আশুলিয়ায় বাবাকে বাস থেকে ফেলে মেয়েকে খুন পারিবারিক দ্বন্দ্বে

জসীম উদ্দীন
জসীম উদ্দীন জসীম উদ্দীন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:১৬ পিএম, ১৭ নভেম্বর ২০১৮

গত ৯ নভেম্বর আশুলিয়ায় চলন্ত বাস থেকে বাবাকে মারধর করে ফেলে দিয়ে মেয়েকে হত্যার ঘটনার নেপথ্যে পারিবারিক দ্বন্দ্ব খুঁজে পেয়েছে পুলিশ।

পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে মূলত জামাইয়ের পরিকল্পনায়ই সংঘটিত হয় এ হত্যাকাণ্ড।

৯ নভেম্বর রাত ১১টার দিকে বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কের মরাগাঙ এলাকা থেকে জরিনা বেগম (৪৫) নামে এক নারীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওইদিন সন্ধ্যার দিকে বাবা আকবর আলীর (৭০) সঙ্গে আশুলিয়ার জামগড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে টাঙ্গাইল যাওয়ার উদ্দেশে বাসে উঠেছিলেন জরিনা।

বাসচালক সেখান থেকে কিছুদূর যাওয়ার পর যাত্রী তোলার কথা বলে সাভারের হেমায়েতপুরের উদ্দেশে রওনা দেয়। এরপর আবার সেখান থেকে ফিরে আশুলিয়ার বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়ক হয়ে আব্দুল্লাহপুরের উদ্দেশে রওনা দেয়।

এভাবে ঘোরাঘুরি করতে থাকায় বাসচালক, হেলপার ও সুপারভাইজারের সঙ্গে জরিনা বেগম ও তার বাবার বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে বাসটি আশুলিয়া বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি গেলে বাসের শ্রমিকরা বৃদ্ধ আকবর আলীকে পিটিয়ে দেহ তল্লাশি করে সঙ্গে থাকা ৬০০ টাকা ছিনিয়ে নেয়। পরে তাকে আশুলিয়া ব্রিজের নিচে চলন্ত বাস থেকে ফেলে দেয়।

পরে আকবর আলীর কাছ থেকে ঘটনার বিষয়ে জানতে পেরে জরিনার সন্ধানে নেমে মরাগাঙ এলাকা থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

এ ঘটনায় মামলা হলে তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) হস্তান্তরের নির্দেশনা দেয় পুলিশ সদর দফতর। এরপর আজ (শনিবার) সকালে তিনজনকে গ্রেফতারের কথা জানায় পিবিআই।

যা জানাল পিবিআই
তিনজনকে গ্রেফতারের পর আজ দুপুরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সদর দফতরের কনফারেন্স রুমে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানায় পিবিআই।

মেয়ে-জামাইয়ের মধ্যে সাংসারিক কলহ হলেই ছুটে আসতেন শাশুড়ি জরিনা খাতুন। মেয়েকে নির্যাতন করায় জামাইকে শাসাতেন তিনি। শাসাতেন বেয়াইনকেও (মেয়ের শাশুড়িকেও)। এ নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল জামাই মো. নূর ইসলামের।

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কের অবনতির জন্য শাশুড়িকেই দায়ী করতেন তিনি। কিন্তু কিছু বলতে পারতেন না। নিজেদের সাংসারিক বিষয়ে নাক গলানোয় শাশুড়িকে সরানোর জন্য জামাই নূর ইসলাম অভিনব পরিকল্পনা করেন।

নূর ইসলামের মামা স্বপনের পরামর্শে শাশুড়িকে বাস থেকে ফেলে হত্যার জন্য ১০ হাজার টাকায় একটি বাসের চালক, হেলপার ও দু’জনকে ভাড়া করা হয়। পরিকল্পনামাফিক গত ৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় বাসে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর জরিনা বেগমের লাশ সড়কে ফেলে পালিয়ে যায় ভাড়াটে খুনিরা।

পরে রাত ১১টার দিকে বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কের মরাগাঙ এলাকা থেকে ওই নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

ঘটনার পর বোঝার উপায়ই ছিল না হত্যার পরিকল্পনায় কে জড়িত। স্বপনকে আটক করার পর পুলিশ জানতে পারে ঘটনার নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছেন খোদ জামাতা নূর ইসলাম।

নিহত জরিনার জামাতা নুর ইসলাম (২৯), তার মা আমেনা বেগম (৪৮) ও জামাতার মামা স্বপনকে গ্রেফতারের পর এসব তথ্য জানিয়েছে পিবিআই।

ধানমন্ডিতে পিবিআই সদর দফতরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, পাঁচ বছর আগে ঢাকার আশুলিয়ার মতিয়ার রহমানের ছেলের সাথে বিয়ে হয় সিরাজগঞ্জের চৌহালী থানার খাসকাওলী গ্রামের জরিনা খাতুনের মেয়ে মোছা. রোজিনার। বিয়ের ঘটকালি করেন ছেলের মামা স্বপন।

বিয়ের পর প্রায়ই পারিবারিক কলহ লেগে থাকতো। মারধরও করা হতো রোজিনাকে। একপর্যায়ে সম্পর্কে চরম অবনতি ঘটে। ঘটনার খবর পেলেই ছুটে আসতেন মা জরিনা খাতুন।

তিনি এসে জামাই, মেয়ের শাশুড়ি ও বিয়ের ঘটক স্বপনকে শাসাতেন, যা মেনে নিতে পারত না নূরের ইসলামের পরিবার। ওই ক্ষোভ থেকেই পরিকল্পনা করে খুন করা হয় জরিনা বেগমকে।

তিনি বলেন, পরিকল্পনা এমনভাবে করা হয় যেন কেউ বুঝতে না পারে। পরিকল্পনা করা হয়, বাস থেকে ফেলে হত্যা করা হবে। সঙ্গে আসা জরিনার বৃদ্ধ বাবাকে মারধর করা হবে। যাতে তিনি ডাকাতি কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ঘটনা ঘটেছে বলেন।

ঘটনার বিবরণ দিয়ে ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ৯ নভেম্বর মেয়ে জামাইয়ের বাড়ি থেকে ঘুরে আশুলিয়ায় টাঙ্গাইলগামী একটি মিনিবাসে ওঠেন জরিনা (ঢাকা-মেট্রো-জ-১১-১৭৯২)। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ওই বাসটি আগে থেকেই আশুলিয়ার শিমুলতলা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। স্বপন গিয়ে নিজে জরিনা বেগমকে বাসে উঠিয়ে দিয়ে আসেন।

পূর্বপরিকল্পনা মাফিক বাসচালক, হেলপার ও আরও দুজন জরিনার বাবা আকবর আলী মণ্ডলকে মারধর করে মরাগাঙ এলাকায় বাস থেকে ফেলে দেয়। আকবর আলী পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনকে জানানোর পর পুলিশকেও খবর দেয়। পরে আশুলিয়া ব্রিজের ৫০০ গজ দূরে মরাগাঙ এলাকায় জরিনার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর জামাতা নুর ইসলাম নিজে বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলা নং ৩৫।

নিহতের বাবা আকবর আলী জানান, স্বপন তাদের বাসে উঠিয়েছিল। কিন্তু পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে স্বপন তা অস্বীকার করায় সন্দেহ হয় তদন্ত সংশ্লিষ্টদের। ওই ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে স্বপনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পিবিআই। এরপরই পুরো পরিকল্পনার বিষয়টি স্বীকার করেন তিনি। এরপর গতকাল নূর ইসলাম ও তার মা আমেনা বেগমকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

বনজ কুমার মজুমদার বলেন, গ্রেফতারদের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হবে। নিহতের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে কীভাবে মৃত্যু তা নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে প্রাথমিকভাবে শ্বাসরোধে হত্যার বিষয়টি উঠে এসেছে। ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত বাসের চালক, হেলপার ও দু’জনকে গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।

জেইউ/এনএফ/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :