনি নরসিংদী থেকে সপ্তাহে ৬ দিনই সকালের ট্রেনে ঢাকায় কাজ সেরে আবার রাতের ট্রেনে বাড়ি চলে যান। প্রেসক্লাবের সামনে কোদাল নিয়ে বসে থাকেন। এখান থেকেই এসে মালিকপক্ষ দরদাম করে নিয়ে যায়। তবে গত কয়েক দিন কাজ না পাওয়ায় খালি হাতেই বাড়ি ফিরতে হয়েছে তাকে। এভাবে প্রতিদিন শত শত নিম্ন আয়ের শ্রমিক কাজ না পেয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।

নারায়ণগঞ্জ ও পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে পাইকারি ব্যবসায়ীদের আড়তগুলোতে শ্রমিকদের কাজ কমে গেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতায় পণ্যের সরবরাহ কমে যাওয়ায় এমনটি হয়েছে। ফলে ঘাটগুলো থেকে শ্রমিকরা চলে যাচ্ছে গ্রামে।

নারায়ণগঞ্জে ঘাট শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন শরাফত। বাড়ি জামালপুরে। কয়েকদিন তার সঙ্গে কথা হয় কমলাপুর রেলস্টেশনে। তিনি জানান, নারায়ণগঞ্জে সিমেন্টের ঘাটে তিনি কাজ করতেন। এখন সিমেন্টের জাহাজ কম আসায় কাজ কম। এ কারণে তিনি গ্রামে চলে যাচ্ছেন। তার সঙ্গে আরও সাত শ্রমিককে চলে যেতে দেখা গেছে। তারাও একই ধরনের কথা বলেন।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের সবচেয়ে সহজ মাধ্যম লঞ্চ। প্রতিদিন বরিশাল অঞ্চলে ২০টির বেশি লঞ্চ ছেড়ে যায় সদরঘাট থেকে। এ ছাড়া চাঁদপুর ও শরীয়তপুরে বেশ কিছু লঞ্চ ছেড়ে যায়। এসব লঞ্চে প্রতিদিন লক্ষাধিক যাত্রী আসা-যাওয়া করেন।

লঞ্চ মালিকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে আসার চেয়ে ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার সময় লঞ্চে বেশি ভিড় দেখা যাচ্ছে। এদের বেশিরভাগই পোশাক কারখানার কর্মী। সোমবার দুপুরে পারাবত লঞ্চের ফ্লোরে আগেই জায়গা নিয়েছেন বরিশালের মুলাদীর আবু তালেব। পেশায় তিনি একজন গার্মেন্ট কর্মী। সোনালী অ্যাপারেলস নামে একটি কারখানায় কাজ করেন তিনি।

তিনি জানান, ফেব্রুয়ারি থেকেই তাদের কোনো কাজ ছিল না। মার্চ থেকে তাদের কারখানা লে-অফ করে দেয়া হয়। তবে ফেব্রুয়ারির বেতন না দিয়ে শুধু চার হাজার টাকা করে অগ্রিম দেয়া হয়েছে। মালিক বরিশালের হওয়ায় তাদের এক গ্রাম থেকেই ৪০ জনের বেশি কাজ করতেন সেখানে। আর সবারই একই অবস্থা। সূত্র : যুগান্তর

বিএ/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।