অবশেষে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা পেল ভারত
অনেক আলোচনা-সমালোচনা ও দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে ভারতকে ‘ট্রান্সশিপমেন্ট’ সুবিধা দিল বাংলাদেশ সরকার। যদিও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় এই চুক্তি চূড়ান্ত হবে কিন্তু তার আগেই পরীক্ষামূলকভাবে ভারতে যাওয়ার জন্য ৯২টি কনটেইনার নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছে মিয়ানমারের পণ্যবাহী জাহাজ। আর এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় কোনো দেশে পণ্য নেয়ার সূচনা হলো।
মঙ্গলবার বন্দরের ১৩ নম্বর জেটিতে ভিড়েছে আড়াইশ’ কনটেইনারবাহী মিয়ানমারের পণ্যবাহী জাহাজ ‘ইরাবতী স্টার’। ওই জাহাজে পণ্যভর্তি ৯২টি কন্টেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে নামানো হবে। পরে আরেকটি জাহাজে করে ভারতের চেন্নাই, কোচিন ও নভোসেবা বন্দরে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখান থেকে নির্দিষ্ট কোম্পানির কাছে পৌঁছে যাবে। মিয়ানমার থেকে ভারতের এসব বন্দরে সরাসরি জাহাজ সার্ভিস চালু না থাকায় পণ্যগুলো চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে ভারতে যাবে। নরেন্দ্র মোদির সফরের পর এই ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা ধারাবাহিকভাবে ‘ট্রানজিটে’ রূপ পেতে পারে বলে মনে করছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এক দেশের পণ্য আরেক দেশ ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে নেয়ার নাম ট্রান্সশিপমেন্ট। র্দীঘদিন ধরে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে ভারতের বিভিন্ন বন্দরে পণ্য নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলে আসছিল। আলোনাচনার পাশাপাশি সমানভাবে চলে আসছিল সমালোচনাও। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ভারতকে ট্রানজিট কিংবা ট্রান্সশিপমেন্ট দেয়ার বিরোধিতা করে আসছিল দীর্ঘদিন ধরে। আওয়ামী লীগ সরকার প্রথমবার সরকার গঠনের পর ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার আলোচনা শুরু হয় প্রথমবার।
ঠিক তখন থেকেই বিরোধিতা করে আসছিল তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপিসহ কয়েকটি ছোট রাজনৈতিক দল। এসব বিরোধীতার মুখে তখন ওই আলোচনা পিছিয়ে যায়। কিন্তু ওয়ান ইলেভেনের পর আওয়ামী লীগ সরকার আবার সরকার গঠন করলে ‘ট্রানজিটের আলোচনাটি ‘ট্রান্সশিপমেন্টে’ রূপ নেয়। শুরু থেকেই ভারত ট্রান্সশিপমেন্টের সুবিধা চেয়ে আসছিল সরকার থেকে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তারই বাস্তবায়ন ঘটলো মঙ্গলবার।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, মিয়ানমারের পণ্য নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে ভারত যাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সরাসরি পণ্য যাওয়ার নজির রয়েছে। মায়ানমার থেকে ছেড়ে আসা ‘ইরাবতী স্টার’ আড়াই’শ কন্টেইনার নিয়ে জাহাজটি মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরে নোঙর করে। বিকেলে বন্দরের ১৩ নম্বর জেটিতে ভিড়ে। এরমধ্যে ৯২টি কন্টেইনার ভারতের চেন্নাই, কোচিন ও নভোসেবা বন্দরে যাবে।
ইরাবতী জাহাজটি ভারতের কলকাতার হলদিয়া বন্দরে যেতে পারলেও নিয়ম অনুযায়ী চেন্নাই, কোচিন ও নভোসেবা বন্দরে যেতে পারবে না। তাই চট্টগ্রাম বন্দর থেকে অন্য একটি জাহাজে করে পণ্যগুলো সেখানে পাঠানো হবে। ট্রান্সশিপমেন্টের সুবিধার পণ্য ২৮ দিন বিনামূল্যে চট্টগ্রাম বন্দর ইয়ার্ডে রাখার সুযোগ আছে। এরপর থেকে বন্দরের নিয়মিত ভাড়া প্রযোজ্য হবে। পরিবহন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্টের পণ্যগুলো জাহাজ থেকে নামিয়ে ইয়ার্ডে রাখা এবং আবার আরেকটি জাহাজে তোলা বাবদ সাধারণ ভাড়া পাবে বন্দর। এতে করে চট্টগ্রাম বন্দরের আয় বাড়বে।
সূত্র জানায়, ইরাবতী জাহাজটি পণ্য নিয়ে থাইল্যান্ডের লেইম চাবাং বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে ভিয়েতনামের হো চি মিন বন্দরে পণ্য নিয়ে সিঙ্গাপুর-পোর্ট কেলাং-ইয়াংগুন হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য নামিয়ে কলকাতার হলদিয়া বন্দর পর্যন্ত যাবে।
এব্যাপারে ‘ইরাবতী স্টার’ জাহাজের স্থানীয় এজেন্ট ইউনি বেঙ্গলের মহাব্যবস্থাপক খাইরুল ইসলাম জাগো নিউজকে জানান, এই ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে নবযুগের সূচনা হলো। চট্টগ্রাম বন্দরকে সিঙ্গাপুরের মতো আন্তর্জাতিক মানের বন্দর হিসেবে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাশ্ববর্তী দেশগুলোতে ট্রান্সশিপমেন্টের সুবিধা থাকা খুবই প্রয়োজন। এটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকায় দেশের ক্ষতির পাশাপাশি পাশ্ববর্তী দেশগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) জাফর আলম বুধবার জাগো নিউজকে জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের আগে শুভেচ্ছাস্বরূপ ট্রান্সশিপমেন্ট কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এক দেশের পণ্য আরেক দেশের বন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় কোনো দেশে পণ্য পরিবহনের সুবিধা চালু হলো।
তিনি বলেন, ট্রান্সশিপম্যান্টের জন্য বন্দরের সক্ষমতা রয়েছে। এটা চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের আয় বাড়বে। বিশ্বের অন্যান্য বন্দরের ন্যায় সুনাম বৃদ্ধি পাবে। ভারতকে ট্রানজিট দেয়া হয়েছে কি-না জানতে চাইলে জাফর আলম বলেন, ‘এই ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধাটার আদ্যপান্ত এবং সবকিছু চূড়ান্তসহ হবে নরেন্দ্র মোদির সফরের পর। এবং তখনই ক্লিয়ার হবে ভারতকে ‘ট্রানজিট’ দেয়ার বিষয়টি। এখনই ট্রানজিটের ব্যাপারে বলা যাবে না। এটা স্রেফ ‘ট্রান্সশিপমেন্ট’ যেটা যেকোনো দেশের সঙ্গে হতেই পারে।’ তবে বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘ট্রান্সশিপমেন্ট’র এই সুবিধা পর্যায়ক্রমে ‘ট্রানজিটে’ রূপ নিবে।
শিপিং-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় ১৩ বছর আগে ২০০২ সালে স্থলপথে বাংলাদেশ থেকে একটি ট্রানজিট কার্গোর চালান নেপালে পাঠানো হয়েছিল। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০১২ সালের ২৫ এপ্রিল দুই কনটেইনারে ৪০ টন প্লাস্টিক পণ্য চীন থেকে আমদানি হয়ে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে নেপালে যায়। পণ্যগুলো বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে প্রবেশ করে ভারতের ফুরেরওয়ারি ও পানির ট্যাংক নামক স্থান দিয়ে স্থলপথেই নেপালের কাকরভিটায় গিয়েছিল। ট্রান্সশিপমেন্ট পণ্য আমদানির সর্বশেষ ঘটনা ছিল সেটিই।
বন্দর সূত্র জানায়, ভারত ও পাশের দেশগুলোকে ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ টন (দুই মিলিয়ন টন) কার্গো হ্যান্ডলিং করবে। এই দুই মিলিয়ন টন পণ্য অর্থাৎ প্রায় দুই লাখ একক কনটেইনারের অর্ধেক চট্টগ্রাম বন্দর ও বাকি অর্ধেক মংলা বন্দর হ্যান্ডলিং করবে বলে কোর কমিটি প্রাথমিক ধারণা দিয়েছিল।
বিএ