মানবপাচার রোধে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রচেষ্টায় যোগ দিবে বাংলাদেশ
বাংলাদেশ এ অঞ্চলে সব ধরনের অবৈধ চলাচল ও মানবপাচার বন্ধে কার্যকর সমাধান খুঁজে পেতে জোরালো রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর গুরুত্বারোপ করে এ বিষয়টির সমাধানে যে কোনো বৈশ্বিক অথবা আঞ্চলিক প্রচেষ্টায় অংশ নেয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।
শুক্রবার পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হকের নেতৃত্বে ব্যাংককে মানবপাচার সংক্রান্ত অনুষ্ঠিত এক সভায় এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।
সভায় শহিদুল হক বলেন, এ অঞ্চলে যে কোনো ধরনের অবৈধ চলাচল এবং মানবপাচার রোধে কার্যকর, সমন্বিত ও টেকসই সমাধান খুঁজে পেতে জোরালো রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন।
থাইল্যান্ডের রাজধানীতে অবৈধ অভিবাসন বিষয়ে এক বিশেষ বৈঠকে উদ্বোধনী বক্তৃতায় পররাষ্ট্র সচিব বলেন, মানবপাচারে ক্ষতিগ্রস্ত সকলেই ক্ষতিপূরণ পাওয়ার দাবিদার।
পাচার হওয়া অবৈধ অভিবাসীদের জীবন রক্ষা, তাদের দুর্দশা লাঘব এবং তাদের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে আমাদের অবশ্যই সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এই দুর্দশার অবসানে সমুদ্রপথে মানবপাচার রোধে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল সমন্বিত করে যে কোনো বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক উদ্যোগে অংশ নিতে বাংলাদেশ প্রস্তুত রয়েছে।
দল বেধে অবৈধ অভিবাসনের মূল কারণ নিরসনে আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতি জাতিসংঘ মহাসচিবের আহ্বানের কথা উল্লেখ করে শহিদুল হক বলেন, চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য আমাদের অবশ্যই সংকটের কারণ নিরসনে সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে। কোনো সন্দেহ নেই যে অপেক্ষা করার সময় খুবই কম, কার্যত আমরা ইতোমধ্যেই বিলম্ব করে ফেলেছি। আমরা সংগঠিত ট্রান্সন্যাশনাল অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। এই চক্র আমাদের জাতীয় প্রচেষ্টায় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তরিকতা ও দৃঢ়তায় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংহত করার প্রতি গুরুত্বারোপ করে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, পাচারকারীদের সকল তথ্য নিয়ে আমরা যখন সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালাবো, তখনই আমরা এই নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে সক্ষম হবো।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ভারত মহাসাগরে মানবিক ট্রাজেডির ঘটনায় বাংলাদেশ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার এটিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ বিবেচনা করে মানবপাচারের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে।
মানবপাচারের গুরুতর প্রবণতা বন্ধে বাংলাদেশ সকল ধরনের ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান শহিদুল হক।
তিনি বলেন, পাচারের শিকার হওয়ার পর এ মাসে উদ্ধারকৃতদের মধ্যে কিছু বাংলাদেশি রয়েছে। আমরা বিপণ্ণ লোকদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে এসে প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা প্রদান করায় ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, বাংলাদেশ সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিদেশে বিরূপ পরিস্থিতিতে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রত্যাবাসনের দায়িত্ব নিচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা পাচারকারীদের হাতে আমাদের জনগণের জালিয়াতির শিকার হওয়া বন্ধ করতে আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহ ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সতর্ক নজরদারি বজায় রাখছি।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, বাংলাদেশ সমুদ্রসীমা এলাকায় টহল দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সীমান্ত রক্ষা বাহিনীকে নিয়োজিত রেখেছে। ২০১৫ সালে ১ মে থেকে কোস্ট গার্ড সদস্যরা আমাদের জলসীমায় বেশ কিছু নৌযান আটক ও ১৩২ জনকে উদ্ধার করেছে। এছাড়া নৌবাহিনী পাচারের শিকার লোকদের উদ্ধার এবং দুর্বৃত্তদের বিচারের সম্মুখীন সবার জন্য গভীর সমুদ্রে সতর্কাবস্থায় রাখছে।
এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব মানবপাচার মোকাবেলায় সরকারের প্রণীত নীতিমালা ও আইনসমূহ উল্লেখ করেন।
শহীদুল হক মানবপাচার রোধে প্রণীত প্রশাসনিক পদক্ষেপসমূহ তুলে ধরেন। এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে- স্থানীয় সরকারের সর্বনিম্ব পর্যায়ে মানবপাচার রোধ কমিটি গঠন, সকল প্রশাসনিক পর্যায়ে এসব কমিটিতে সংশ্লিষ্ট এনজিও এবং সিএসও’র অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা, পাচার সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের জন্য পুলিশ সদর দফতরে মনিটরিং সেল পরিচালনা, সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সীমান্ত রক্ষা সংস্থাসমূহে, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক গঠন, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের সামর্থ্য গড়ে তোলার লক্ষ্যে সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ, বিচার বিভাগের জন্য মানবপাচার ইস্যু নিয়ে প্রশিক্ষণ পাঠ্যসূচি চালু, সরকার ও বেসরকারি সংস্থার অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পাচারের শিকার লোকদের সুরক্ষা ও পুনবার্সনের জন্য কার্যকর কৌশল গড়ে তোলে।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, বাংলাদেশের বহুমুখী জাতীয় প্রণয়নে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দৃশ্যমান, অবদান রেখে চলেছে এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ মানবপাচারের উৎসস্থল, ট্রানজিট ও গন্তব্য হিসেবে বৈশ্বিক, আঞ্চলিক মানবপাচার মোকাবেলা উদ্যোগের সামনের সারিতে রয়েছে।
তিনি বলেন, জাতিসংঘে বাংলাদেশ মানবপাচার মোকাবেলা সংস্থা বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে অবস্থান করে নিয়েছে।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলাদেশ সার্ক কনভেনশন অন প্রিভেনশন এন্ড কমব্যাটিং ট্রাফিকিং ইন উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন ফর প্রস্টিটিউশন বাস্তবায়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ এবং এ সম্পর্কে তথ্য বিনিময় ও সামর্থ্য গঠন সহায়তা প্রদান কর্মসূচি থেকে লাভবান হওয়ার জন্য বাকি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে।
তিনি বলেন, দ্বিপাক্ষিক পর্যায়ে বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ রেসক্যু, রিকভারি, রিপ্যাট্রিয়েশন অ্যান্ড ইন্টেগ্রেশন (আরআরআরআই) সংক্রান্ত যৌথ কমিটির অধীনে বহু পর্যায়ভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার মাধ্যমে যৌথ পাচার বিরোধী কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করছে।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে আমরা আমাদের সীমান্ত এলাকা জুড়ে সীমান্ত লিয়াজোঁ অফিস স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করেছি। আমরা নিরাপত্তা সহযোগিতা ও সংলাপ সংক্রান্ত সমঝোতা চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছি। এতে ব্যক্তি, মাদক ও অস্ত্র পাচারকারীর বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মানবপাচার মোকাবেলার লক্ষ্যে বাংলাদেশের অব্যাহত প্রয়াসের বিষয়টি ২০১২ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মানবপাচার সংক্রান্ত রিপোর্টে প্রতিফলিত হয়েছে বলে জানান তিনি।
শহীদুল হক বলেন, পাচারকারীদের মিথ্যা প্রলোভন প্রতিরোধ ও সচেতনতা সৃষ্টির বিষয়ে বাংলাদেশের গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। সরকার, সুশীল সমাজ ও এনজিও অংশীদারদের সঙ্গে আমরা মানবপাচার রোধ ব্যবস্থায় দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি।
একে/পিআর