বাণিজ্যিক হয়ে পড়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা!


প্রকাশিত: ০৪:২০ এএম, ২১ জুন ২০১৫

বড় বেশি বাণিজ্যিক হয়ে পড়েছেন মহৎ পেশার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা! সরকারিভাবে কোনো আইন বা নীতিমালা না থাকায় প্রাইভেট চেম্বারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা রোগীদের কাছ থেকে ইচ্ছে মাফিক ভিজিট (কনসালটেশন ফি) আদায় করে নিচ্ছেন।

চিকিৎসকভেদে রোগী প্রতি ভিজিটের হার সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার ২০০ টাকা। প্রতিদিন চেম্বারে একেকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জন রোগী দেখছেন। শুধু প্রথম সাক্ষাতেই ভিজিট ছাড়াও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে পরবর্তীতে রিপোর্ট দেখাতে গেলেও কেউ কেউ অর্ধেক ভিজিট আদায় করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশেষজ্ঞরা চিকিৎসকদের কেউ সরকারি হাসপাতাল আবার কেউবা বেসরকারি হাসপাাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চাকরি করছেন। দাফতরিক কাজ শেষ করেই তারা চেম্বারে ছুটে যান। গভীর রাত পর্যন্ত একের পর এক রোগী দেখতে থাকেন।

সাধারণ রোগীদের অভিযোগ, আগের তুলনায় ২০/৩০ গুণ বেশি টাকা ভিজিট দিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে দেখালেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের অসন্তুষ্টি নিয়ে ফিরতে হয়। তারা মন খুলে সমস্যার কথা চিকিৎসককে জানাতে বলতে পারেন না। সমস্যা না শুনেই দ্রুত প্রেসক্রিপশন লিখে বিদায় করে দেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দি মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশনস) অর্ডিন্যান্স ১৯৮২ অনুসারে রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ কনসালটেশন ফি বেঁধে দেয়া হয়েছিল। ওই সময় অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকদের প্রথম কনসালটেশনে ৪০ টাকা, দ্বিতীয় কিংবা পরবর্তী ভিজিটে ২০ টাকা, বাড়িতে গিয়ে দেখলে ৮০ টাকা, সহকারী অধ্যাপক, সিভিল সার্জন ও সমমানের কিংবা অতিরিক্ত স্বীকৃত ডিগ্রিধারী চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে প্রথম কনসালটেশনে ৩০ টাকা, দ্বিতীয় কিংবা পরবর্তী ভিজিটে ১৫ টাকা, বাড়িতে গিয়ে দেখলে ৬০ টাকা এবং অন্যদের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে ২০ টাকা, ১০ টাকা ও ৪০ টাকা নির্ধারিত ছিল। ১৯৯০ সালে রাষ্ট্রপতির এক আদেশে পূর্বের সব আদেশ বাতিল করা হয়।

রাজধানীর মিরপুরের গৃহবধূ রাহেলা আক্তার জানান, কিছুদিন আগে তিনি ধানমন্ডিতে একজন শিশু বিশেষজ্ঞের চেম্বারে যান। কয়েকদিন জ্বরে ভুগে তার তিন বছরের মেয়ে দাঁড়াতে পারছিল না। দুই ঘণ্টা সিরিয়ালে অপেক্ষার পর অসুস্থ বাচ্চাকে নিয়ে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি পান।

ভিতরে প্রবেশের সময় তিনি ভেবেছিলেন চিকিৎসকের কাছে তিনি মেয়ের সমস্যার ব্যাপারে খোলামেলা কথাবার্তা বলবেন। কিন্তু চিকিৎসক তার একটি কথাও শুনলেন না। কেইস হিস্ট্রিতে একবার চোখ বুলিয়ে একগাদা পরীক্ষা লিখে পরে দেখা করতে বলেন। মুখ খুলে কিছু বলতে গেলে চিকিৎসক তাকে চোখের ইশারায় থামিয়ে দেন বলে ওই গৃহবধূ জানান।  

জানা গেছে, ১৯৯০ সালে চিকিৎসকদের বিভিন্ন সংগঠন আশ্বাস দিয়েছিলেন তারা পারস্পরিক আলোচনাক্রমে রোগীদের স্বার্থ দেখে সময়ে সময়ে কনসালটেশন ফি নির্ধারণ করে সরকারকে অবহিত করবেন। কিন্তু পরবর্তীতে সে পদ্ধতিতে আর ফি নির্ধারণ হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, হাল আমলে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চেম্বারে রোগী দেখার আগের অনুকূল পরিবেশ নেই। অনেকে ঠাট্টা করে বলেন, বড় বড় হাসপাতালে রোগী দেখার চেম্বার এখন রীতিমতো ‘বিনোদন কেন্দ্র’!

তারা বলেন, মাত্র কয়েক বছর আগেও চিকিৎসকদের কক্ষে শুধুমাত্র রোগী দেখার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সাজসরঞ্জাম শোভা পেলেও বর্তমানে অধিকাংশ চিকিৎসকদের চেম্বারে রিমোট নিয়ন্ত্রিত রঙ্গিন টেলিভিশন, ফ্রিজ, এয়ারকন্ডিশন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের সুসজ্জিত আসবাবপত্র শোভা পাচ্ছে।

রোগীদের অভিযোগ, চিকিৎসকদের অনেকেই রোগী দেখার সময় টেলিভিশনে দেশি-বিদেশি চ্যানেলে নাটক-গান ছেড়ে দেখছেন। মোবাইল ফোনে কথা বলছেন। কেউবা রোগীকে বসিয়ে রেখে নাস্তাও খাচ্ছেন।

স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন জাতীয় কমিটির সভাপতি ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক প্রফেসর ডা. রশীদ ই মাহবুব বলেন, রোগীদের কাছ থেকে কনসালটেশন ফি আদায়ের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের বিভিন্ন সোসাইটির দায়িত্ব নেয়ার কথা থাকলেও তারা সেটি নিচ্ছেন না।

বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সময় নিয়ে রোগী দেখছেন না- এমন অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে অধ্যাপক মাহবুব বলেন, সবার ক্ষেত্রে ঢালাওভাবে এ কথা সত্যি নয়। তিনি বলেন, রোগীর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কমপক্ষে রোগী প্রতি মিনিট দশেক সময় দেয়া উচিত।

চিকিৎসকদের চেম্বারে টেলিভিশনসহ বিভিন্ন বিনোদন সামগ্রী থাকা প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি তা সম্পূর্ণ অনৈতিক উল্লেখ করে বলেন, ওই সময় চিকিৎসককে শুধুমাত্র রোগীর অসুখ নিয়ে মনোনিবেশ করতে হবে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) এর একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, পেশাজীবি হিসেবে ডাক্তারদের ভিজিট আদায়ের হার নির্ধারণ করে দেয়ার বিষয়টি তাদের এখতিয়ারে নেই।

তবে পেশাজীবী হলেও তারা মহান পেশায় জড়িত বিধায় স্ব-উদ্যোগেই ফি নির্ধারণ করে জনগণকে জানানো উচিত বলে ওই কর্মকর্তা মন্তব্য করেন।

এমইউ/বিএ/এআরএস/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।