ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা
জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। আর এ ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা। নিত্যপণ্যে, বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা সেবা, ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা প্রতিটি ক্ষেত্রে খরচ বেড়েছে মাত্রাতিরিক্ত। আর এই অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা তাদের সঞ্চয় ভেঙে চলেছেন। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়িয়েছে সরকার। ইতিমধ্যে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে নিত্যপণ্য ও বাড়িভাড়ায়। সামনে বাজেটে এ নিয়েও দুশ্চিন্তায় নিম্ন আয়ের মানুষ।
কারণ বাজেট মানে কিছু পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। বাজেটে যেসব পণ্যের দাম কমানোর ঘোষণা থাকে, বাস্তবে তা কমতে বাজেট পাস হওয়ার পরও ৩ মাস পর্যন্ত সময় লাগে। কিন্তু কোনো পণ্যের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা এলে পরের দিনই তা বেড়ে যায়। সব মিলিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা ভালো নেই। বাড়তি ব্যয় মেটাতেই তাদের নাভিশ্বাস।
সরকারি-বেসরকারি সংস্থার জরিপ ও বিভিন্ন ব্যক্তি শ্রেণীর-পেশার মানুষের মতামতের ভিত্তিতে দেখা গেছে, গত এক বছরে মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় বেড়েছে ১৫ থেকে ১৮ শতাংশের বেশি। বিপরীতে আয় বেড়েছে ৬ থেকে ৮ শতাংশ।
যেসব খাতে খরচ বেড়েছে এরমধ্যে রয়েছে- বাড়িভাড়া, নিত্যপণ্য, সন্তানের লেখাপড়ার খরচ, যানবাহনের ভাড়া এবং চিকিৎসা ব্যয়। ওই হিসাবে আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে ১০ শতাংশ বেশি। আর এই বাড়তি ব্যয় মেটাতে মানুষকে সঞ্চয় কমাতে হয়েছে। নিম্নআয়ের মানুষ বড় কোনো রোগ না হলে চিকিৎসা নিচ্ছে না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আগামী দিনে আরও দুর্দিন আসছে।
ক্যাবের জরিপ : গত বছরের শেষের দিকে ১১৪টি খাদ্যপণ্য, ২৬টি নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রী এবং ১০টি সেবা মূল্য পর্যালোচনা করে জরিপ ফল প্রকাশ করেছে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরের ১৫টি পাইকারি ও খুচরা বাজার থেকে বিভিন্ন পণ্য ও সেবামূল্য নিয়ে এ জরিপ চালায় তারা। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী এক বছরে পণ্য ও সেবামূল্য বেড়েছে শতকরা ১২ দশমিক ১৭ ভাগ। বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ। সার্বিকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ১০ শতাংশের ওপরে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে দেখা গেছে, চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। এরমধ্যে খাদ্য-পণ্যের মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ০ শতাংশ। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। কিন্তু বাজেটে মূল্যস্ফীতির এ হার সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী আহম মোস্তফা কামাল বলেন, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ইলিশের দাম বাড়তি থাকে। ফলে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়তি ছিল।
অন্যদিকে বিবিএসের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বছরজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতায় খাদ্যে সরবরাহ ঘাটতি ছিল। ফলে শাক-সবজি, ফল, মসলা, মাছ, মাংস, তেল ও দুধ প্রভৃতি দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি হয়েছে।
যানবাহনের ভাড়া :
প্রতি বছরই যানবাহনের ভাড়া বাড়ছে। গন্তব্য যত কাছেই হোক ঢাকার শহরে ১৫ টাকার কম রিকশা ভাড়া নেই। ফলে গত এক বছরে মানুষের যাতায়াত ২২ শতাংশ বেড়েছে। যানবাহনের ভাড়া ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় মানুষের বিনোদন ও ভ্রমণ ব্যয় বেড়েছে।
ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ :
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেতন ও কোচিং সেন্টারের খরচসহ ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ বেড়ছে পাল্লা দিয়ে। লেখাপড়ার খরচের মধ্যে ভর্তি ফি এখন অনেক অভিভাবকদের জন্য বোঝা। একই সঙ্গে স্কুলের বেতন। আগে যে স্কুলে বেতন ছিল ৩ হাজার টাকা, এখন তা হয়েছে ৫ হাজার টাকা। নতুন ভর্তির ক্ষেত্রে ডোনেশনের নামে নেয়া হচ্ছে বেশি টাকা। ওই হিসাবে অন্য খাতের তুলনায় গড়ে লেখাপড়ার খরচ বেড়েছে।
চিকিৎসা ব্যয় :
গত এক বছর ধরে অব্যাহতভাবে বাড়ছে ওষুধের দাম। একই সঙ্গে ডাক্তারের ফি, ল্যাবরেটরি টেস্টের খরচ বেড়েছে। ফলে এক বছরে চিকিৎসা ব্যয় ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এছাড়াও মানুষের অন্য ব্যয় বেড়েছে ১৫ শতাংশ।
সরকারি জরিপ :
সরকারের অর্থনৈতিক জরিপে দেখা গেছে, ৯৫-৯৬ সালে বাজারমূল্যে মাথাপিছু ভোগ্যপণ্য ও সেবা বাবদ ব্যয় হতো ১১ হাজার ১০৮ টাকা। ২০০৯-১০-এ এসে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ২২ টাকা। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। সরকারি সংস্থা টিসিবি অনুযায়ী গত এক বছরে ৩২টি পণ্যের দাম বেড়েছে। এরমধ্যে গরুর মাংসের দাম বেড়েছে ৩২ দশমিক ৭৩, ইলিশের দাম বেড়েছে ৩০, হলুদের দাম ৩২, খাসির মাংসের দাম ২৫, ডিম ৯, পিঁয়াজ ৩০, জিরা ২৬, রসুন ২৪ এবং শুকনা মরিচের দাম ১৫ শতাংশ বেড়েছে।
কিভাবে বাড়তি ব্যয় সামাল দেয়া হচ্ছে :
গত এক বছরের আয়-ব্যয়ের বৈষম্য বেসামালভাবে বাড়ছে। এই ব্যয় সামাল দিতে কমে আসছে সঞ্চয়। এক বছরে দেখা গেছে, মানুষের সঞ্চয়পত্র ভাঙার হিড়িক পড়েছে। আর ব্যাংকগুলো থেকে মানুষ বিপুল পরিমাণ আমানত তুলেছে। অর্থাৎ বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে সঞ্চয় কমেছে।
এআরএস/এমএস