মানিকগঞ্জ

সড়ক নির্মাণে বিল যাচ্ছে, কাজ হচ্ছে না

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি মানিকগঞ্জ
প্রকাশিত: ০৩:২২ পিএম, ০৭ মে ২০২৬

মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় চারিগ্রাম থেকে বরুন্ডি সড়কের প্রায় চার কিলোমিটার অংশ দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। শুকনো মৌসুমে ধুলাবালি আর বৃষ্টিতে কাদা-পানিতে দুর্ভোগে পড়ছেন লাখো মানুষ। ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটি নির্মাণে প্রকল্প করা হলেও সড়কটির কাজ আংশিক করে থমকে যায়। তবে সেই আংশিক কাজেই এরই মধ্যে ৮০ লাখ টাকার বিল তুলেছেন ঠিকাদার।

উপজেলা এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে গ্রামীণ সড়ক মেরামত ও সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় চারিগ্রাম-বরুন্ডি সড়কের কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স নির্মাণ প্রকৌশলী’। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত কাজ শেষ করার মেয়াদ থাকলেও কাজটি শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান‌। তবে সড়কের আংশিক কাজ শেষ করেই প্রায় ৮০ লাখ টাকার বিল তুলে নিয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বাঙ্গালা থেকে মাটিকাটা পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার সড়কের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। পুরো সড়কের মাত্র ২৬ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি অংশে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় খানাখন্দ। এতে প্রায়ই ইজিবাইকসহ বিভিন্ন যানবাহন উল্টে দুর্ঘটনা ঘটছে। সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে চলাচল আরও কঠিন হয়ে পড়ে। শুকনো মৌসুমে ধুলাবালিতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছেন স্থানীয়রা।

সড়ক নির্মাণে বিল যাচ্ছে, কাজ হচ্ছে না

জামশা ও বলধারা ইউনিয়নের এই সড়কটি প্রায় চার বছর ধরে ভাঙাচোরা অবস্থায় রয়েছে। ফলে লক্ষাধিক মানুষের যাতায়াতের এই একমাত্র সড়ক কার্যত চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়রা জানান, কাজের শুরু থেকেই নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। সড়কের এজিংয়ে পুরোনো ইটের সঙ্গে নতুন ইট ব্যবহার করায় গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পর্যন্ত গড়ায়। এরপর দুই বছরের বেশি সময় ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে।

এ কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী ও রোগীরা। সড়কটি ব্যবহারকারী কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন ধুলো ও কাদায় ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। রোগী পরিবহনেও তৈরি হয়েছে চরম সংকট।

স্কুলশিক্ষক পীযুষ কান্তি বিশ্বাস বলেন, ‘আমি প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে মানিকগঞ্জ থেকে গোলাইডাঙ্গা যাতায়াত করি। এই পথ দিয়ে দুটি স্কুলের অসংখ্য শিক্ষার্থীও নিয়মিত চলাচল করে। কিন্তু সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে আমাদের ভোগান্তির শেষ নেই। রাস্তা এতটাই ভাঙাচোরা যে প্রতিদিনই ঝাঁকুনি খেয়ে মাথায় আঘাত লাগে। খুব কষ্টে চলাচল করতে হয়। দ্রুত এই সড়কটি মেরামত করা অত্যন্ত জরুরি।’

নবগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে যে সড়কটি গেছে, সেটির দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় পড়ে থাকায় এলাকার মানুষসহ আমাদের বিদ্যালয়ের আড়াই শতাধিক শিক্ষার্থী চরম দুর্ভোগে পড়ছে। কোমলমতি শিশুরা প্রতিদিন কাদা ও ধুলাবালির মধ্যে দিয়ে স্কুলে আসে, যা তাদের জন্য কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ। জামশা ইউনিয়ন থেকে মানিকগঞ্জে যাতায়াতের জন্য অনেকেই এই সড়ক ব্যবহার করেন। সড়কটির এমন বেহাল অবস্থার কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। আমরা চাই দ্রুত সংস্কারের মাধ্যমে এই ভোগান্তির অবসান হোক।’

বাঙ্গালা গ্রামের বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, ধুলাবালিতে থাকা যায় না, আবার বৃষ্টি হলে রাস্তায় পানি জমে যায়। বরুন্ডি গাঙে পানি না থাকলেও আমাদের রাস্তায় পানি থাকে। রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ, কিন্তু এর কোনো উন্নতি চোখে পড়ছে না আমাদের।

মাটিকাটা এলাকার বাসিন্দা ইব্রাহিম মিয়া বলেন, শুকনো মৌসুমে ধুলাবালিতে ঘরের ভেতর পর্যন্ত ভরে যায়। আসবাবপত্র নষ্ট হয়, কাপড়চোপড় নোংরা হয়ে যায়, এমনকি শ্বাসকষ্টের সমস্যাও দেখা দেয়। আবার বৃষ্টির সময় কাদা-পানিতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। এই সড়ক দিয়ে দুইটি স্কুলের শিক্ষার্থীরা চলাচল করে, তারাও চরম ভোগান্তিতে পড়ে। মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনাও ঘটে। এই কষ্টের কথা কার কাছে বলব, সেটাও বুঝতে পারি না।

সড়ক নির্মাণে বিল যাচ্ছে, কাজ হচ্ছে না

অটোচালক কহিনুর মিয়া বলেন, বাঙ্গালা থেকে মাটিকাটা পর্যন্ত সড়কটির অবস্থা খুবই খারাপ। এটি এখন প্রায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এই সড়কে অটো চালালে গাড়ি দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। বৃষ্টির সময় চাকা স্লিপ করে, যাত্রীদের নিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে রোগী নিয়ে এই পথে চলাচল করা প্রায় অসম্ভব। আমরা দ্রুত এই সড়কটি মেরামতের দাবি জানাচ্ছি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স নির্মাণ প্রকৌশলীর’ স্বত্বাধিকারী মো. আবু সাঈদ খান জানান, একটু ঝামেলা ছিল, আমরা দ্রুতই কাজ শুরু করবো।

সিংগাইর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মোহাম্মাদ আশরাফুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, জিওবি মেইনটেন্যান্সের আওতায় কাজটির ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া হয়েছিল। কাজ শুরু হলেও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে এবং বিষয়টি দুদকে যায়। এখনো তদন্তের চূড়ান্ত ফল পাওয়া যায়নি। ঠিকাদারকে বারবার বলা হলেও কাজ শুরু করেনি। টেন্ডার বাতিলের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পুনরায় টেন্ডার হলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।

সজল আলী/এফএ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।