ব্যবসার নামে জঙ্গিবাদে জড়িত অনেক বিদেশি!
গত দুই বছরে ২৭ মণ স্বর্ণ জব্দ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। এই সময়ে চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ১১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। আটকদের মধ্যে ১৭ বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৫ শতাধিক। চোরাচালানে যারা জড়িত, তারা আবার জঙ্গিবাদেও জড়িত।
মঙ্গলবার মগবাজারস্থ শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরে নিজ কার্যালয়ে একান্ত সাক্ষাতকারে জাগো নিউজকে এমন তথ্য জানান অধিদফতরে মহাপরিচালক (ডিজি) ড. মইনুল খান।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে জব্দকৃত স্বর্ণের মধ্যে বড় কয়েকটি অভিযানেই প্রায় ১০ মণ স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া স্বর্ণ চোরাচালানের গদফাদার নামে পরিচিত কয়েকজনকে আটক করতে সমর্থ হয় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর।
ড. মইনুল খান বলেন, পল্টনে তল্লাশি চালিয়ে ৬১ কেজি স্বর্ণ ও ৮ কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক মাফিয়া মোহাম্মদ আলীকে আটক করতে সমর্থ হয় কাস্টমস গোয়েন্দা সদস্যরা।
ডিজি জানান, গত বছরের ১৬ এপ্রিল ১০৫ কেজি স্বর্ণ একসঙ্গে জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় বিমানকর্মীদের যোগসাজশ ছিল বলেও তদন্তে উঠে আসে। ইমরান নামে এক বিমান কর্মীকে আটক করা হয়েছে যিনি দীর্ঘদিন বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালানের দেশি গড ফাদারের ভূমিকায় ছিলেন।
কতজন বিদেশি নাগরিককে এখন পর্যন্ত আটক করা হয়েছে জানতে চাইলে ড. মইনুল খান বলেন, সংখ্যাই সবকিছু নয়। জড়িত কাউকে ছাড় না দিতে আমরা চেষ্টা করছি। এ কারণে বিদেশি ১৭ নাগরিককে বিভিন্ন ঘটনায় আটক করা গেছে। এর মধ্যে কূটনীতিক পর্যায়ের ব্যক্তিও আছেন বলে দাবি করেন তিনি।
মইনুল খান বলেন, মুদ্রা, স্বর্ণ বা বিভিন্ন পণ্যসহ বিদেশি নাগরিক আটক হওয়ার বিষয়টি যতটা না গুরুত্বপূর্ণ তার চাইতে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হচ্ছে তাদের উদ্দেশ্য। ব্যবসার আদলে এসে মূলতঃ তারা বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ও ক্রিমিনাল নেটওয়ার্কিং এর কাজ করছে। শুল্ক গোয়েন্দা তদন্তে এর প্রমাণও মিলেছে।
শুল্ক গোয়েন্দা সদস্যদের হাতে চোরাচালানের অভিযোগে বিমানকর্মী, দেশি-বিদেশি ভিআইপি নাগরিক আটক হওয়ায় তোলপাড় শুরু হয়। গত কয়েক মাসেই বিশেষ অভিযানে ৪০ কোটি টাকা সমমূল্যের বিদেশি মুদ্রা জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া ভূয়া ডিক্লিয়ারেশন দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো কসমেটিক্স ও সিগারেটের বড় দুটি চালান আটকে দেয়া হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে।
শুল্ক ও গোয়েন্দা বিভাগের এই শীর্ষকর্তা বলেন, গত ২৪ মাসে আমরা ২৭ হাজার কার্টন সিগারেট জব্দ করেছি। অথচ বিগত ১০ বছরে মাত্র ৩ হাজার বিদেশি অবৈধ সিগারেট জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। এতে করে বিদেশি সিগারেট বাংলাদেশে কম আসছে। দেশি সিগারেটের ব্যবহার বাড়ছে। সরকারও রাজস্ব পাচ্ছে সহজেই।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের সফল তৎপরতার কারণে গত ২৪ মাসে সরকার ৪৩২ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব পেয়েছে বলেও জানান তিনি।
এছাড়া চোরাচালান ঠেকাতে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনতে গত ২৪ মাসে মামলা হয়েছে ৫ শতাধিক। এরমধ্যে গত ৮ মাসেই মামলা হয়েছে ২৭৭টি। এসব মামলায় শতাধিক ব্যক্তি আটক হয়ে জেলে রয়েছেন বলে জানান ডিজি।
গত মাসে বিআরটিএ এর অনুমোদনহীন ৪০টি সাড়ে ৮শ’ সিসি’র মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। তদন্তে উঠে এসছে পুলিশকে ধোকা দেয়ার জন্যই মূলতঃ সন্ত্রাসীরা এইসব মোটরসাইকেল ব্যবহার করে থাকেন। কারণ এ সবের স্পিড সাধারণত ঘণ্টায় ৩০০ কি.মি হয়ে থাকে।
অসাদু ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারে কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, যারা বিভিন্ন পণ্য অবৈধভাবে ইমপোর্ট করছেন তাদের বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করা গেছে। খুব শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বাংলাদেশে অবৈধভাবে ব্যবসা করছেন এমন বিদেশিদের ওপর নজরদারি রয়েছে কিনা জানতে চাইলে ডিজি বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসার নাম করে যেন কোনো বিদেশি হুমকির কারণ না হয়ে উঠেন সেজন্য সব সময় নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।
চোরাচালানের সঙ্গে বিমানকর্মীদের সম্পৃক্ততার ঘটনায় ২টি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। তালিকা ও প্রমাণাদী দেয়া স্বত্ত্বেও কেনো পুলিশ তাদের ধরছে না জানতে চাইলে তিনি বলেন, অধিদফতর হিসেবে যে ধরণের তথ্য উপাত্ত দিয়ে সহেযাগিতা করা যায় তা সবই করা হয়েছে। এখন আটকের দায়িত্ব পুলিশের।
দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অধিদফতরের প্রধান হিসেবে কোনো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন কিনা জানতে চাইলে ড. মইনুল খান বলেন, চ্যালেঞ্জ তো আছেই। গত ২৩ এপ্রিল কাস্টমস এর সদস্য ব্যারিস্টার জাহাঙ্গীর আলমের ওপর গুলির ঘটনা ঘটেছে।
তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন পণ্য, মুদ্রা ও স্বর্ণ জব্দ এবং চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতদের আটক করার ঘটনায় আমরা নানা মুখি চাপে আছি। যারা চাপ দিচ্ছেন তারা কাস্টমসের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য বিভিন্নভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে লজিস্টিক সাপোর্ট ও লোকবলেরও অভাব রয়েছে।
তবে ডিজি এও বলেন, সরকার চায় সুশাসন, সরকার চায় এই প্রতিষ্ঠানটি সুশাসনের প্রতীক হয়ে উঠুক, সে জন্য সরকারি সব ধরণের সহযোগিতা আমরা পাচ্ছি। সফলতার কারণে সরকারও শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরকে কার্যকরী প্রতিষ্ঠান হিসেবে রুপান্তরে সহযোগিতা করছে।
তিনি বলেন, আগে একজন রাজস্ববোর্ডের সদস্য শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর দেখভাল করতেন। এখন সরাসরি রাজস্ববোর্ড প্রধান দেখভালের দায়িত্ব পালন করছেন।
ড. মইনুল খান বলেন, আমি ব্যক্তি মইনুলের চাইতে এই অধিদফতরের ডিজি হিসেবে বেশি সফলতা কামনা করি। তাই যারাই চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাক না কেনো তাদের ছাড় দেয়া হবে না।
জেইউ/আরএস