সেদিনের কালো ছায়ায় ঢাকা পড়েছে নিলুফার জীবন


প্রকাশিত: ০৬:১৫ পিএম, ২৩ এপ্রিল ২০১৭

অভাবের সংসারে স্বামীর সহযোগিতা আর ভালোবাসা টিকিয়ে রেখেছে নিলুফার বেঁচে থাকার তীব্র বাসনা। তাই চুলা জ্বালানো, রান্নার কাজ- সবই এখন করতে হয় তাকে। কিন্তু চাকরিকালে স্বামী ও স্ত্রীর আয়ে দিব্যি চলছিল সংসার। হঠাৎ জীবনে নেমে আসে পঙ্গুত্বের অভিশাপ। সেদিনের সেই কালো ছায়ায় ঢাকা পড়েছে নিলুফা বেগমের জীবন। আমৃত্যু যা বয়ে বেড়াতে হবে।

২৪ এপ্রিল; দেশের পোশাক শিল্পের ইতিহাসে এক শোকাবহ দিন। ২০১৩ সালের এ দিনে সাভারের রানা প্লাজা ধসে এক হাজার ১৩৬ জন শ্রমিকের করুণ মৃত্যু হয়। আহত হন কয়েক হাজার শ্রমিক। আহতদের মিছিলে বেদনাতুর এক নাম নিলুফা বেগম।

সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বাসস্ট্যান্ডের পাশে অবস্থিত রানা প্লাজায় অন্যান্য পোশাক কারখানার শ্রমিকের মতো ওইদিন সকাল ৮টায় নিজ কর্মস্থলে যোগ দেন অপারেটর নিলুফা। পঞ্চম তলায় নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেডে পুরোদমে কাজ চলছে। সাড়ে ৯টার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দ। আশপাশে উড়তে থাকে ধুলাবালি। একপর্যায়ে ধসে পড়ে রানা প্লাজা। শুরু হয় আহত শ্রমিকদের আহাজারি। উদ্ধারে এগিয়ে আসেন স্থানীয়রা। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেন সেনা ও নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, আনসার, র্যা ব ও পুলিশ সদস্যরা।

চলে বিরতিহীন উদ্ধার অভিযান। ভবনটি থেকে নিহত ও আহতদের একে একে বের করে আনা হয়। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

Nilufa 2

রানা প্লাজার প্রথম তলায় ছিল বিভিন্ন দোকান, দ্বিতীয় তলায় ছিল দোকান আর ব্যাংক, তৃতীয় তলায় নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেড ও ফ্যানটম ট্যাক লিমিটেড, ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায় ইথারটেক্স লিমিটেড নামের পোশাক তৈরির প্রতিষ্ঠান।

টানা ২০ দিনের উদ্ধার অভিযানে রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে এক হাজার ১৩৬ শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় দুই হাজার ৪৩৮ জনকে। তাদের অনেকেই সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেন। অনেকে আবার মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন।

আহতাবস্থায় নিলুফাকে প্রথমে এনাম মেডিকেলে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয় রাজধানীর পান্থপথে হেলথ টোন সেন্টারে। ডা. শাকিল আক্তারের পরামর্শে উত্তরার বাংলাদেশ মেডিকেলেও চিকিৎসা চলে। সরকারি-বেসরকারি সহায়তার পরও পঙ্গুত্বের হাত থেকে রেহাই মেলেনি মানিকগঞ্জ সিঙ্গাইর এলাকার গার্মেন্টসকর্মী নিলুফার।

এখন আর হাঁটতে পারেন না তিনি। স্ট্রেচার কিংবা হুইল চেয়ারে চলাফেরা করতে হয়। কিন্তু জীবন সংগ্রাম যেন থেমে নেই। একমাত্র সন্তান রিফাত পাটোয়ারীর বয়স এখন ১১। তাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এ প্রেরণাই তাকে এখন তাড়িয়ে বেড়ায়। অভাবের সংসারে একমাত্র সন্তানই যেন আশার আলো।

স্বামী শহীদুল ইসলামের (৪০) বাড়ি ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর থানার বহরামপুর গ্রামে। স্ত্রী নিলুফাকে নিয়ে সাভারের আমতলা এলাকার ১০২নং ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি। চা বিক্রি করে অর্জিত আয়ে কোনো মতে চলছে তাদের সংসার।

Nilufa 1

শহীদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, সরকারের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা হিসেবে পেয়েছি ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এছাড়া বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তি অনুদান হিসেবে পেয়েছি ৯৫ হাজার টাকা। এ টাকা ছাড়াও ব্যক্তিগত অনেক টাকা খরচ হয়েছে নিলুফার চিকিৎসায়। যদিও ডান পা বাঁকাই রয়ে গেছে। যে কারণে স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারে না সে। সারাদিন চা ও পান বিক্রি করে যে আয় হয় তা দিয়েই চলে অভাবের সংসার।

নিলুফা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, আমার তো চাকরির আর সুযোগ নেই। ছেলেও অল্প বয়সী। কিন্তু আমার স্বামী শহীদুল ইসলাম কাজ করতে সক্ষম। সরকার যদি তাকে কোনো ছোটখাটো চাকরির ব্যবস্থা করে দিত… তাহলে জীবনে একটু হলেও স্বস্তি নেমে আসত।

স্বামী শহীদুল ইসলাম বলেন, আমাকে আজ অবধি কেউ চাকরি দেয়ার কথা বলেনি। চেয়েও পাইনি। তাই বাধ্য হয়ে চা-পানের দোকান চালাই। ছেলে এক বেলা সহযোগিতা করে। স্ত্রীও মাঝে মধ্যে দোকানে এসে বসে। গার্মেন্টসে চাকরির কথা আর ভাবতে পারি না। যে গার্মেন্টস স্ত্রীর জীবনে পঙ্গুত্বের অভিশাপ ডেকে এনেছে সেখানে লাখ টাকা দিলেও আর নাম লেখাতে চাই না।

জেইউ/এমএআর/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।