মৃত্যুর কাছে হেরে গেলেন কবি আশীষ কুমার


প্রকাশিত: ০৩:৫১ পিএম, ২২ মে ২০১৫

অবশেষে মৃত্যুর কাছে হেরে গেলেন কক্সবাজার’র সব্যসাচী লেখক কবি আশীষ কুমার। তিনি দীর্ঘদিন লিভার রোগের সাথে যুদ্ধ করে শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২ টায় চট্টগ্রাম সার্জেস্কুপ-টু হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। তিনি ১৯৫৫ সালের ১ জানুয়ারি কক্সবাজারের রম্যভূমি রামুতে জন্ম গ্রহণ করেন। বিকেল সাড়ে ৫ টার দিকে তার মরদেহ এলাকায় এলে দ্রুত খবর ছড়িয়ে পড়ে। এতে তার সহকর্মী ও সবার মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে যান।

কবি আশীষ কুমারের ছেলে ইমন বড়ুয়া জানান, গত ৩০ মার্চ তার বাবা পাকস্থলিতে ব্যথা অনুভব করে অসুস্থ হয়ে পড়লে রামু ও কক্সবাজারের চিকিৎসা সেবা নেন। পরীক্ষার পর ডাক্তাররা তিনি লিভাররোগে আক্রান্ত হয়েছেন জানালে তাকে ঢাকা পিজি হাসপাতালের নেয়া হয়। তার শারিরীক উন্নতি না হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ভারতে নেয়ার প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু তার শারিরীক অবস্থা দূরে কোথাও নড়াচড়া করার মতো না থাকায় তাকে ভারতে নেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। এরপরও অবস্থা বেশি গুরুতর হওয়ায় গত বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম সার্জেস্কুপ হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২ টায় ইহকাল ত্যাগ করেন।

তিনি আরো জানান, শনিবার সকাল থেকে ধর্মীয় আচারাদি সম্পন্ন করে বিকেলে শেষ কৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন করা হবে।

প্রয়াত আশীষ কুমার বড়ুয়া অসুস্থ হবার পর থেকে তার চিকিৎসা সেবায় সহকর্মী, শুভার্থীসহ যারা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে ছিলেন সবার প্রতি পরিবারের পক্ষে গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন ইমন।

উল্লেখ্য, কক্সবাজার জেলার শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গণে কবি আশীষ কুমার পরিচিত এক নাম। তিনি একাধারে কবি, ছড়াকার, গল্পকার, নাট্যকার, গীতিকার, উপন্যাসিক, চিত্রশিল্পী ও অভিনয় শিল্পী। জেলার নাট্যাঙ্গনের কিংবদন্তী অভিনয় শিল্পী প্রয়াত দীনেশ বড়ুয়া ও প্রয়াত বীণাপানি বড়ুয়ার ছেলে আশীষ কুমার বড়ুয়া কৃতি ফুটবলার হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন।

নব্বই এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তার লেখা নাটক ছিল দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গণের অন্যতম হাতিয়ার। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিশ্বাসী নির্ভীক এক শব্দ সৈনিক। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে নিজ হাতে পোষ্টার লিখে, দেয়াল লিখন লিখে স্বাধীনতাকামী মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন তিনি।

এ পর্যন্ত তার চারটি বই প্রকাশিত হয়েছে। কবিতার বই ‘মাথা নত করবো কেনো’ ‘সূর্য সত্য শেখ মুজিব’ ও উপন্যাস ‘চেনা তবু অচেনা’ প্রকাশিত হয় চিন্তন প্রকাশন কক্সবাজার এবং গল্পের বই ‘এক পলকের দেখা’ প্রকাশিত হয় চট্টগ্রামের বলাকা প্রকাশন থেকে। ‘মর শালা পাবলিক’ ও ‘এ লাশ ঢাকা আসবেই’ নামে দু’টি নাটকের বই যন্ত্রস্থ রয়েছে। প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত প্রায় পাঁচ হাজার ছড়া ও কবিতা এখনো বই আকারে প্রকাশ পায়নি। কবি আশীষ কুমার নাটক লিখেছেন চল্লিশটি। তার মধ্যে একত্রিশটি মঞ্চস্থ হয়েছে। তার লেখা গানের সংখ্যাও প্রায় তিন হাজার। পাঁচ শতাধিক গান বাংলাদেশ বেতার, কক্সবাজার কেন্দ্রে রেকডিং ও প্রচার হয়েছে। তার চৌদ্দটি উপন্যাস, দশটি গল্প ও একটি প্রবন্ধের পাণ্ডুলিপি এখনো প্রকাশিত হয়নি। কবি আশীষ কুমার বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রাণালয়ের গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর কর্তৃক ১৯৮৮ ইংরেজিতে গল্পের জন্যে, ১৯৮৯ ও ১৯৯০ ইংরেজিতে নাটকের জন্যে এবং ১৯৯০ ইংরেজিতে কবিতার জন্যে ‘একুশে সাহিত্য’ পুরস্কারে ভূষিত হন।

আর্থিক দৈনতার মধ্যেও কবি আশীষ কুমার কখনো সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে নীরব থাকেননি। তার সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ড সবসময় সরব থাকত রামু-কক্সবাজারের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গণ। আজকের প্রজন্মের কাছে কবি আশীষ কুমার অনুকরণীয় হয়ে আছেন। কিন্তু দূরারোগ্য ব্যধি সেই সরব সৃষ্টিশীল কবিকে চিরতরে নীরব করে দিয়েছে শুক্রবার দুপুরে।  

সায়ীদ আলমগীর/এসএইচএস/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।