শিশুদের ডুবে মৃত্যু রোধে আশার আলো আইসিবিসি, পথ হারাবে না তো?
দেশে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৩০টি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। এই সংখ্যা বছরে প্রায় ১১ হাজার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু দুর্ঘটনা নয়, বরং নীরবে চলতে থাকা একটি জনস্বাস্থ্য সংকট। নীরব এই সংকট ঠেকাতে ‘সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা এবং সাঁতার সুবিধা প্রদান (আইসিবিসি) প্রকল্প’।
মাঠপর্যায়ে এই প্রকল্পের ইতিবাচক ফলও মিলেছে। একে কার্যকর মডেল হিসেবেও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু প্রথম পর্যায় শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় ধাপের অনুমোদন ঝুলে থাকায় এখন প্রশ্ন উঠেছে—কার্যকর প্রমাণিত এই উদ্যোগ কি শেষ পর্যন্ত পথ হারাবে?
গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বাবা-মায়েরা কাজে ব্যস্ত থাকায় ছোট শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। এসময় শিশুদের কমিউনিটিভিত্তিক যত্নকেন্দ্রে নিরাপদ পরিবেশে রাখার পাশাপাশি শিক্ষামূলক ও বিকাশমূলক কার্যক্রম এবং সাঁতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি ৮০ শতাংশেরও বেশি কমানো সম্ভব।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বল্প সময়ের জন্য বাস্তবায়িত হলেও আইসিবিসি প্রকল্প এরই মধ্যে ইতিবাচক ফল দেখাতে শুরু করেছিল। শিশু সুরক্ষার পাশাপাশি এটি নারীর কর্মসংস্থান ও সামাজিক সচেতনতাও বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। প্রথম পর্যায়ের প্রকল্প শেষ হওয়ার পর এখন আওতা বাড়িয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়নের কাজ চলছে।
তবে সরকারের সংকটটি উপলব্ধির ঘাটতি ও বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন প্রকল্পটি অনুমোদন এবং বাস্তবায়ন নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই ডুবে শিশুমৃত্যুর ক্ষেত্রে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো কমিউনিটিভিত্তিক এ মডেল লুফে নিলেও বাংলাদেশে আইসিবিসি প্রকল্পটি পথ হারাবে না তো, সেই প্রশ্ন তাদের। তাই কার্যকর প্রমাণিত এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১১ হাজার শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। ২০১৬ সালের বাংলাদেশ হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে (বিএইচআইএস) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, এই বয়সী শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণই ডুবে মৃত্যু। গবেষণায় দেখা গেছে, কমিউনিটিভিত্তিক শিশুযত্ন কার্যক্রম ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি ৮০ শতাংশের বেশি কমাতে পারে।
ডুবে মৃত্যুরোধে শিশুদের সাঁতার শেখানোর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে (ডুবে মৃত্যুর) যত্নকেন্দ্রে রেখে তাদের প্রারম্ভিক বিকাশের কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি একটি কার্যকর মডেল। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাও এ মডেলকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে কার্যকর কৌশল হিসেবে সুপারিশ করেছে। ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ মডেল বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এ প্রেক্ষাপটে ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি-বেজড চাইল্ডকেয়ার (আইসিবিসি) প্রকল্পের মাধ্যমে এমন উদ্যোগ চালু করে। কিন্তু, সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ ও নানা জটিলতায় ২০২২ সালের সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা এবং সাঁতার সুবিধা প্রদান (আইসিবিসি) প্রকল্প মূলত শুরু হয় ২০২৪ সালে। তাই ডুবে মৃত্যু রোধে কার্যকর এ প্রকল্প দেড় বছরের মধ্যেই গত ডিসেম্বর মাসে শেষ হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
যত্নকেন্দ্রে অন্যদের সঙ্গে মেশার পাশাপাশি শেখারও সুযোগ পায় শিশুরা/ছবি: জাগো নিউজ
শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ডুবে মৃত্যুরোধে শিশুদের সাঁতার শেখানোর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে (ডুবে মৃত্যুর) যত্ন কেন্দ্রে রেখে তাদের প্রারম্ভিক বিকাশের কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি একটি কার্যকর মডেল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এ মডেলকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে কার্যকর কৌশল হিসেবে সুপারিশ করেছে। ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ মডেল বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন
তুরাগ নদীতে তলিয়ে যাওয়া বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ গেলো দুই কিশোরের
পদ্মা ব্যারাজ: ফারাক্কার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে ১৯ জেলা
কুমিল্লায় খেলতে গিয়ে পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু
প্রকল্প নেওয়ার আগে গবেষণা হয়েছে। কোন শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ তা সেখানে উঠে এসেছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, গ্রামাঞ্চলে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বাবা-মায়েরা যখন কাজে ব্যস্ত থাকেন তখন শিশুরা বেশি পানিতে ডুবে মারা যায়। এজন্য ওই সময়টা শিশুদের নির্দিষ্ট স্থানে রাখতে পারলে এই মৃত্যুহার অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে ওই সময়টা শিশুদের শিক্ষামূলক নানা কর্মকাণ্ডে রাখা যেতে পারে, যেন শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশটা হয়। সেই অনুযায়ী নতুন প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।
ডুবে শিশু মৃত্যুরোধ ছাড়াও শিশুর বিকাশ নিশ্চিত, নারীর ক্ষমতায়নেও ভূমিকা রাখছিল এটি। কিন্তু, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের পর এর ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
যদিও প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রস্তাবনাও তৈরি করা হয়েছে। এ পর্যায়ে আগের ১৬টিসহ মোট ৩০টি জেলায় এ কর্মসূচি সম্প্রসারিত হবে। উপজেলা বেড়ে হবে ৭৯টি। শিশু যত্নকেন্দ্র হবে ১৩ হাজার ৮৯০টি। দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পের আওতায় ১০ লাখ শিশু আসবে। সাঁতার শেখানো হবে ৬ লাখের শিশুকে। আর বাকি ৪ লাখ শিশু যত্নকেন্দ্রে প্রারম্ভিক বিকাশ কর্মসূচির আওতায় আসবে।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিশুদের ডুবে মৃত্যুরোধে মন্ত্রণালয় আন্তরিক। আইসিবিসি প্রকল্পটি চলমান রাখা হবে।
প্রথম পর্যায়ের প্রকল্পে যা করা হয়েছে
শিশু একাডেমি থেকে জানা গেছে, সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা এবং সাঁতার সুবিধা প্রদান (আইসিবিসি) প্রকল্পের দেশের ১৬টি জেলার ৪৫টি উপজেলায় বাস্তবায়িত হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ৮ হাজার ২০টি শিশু যত্নকেন্দ্রে এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী ২ লাখ ৫০০ জন শিশু (বয়স ১-৫ বছর) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। প্রতিটি কেন্দ্রে ভর্তি ছিল ২৫ থেকে ৩০টি শিশু।
এক হাজার ৬০০টি সুইমসেইফ সুবিধাকেন্দ্রে ৩ লাখ ৬০ হাজার শিশু (বয়স ৬-১০ বছর) অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৯৮২ শিশুর সাঁতার শেখা সম্পন্ন হয়েছে।
২ লাখ অভিভাবক শিশু লালন-পালনের বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। ১৬ হাজার নারী চাকরি ও নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায়িত হয়েছেন। যত্নকেন্দ্রগুলোর যত্নকারী ও সহকারী যত্নকারীরা মৌলিক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এছাড়া ১৬টি জেলা ও ৪৫টি উপজেলায় ইসিসিডি কর্মকর্তা ও সুপারভাইজার এবং সাঁতার প্রশিক্ষক ও সাঁতার সুপারভাইজারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের কোনো অর্থ খরচ নেই।
প্রকল্পে মোট ব্যয় ছিল ৩০৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। বেসরকারি সংস্থা ও সরকারের অন্যান্য দপ্তরের সহায়তায় মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় শিশু একাডেমির মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে।
একটি যত্নকেন্দ্রের দেয়ালে সাঁটানো বর্ণমালা, মাছ, পাখি, প্রাণী, ফলের ছবি, বাচ্চাদের আঁকা ছবি ও ছাড়া/ছবি: জাগো নিউজ
উন্নয়ন সহযোগী ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস এবং যুক্তরাজ্যের রয়েল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউট (আরএনএলআই)। মোট প্রকল্প ব্যয়ের ২০ শতাংশ দিয়েছে তারা।
যা বলছেন সুবিধাভোগী ও মাঠপর্যায়ের প্রকল্প সংশিষ্টরা
আইসিবিসি প্রকল্পের অধীনে নরসিংদীতে ৫০০টি শিশু যত্নকেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে ১১ হাজারের বেশি শিশু ছিল। প্রতিটি কেন্দ্রে একজন যত্নকারী ও একজন সহকারী যত্নকারী ছিলেন। যত্নকারী ৪ হাজার ও সহকারী ২ হাজার টাকা সম্মানি পেতেন।
নরসিংদীর মনোহরদীর চন্দনবাড়ী ইউনিয়নের শিশুযত্ন কেন্দ্র। দোচালা টিনের ঘর। গত ডিসেম্বরে প্রকল্প শেষ হলেও স্থানীয়দের উদ্যোগে কোথাও কোথাও কেন্দ্র খোলা আছে।
কেন্দ্রের মাটির মেঝেতে পাটি বিছানো। ঘরটি সুন্দর করে সাজানো। দেয়ালে ব্যঞ্জন ও স্বরবর্ণের সরণি, সংখ্যা এবং মাছ, পাখি, প্রাণী, ফলের ছবিসহ নাম লেখা চার্ট। বাচ্চাদের আঁকা ছবি ও ছাড়াও সাঁটানো আছে দেয়ালে। এসবের ফাঁকে ফাঁকে দেয়ালেও শোভা পাচ্ছে কাগজের ফুল, প্রজাপতি। একপাশে গল্পের ভুবন, আরেক পাশে স্বপ্নের ভুবন।
বাসায় থাকলে শিশু মোবাইল নিয়ে সময় কাটাতো। তার বিকাশ বিঘ্নিত হতো। কিন্তু, আমাদের কেন্দ্রে এসে ওই শিশু শিখছে, অন্যদের সঙ্গে মিশছে। তার বন্ধু হচ্ছে, সে সমাজিকতা শিখছে। ঝুঁকিগুলো থেকে তো সে নিরাপদ থাকছেই।- নাহিদ সুলতানা, ইসিসিডি কর্মকর্তা
যত্নকারী শান্তা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ‘কেন্দ্রে আমরা সকাল ৯টায় এসে কুশল বিনিময় করি। তারপর তাদের ইচ্ছামতো একটা খেলা দেই। আসার সময় কী কী দেখেছে, সেগুলো জিজ্ঞাসা করি। এরপর দুটি গ্রুপ করি, যাদের বয়স ১ থেকে ৩ বছর তাদের একটি গ্রুপ, ৪ থেকে ৫ বছরের শিশুদের জন্য আরেকটি গ্রুপ। আমি একটি দল নিয়ে বসি, আর সহকারী আরেকটি দল নিয়ে বসে। এরপর আমরা ছড়াগান, নানা অঙ্গভঙ্গি করে তাদের আনন্দ দেই, শিখাই। ১২টায় টিফিন, ২টার দিকে ছুটি। আমাদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আগে আমরা স্বামীর ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। এটার মাধ্যমে আমাদের আয়ের পথ খুলেছিল। আমরা আমাদের খরচ নিজেরাই চলাতে পারছি। ঘরেও দিছি। গত ডিসেম্বরের পর কেন্দ্র বন্ধ। এখন স্বামীর কাছে চাইতে হয়। টাকা চাইলেই স্বামীর প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। এখন অসহায়ের মতো হয়ে গেছি। আমরা চাই সেন্টারগুলো আবার শুরু হোক।’
শান্তা বেগম আরও বলেন, ‘শুধু আমার অর্থনৈতিক লাভই না। এ সেন্টারের মাধ্যমে শিশুরা শিখতে পারছে, জানতে পারছে। আর সবচেয়ে বড় পাওয়া হচ্ছে শিশুটি নিরাপদ থাকছে। যত্নকেন্দ্র থেকে যে শিশুটি যাচ্ছে, তার মধ্যে জড়তা থাকে না। স্কুলে ভর্তি হয়ে সে অন্যদের থেকে ভালো করছে।’
সহকারী যত্নকারী শিউলী আক্তার বলেন, ‘সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বাচ্চারা এখানে থাকে। তারা এখানে আনন্দে থাকে। খেলনা দেই। ছড়া গান গাই। বেশি ছোট বাচ্চাদের আমি সামলাই। আর ম্যাডাম (যত্নকারী) বড় বাচ্চাদের নানা কিছু শিখায়।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের যাই হতো, কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়াতে সেই উপার্জনও বন্ধ। তিন মাস ধরে আমরা টাকা পাই না।’
নাতি আরিয়ানকে নিয়ে আসতেন দাদি হাজেরা খাতুন। হাজেরা বলেন, ‘ছেলে ওয়ার্কশপে কাজ করে। নাতিরা বেশি দুষ্টুমি করে। এখানে এলে খেলাধুলা করে, পড়ে। এখন তো বন্ধ। ভয়ে থাকি কোন সময় কোন দুর্ঘটনা ঘটে। আমরা বড় নাতিও এখানে পড়ছে।’
যত্নকেন্দ্রে অঙ্গভঙ্গি করে শিশুদের শেখাচ্ছেন একজন যত্নকারী/ছবি: জাগো নিউজ
সুমা আক্তারের বাড়ি অর্জুনচর ফকির বাড়ি ১ নম্বর ওয়ার্ডে। তিনি বলেন, ‘আমার তিন মেয়ে। সবচেয়ে ছোটটার বয়স ২ বছর। আমি নানা কাজে থাকি। যখন কাজ করি, ওরা ময়লার মধ্যে খেলে, খায়ও, পোলাপান বোঝে না। ৪ দিন ধরে পাতলা পায়খানা। বাড়ি রাস্তার সাথে, সারাদিন গাড়ি চলে, বার বার দৌড় দিয়ে চলে যায়। সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকি কোন সময় গাড়ির নিচে পড়ে যায়। কিন্তু যখন কেন্দ্র খোলা ছিল, সেখানে রাইখা আমরা নিশ্চিন্তে কাজ করতাম। বাচ্চা এখন থেকে অ, আ, ক, খ এখন থেকেই শিখে যাইতো। কয়েক মাস ধরে সেন্টার বন্ধ। এগুলো খুলে দেওয়া উচিত। আমরা কই নতুন সরকার আইছে যত্নকেন্দ্র খোলে না কেন? হেরা কী বোঝে না কেন্দ্র খুললে বাচ্চাগুলা নিরাপত্তা থাকবো?’
মনোহরদীর শিশুযত্ন কেন্দ্রের সুপারভাইজার (মনোহরদীর ৫০টি কেন্দ্র) তাহমিনা ইয়াসমিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘শিশু যত্নকেন্দ্রে শিশুরা নিরাপদ থাকে, এটা হলো সবচেয়ে বড় বিষয়। এছাড়া শিশুদের বিকাশের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে এ কেন্দ্রগুলো। শিশুর ভাষাগত, বুদ্ধি, শারীরিক, সামাজিক ও আবেগের বিকাশের জন্য নানা কলাকৌশল অবলম্বন করা হয়। এ বিষয়ে যত্নকারী ও সহকারী যত্নকারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ বিকাশগুলো হলে শিশু পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠে। এত সুবিধা, কিন্তু অভিভাবকদের কোনো খরচও নেই।’
আরও পড়ুন
জনকল্যাণমুখী ও কর্মসংস্থানবান্ধব প্রকল্প গ্রহণ করা হবে: অর্থমন্ত্রী
অতিথি নিয়ে ব্যস্ত পরিবারের সদস্যরা, পুকুরে ডুবে প্রাণ গেলো শিশুর
মেগা প্রকল্পের বদলে জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার
তিনি বলেন, ‘এর সঙ্গে অনেক নারী জড়িত। স্বল্প পরিমাণে হলেও এই নারীদের আয়ের উৎস ছিল এটি। একই সঙ্গে আর্থিক সুবিধার সঙ্গে নারীদের সম্মানও অনেক বড় একটি বিষয়। যত্নকারীদের স্থানীয় লোকজন সম্মানের সঙ্গে দেখে। যারা কাজ করে তাদেরও তৃপ্তির একটি জায়গা হলো যে, সমাজের জন্য তারা কিছু একটা করতে পারছে।’
‘অভিভাবকরা আমাদের ফোন দেন। এত ভালো একটা জিনিস আপনারা দেখিয়ে আবার বন্ধ করে দিলেন। এটা কেমন হলো। আমাদের তো জবাব দেওয়ার কিছু নেই। যত্নকারীরাও ফোন দেন, আমাদের কাজ কেন বন্ধ। আমরাও বেকার হয়ে গেছি, আমাদের সময় কাটে না।’ বলেন তাহমিনা।
এই সুপারভাইজার বলেন, ‘প্রথমে শিশুদের দিতে অভিভাবকরা গড়িমসি করতেন। কিন্তু যখন লাভটা বুঝেছেন, তখন তাদের আগ্রটাই বেশি দেখেছি। সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, প্রকল্পটি আবার চালু হোক। এ প্রকল্পে অর্থ ব্যয় হবে সরকারের বড় বিনিয়োগ। এর বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে।’
মনোহরদীর ৫০০ কেন্দ্রের জন্য রয়েছেন দুজন শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশ (ইসিসিডি) কর্মকর্তা। ইসিসিডি কর্মকর্তা নাহিদ সুলতানা জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই অঞ্চলে আশপাশে জলাশয় আছে, টিউবয়েলের গর্ত আছে। বর্ষার দিকে জলাশয় অনেক বেড়ে যায়। এছাড়া বাড়িঘরের আশপাশে রাস্তা। এসব রাস্তায় সারাদিনই গাড়ি চলাচল করে। তাই শিশুরা ঝুঁকির মধ্যে থাকে। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই কেন্দ্রগুলো করা হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘বাসায় থাকলে শিশু মোবাইল নিয়ে সময় কাটাতো। তার বিকাশ বিঘ্নিত হতো। কিন্তু, আমাদের কেন্দ্রে এসে ওই শিশু শিখছে, অন্যদের সঙ্গে মিশছে। তার বন্ধু হচ্ছে, সে সমাজিকতা শিখছে। ঝুঁকিগুলো থেকে তো সে নিরাপদ থাকছেই।’
‘স্কুলগুলো আমাদের কেন্দ্রের শিশুগুলোর জন্য মুখিয়ে থাকে। কারণ তারা অন্যদের চেয়ে ভালো করে, তাদের জড়তা থাকে না। কারণ অনেক কিছুই শিখিয়ে দিচ্ছি। অভিভাবকরা প্রতিনিয়ত আমাদের কাছে জানতে চাইছেন- সেন্টার কবে খুলবে, বাচ্চা কবে দেবো।’ বলেন নাহিদ সুলতানা।
সীমাবদ্ধতায়ও কতটা অর্জন
পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু নিয়ে গবেষণা ও রোধে কাজ করছে বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)। একই সঙ্গে সংস্থাটি প্রকল্পের টেকনিক্যাল পার্টনার।
প্রতিদিন ডুবে ৩০ জনের মতো শিশুমৃত্যু (পাঁচ বছরের কম বয়সী) বিভিন্ন জরিপে প্রমাণিত জানিয়ে সিআইপিআরবি’র গবেষক মো. আল আমিন ভূইয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ বিষয়ে সরকার একটি পদক্ষেপ নিয়েছিল। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় শিশু একাডেমির মাধ্যমে আইসিবিসি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে। সরকারি কেনাকাটার প্রক্রিয়া দীর্ঘ, এগুলো করতে করতে বিলম্ব হয়ে যায়। সমন্বয়হীনতায়ও আমরা ভুগেছি প্রকল্পে। প্রকল্প বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়নি। প্রজেক্ট অফিসিয়ালি শুরু হয়েছে ২০২২ সালে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শুরু হয়েছে, আরও অনেক পরে।’
তিনি বলেন, ‘একটি শিশু ৮০ শতাংশের বেশি প্রটেক্টিভ যদি সে ৯টা থেকে ১টা পর্যন্ত যত্নকেন্দ্রে থাকে। আর যদি সাঁতার শেখে, ৯০ থেকে ৯৬ শতাংশের বেশি প্রটেক্টিভ। এ প্রকল্পের মাধ্যমে সেটি করারই চেষ্টা হয়েছে। প্রকল্পের অধীনে ৮ হাজারের বেশি সেন্টার করা হয়েছে। এটা একটা বড় ব্যাপার। গ্রামের নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। শিশুগুলোর বিকাশে সহায়তা হচ্ছে।’
প্রস্তাবিত দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে আল আমিন ভূইয়া বলেন, ‘এ ধরনের প্রকল্প সরকারের ম্যান্ডেটের সঙ্গেও যায়। তাই প্রকল্পটি অব্যাহত না থাকার কোনো কারণ নেই। আর এখানে এত বড় ম্যানপাওয়ারের একটা ব্যাপার, দ্বিতীয় ফেজে প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি চিন্তা করা হচ্ছে। তো সেটা যদি হয়, তাহলে সরকারের জন্য একটা সেলিং প্রোডাক্ট হতে পারে। রুরাল সেটিংসটাকে কীভাবে আপলিফট (উন্নত) করা যায় সেটাও আমরা চিন্তা করতে পারি এই মডেলের মাধ্যমে।’
‘ওয়ান হেলথ মডেল হিসেবে ওখানে শুধু শিশুরাই থাকবে না, অ্যাডোলেসেন্টদের ক্লাব হবে এবং ইয়াং অ্যাডাল্টসরা শুধু না, এল্ডারলি পিপলদেরও ক্লাব হবে। তারা বিকেলের পর, সন্ধ্যার পর আসবে, তাদের আপনার সোসালাইজেশন (সামাজিকীকরণ) করা। গ্রামের বৃদ্ধদেরও করার কিছু নেই, তাদের নিয়ে অনেক কিছু আছে করার।’ যোগ করেন আল আমিন ভূইয়া।
আগে যত্নকেন্দ্র ছিল ৮ হাজারের কিছু বেশি, নতুনভাবে যত্নকেন্দ্র হবে মোট ১৩ হাজার ৮৯০টি। দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পের আওতায় আসবে ১০ লাখ শিশু। এর মধ্যে সাঁতার শেখানো হবে ৬ লাখ শিশুকে (৫ বছরের বেশি থেকে ১০ বছর বয়সী)। আর বাকি ৪ লাখ শিশুকে (১ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত বয়সী) যত্নকেন্দ্রে শিক্ষা গ্রহণ করবে।
তিনি বলেন, ‘তো হোয়াই নট উই এক্সপ্লোর দোজ থিংস এবং ওই প্রজেক্টটাকে সামনে এগিয়ে নেওয়া এবং আরও আরও উইন্ডোকে নিয়ে আসা।’
আইসিবিসি প্রকল্পের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. তারিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেড় বছরে তো আর প্রকল্পের ইমপ্যাক্ট সেভাবে বোঝাও যাবে না। তবে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ব্র্যাক আইইডি (ইনস্টিটিউশন অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্ট) একটা মূল্যায়ন করেছিল। আমাদের প্রকল্পের ১ থেকে ৫ বছরের আর্লি লার্নিংয়ের যে কম্পোনেন্টটা, সেটার ইমপ্যাক্টটা মূল্যায়ন করেছে। সেখানে তারা পেয়েছে আমাদের নরমাল সিচুয়েশন যেরকম, এর থেকে ওদের (যত্নকেন্দ্রের শিশু) অ্যাচিভমেন্টটা ভালো।’
নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার একটি শিশুযত্ন কেন্দ্র/ছবি: জাগো নিউজ
তিনি বলেন, ‘তবে ড্রাউনিং প্রিভেনশনের ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি যে, আমরা যখন যে উপজেলায় কাজ করেছি, সেখানে এমন কোনো ডেথের খবর আমরা পাইনি, আমাদের এনজিওগুলো কোনো রেকর্ড করেনি। আমরা মনে করেন ১২টি উপজেলার মধ্যে ১০টিতে করেছি। এই ১০টিতে দেখা গেছে যে সচেতনতা বাড়ছে, এজন্য এই ঘটনাগুলো ঘটেনি।’
শিশু একাডেমির শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ (ইসিডি) বিষয়ক এ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘আর্লি লার্নিংয়ের (প্রারম্ভিক বিকাশ) ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, বাবা-মায়েরা প্যারেন্টিং সেশনে আসছেন, তারা উপকৃত হয়েছেন। মূল্যায়নে দেখা গেছে যে, ইমপ্যাক্টটা ভালো। কারণ বাচ্চাকে একটা সেন্টারে রেখে গিয়ে ওনারা গৃহস্থালির কাজটা খুব ভালোভাবে মানে তৃপ্তির সঙ্গে করতে পারেন, রান্না-বান্নাটাও করতে পারেন, টেনশন নেই। আবার এসে বাচ্চা নিয়ে যান। এই জিনিসগুলো তারা তাদের বিভিন্ন ফোরামে এটা বলছেন।’
যা বলছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়
পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুরোধে মন্ত্রণালয়ের গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমীন পারভীন বলেন, ‘পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুরোধে আমাদের একটি প্রকল্প এরই মধ্যে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই প্রকল্পের কার্যক্রমের ফলে দেশে শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। প্রকল্পের সমাপ্তি প্রতিবেদনটি বর্তমানে চূড়ান্তকরণের কাজ চলছে এবং এটি দ্রুতই মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে বলে প্রকল্প দপ্তর থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রকল্পের অর্জিত সাফল্য ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আমরা এরই মধ্যে এর দ্বিতীয় পর্যায় (দ্বিতীয় পর্যায়) গ্রহণের কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছি, যা আগের চেয়ে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর হবে।’
যা আছে প্রস্তাবিত দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পে
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং শিশু একাডেমি সূত্রে জানা গেছে, দ্বিতীয় পর্যায়ের আইসিসিবি প্রকল্পের মোট ব্যয় ৮৩৭ কোটি ৫৯ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। এর ৯০ শতাংশই দেবে বাংলাদেশ সরকার। বাকি ১০ শতাংশ অর্থ সহায়তা দেবে দাতারা।
প্রথম পর্যায়ে প্রকল্পভুক্ত জেলা ছিল ১৬টি, দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ১৪টি জেলাসহ ৩০টি জেলাতে বাস্তবায়ন হবে। আর আগে ৪৫টি উপজেলা ছিল, এখন ৭৯টি উপজেলাতে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
আগে যত্নকেন্দ্র ছিল ৮ হাজারের কিছু বেশি, নতুনভাবে যত্নকেন্দ্র হবে মোট ১৩ হাজার ৮৯০টি। দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পের আওতায় আসবে ১০ লাখ শিশু। এর মধ্যে সাঁতার শেখানো হবে ৬ লাখ শিশুকে (৫ বছরের বেশি থেকে ১০ বছর বয়সী)। আর বাকি ৪ লাখ শিশুকে (১ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত বয়সী) যত্নকেন্দ্রে শিক্ষা গ্রহণ করবে।
দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পে ৩৪ হাজার ৪৭০ জনের সরাসরি কর্মসংস্থান হবে। শিশু যত্নকারী থাকবেন ১৩ হাজার ৮৯০ জন, সহকারী যত্নকারী ১৩ হাজার ৮৯০ জন। এরা সবাই নারী। আর সাঁতার প্রশিক্ষক হবে ৫ হাজার ৮৩২ জন। এর অর্ধেক নারী, আর অর্ধেক পুরুষ। আর বাকিরা হবেন এনজিওদের বিভিন্ন স্টাফ যেমন প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেটর, এক্সিকিউটিভ অফিসার, সুপারভাইজার।
প্রকল্প প্রস্তাবটি শিশু একাডেমি থেকে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ে গেলে সচিবের নেতৃত্বে যাচাই-বাছাই মিটিং হয়। মিটিংয়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ঠিক-ঠাক করে প্রকল্পটি আবার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন মন্ত্রণালয় এটা অনুমোদন দিয়ে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাবে। সেখানে যাচাই-বাছাই শেষে এটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) একনেকে উঠবে।
আরএমএম/ইএ