হই হুল্লোড়ে শুরু কান্নায় শেষ

জসীম উদ্দীন
জসীম উদ্দীন জসীম উদ্দীন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৪৪ পিএম, ১৩ জানুয়ারি ২০১৯

ইংরেজি মাধ্যম স্কুল স্কলাসটিকা থেকে সদ্যই এ লেভেল পাস করা মিশাল হোসেন অভিকে (২০) নিয়ে ছিল পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের বড় স্বপ্ন। বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান অভি, এ লেভেল সফলতার সাথে শেষ করে সে আশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তবে ডানপিটে অভিকে নজরে রাখা ছিল দায়। গেট টুগেদার, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে হই হুল্লোড় আর মজা-মাস্তিতে সবার আগে অভি। কিন্তু মৃত্যুর মিছিলেও যে সবার আগে থাকবে তা ছিল সবার অজ্ঞাত।

রোববার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মোহাম্মদপুরে বান্ধবীর বাসার ছাদে আয়োজিত এক গেট টুগেদার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যায় অভি। তখন মিরপুর ডিওএইচএসর বাসায় বাবা-মা ঘুমিয়ে। ঘুম থেকে ওঠার কিছুক্ষণ পরই বাবা-মায়ের কানে যায় একমাত্র ছেলের মৃত্যুর খবর। অনেকটা ডানাভাঙা পাখির মতো বাবা-মা ছুটে আসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে।

মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ২২/সি নং ময়ূরভিলা নামক নয়তলা ভবনে বান্ধবী সারাহর বাসা। রোববার সকালে ওই ভবনের ছাদে একটি গেট টুগেদার অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল সারাহ সেখানে ৫/৬ জন বন্ধুর মতো এসেছিল অভিও।

কিন্তু বেলা পৌনে ১১টার দিকে ময়ূরভিলা নামক ওই নয়তলা ভবনের ছাদ থেকে রহস্যজনকভাবে পড়ে যায় অভি।সেখান থেকে স্থানীয় সিটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এরপর পুলিশ মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।

ovi-(2)

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিহত অভির বাবা সাইফুর রহমান একজন ব্যবসায়ী এবং মা মোনা রহমান গৃহিণী।

দুপুর ১টার দিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ময়ূরভিলা নামক নয়তলা ভবনটির পেছনে একটি মোটা গলিপথ। গলিপথের মুখেই ডাচ বাংলা এজেন্ট ব্যাংকিং দোকান। সেই দোকানটির নিচেই ঘিরে মানুষের জটলা। উপর থেকে ওই স্থানেই পড়ে গিয়েছিল অভি। ঘটনাস্থলে ভাঙা হাড়ের টুকরা, ছোপ ছোপ রক্তের দাগ তখনও স্পষ্ট।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও ডাচ বাংলা এজেন্ট ব্যাংকিং দোকানটির মালিক ইয়াছির জাগো নিউজকে বলেন, সকাল ৯টায় দোকান খুলে ব্যবসায় মন দিয়েছি। সকাল সাড়ে ১০টার কিছুক্ষণ পরই ধপাস করে উপর থেকে কিছু একটা পড়ার শব্দ হলো। প্রথমে মনে হলো ময়লার ব্যাগ হয়তো পড়েছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই গোঙানি শব্দ আর মানুষের ছুটোছুটি। দোকান থেকেই বেরিয়ে দেখি একজন কাতরাচ্ছেন। কাছে গিয়ে দেখি কোমড়ের নিচের অংশ ভেঙেচুরে একাকার। মিনিট খানেক পরই নিঃস্তব্ধ হয়ে যায় যুবকটি। এরপর একটি মেয়ে ও ক’জন যুবক এসে নিয়ে যায় ছেলেটিকে। ঘটনার আধা ঘণ্টা পর আসে পুলিশ।

ঘটনাস্থল থেকে থানায় গিয়ে জানা যায়, অভির মৃত্যুর ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য মোট ৫ জনকে থানা হেফাজতে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ওই ভবনের বাসিন্দা বান্ধবী সারাহ ও তার ভাইও রয়েছে।

ovi-(2)

ঘটনার তদন্ত সংশ্লিষ্ট মোহাম্মদপুর থানার এক উপ-পরিদর্শক জাগো নিউজকে বলেন, ওই বাসার একটি ফ্ল্যাটে তাদের বান্ধবী সারাহ সপরিবারের বসবাস করে। পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিসহ ৫ জন সারাহর বাসায় আসেন। তারা ছাদে সাউন্ড সিস্টেম বাজিয়ে হই হুল্লোড় করছিল। এর মধ্যেই ছাদ থেকে পড়ে যায় অভি।

ছাদে ৬ জনের মধ্যে সারাহ ও আরেকটি মেয়ে উপস্থিত ছিল। অভি ও সারাহ বাদে বাকি ৪ জন ‘ক্লাউড এক্সেস’ নামে আমেরিকান একটি কল সেন্টার কোম্পানিতে চাকরি করে। ওই চারজনের রাতে ডিউটি ছিল, তারা ডিউটি শেষ করে অভিসহ এক হয়ে সারাহর বাসায় আসে।

এ ব্যাপারে মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) মৃত্যুঞ্জয় দে সজল জাগো নিউজকে বলেন, ঘটনার সময় উপস্থিত বাকি পাঁচ বন্ধুকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে কিছু তথ্য আমরা পেয়েছি। তদন্ত চলছে। এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।

মোহাম্মদপুর থানার ওসি (তদন্ত) আবুল কালাম আজাদ জাগো নিউজকে বলেন, ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা দেখা গেছে যে, সকালে ৫ বন্ধু আসার পর সারাহ বাসার নিচে গেটে গিয়ে তাদের সবাইকে রিসিভ করে। এরপর তাদেরকে উপরে নিয়ে যায়।

অবচেতনে পড়ে মৃত্যু, আত্মহত্যা নাকি হত্যার উদ্দেশ্যে কেউ সুকৌশলে ফেলে দিয়েছে তা জানতে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ovi-(2)

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওই ভবনের ছাদের রেলিং খুবই নিচু। তাদের মধ্যে প্রেমজনিত কোনো দ্বন্দ্ব ছিল কি না, নিজের সাহস দেখাতে সে রেলিংয়ে হাঁটছিল কি-না অর্থাৎ এটা দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকাণ্ড সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাৎক্ষণিক সময়ে কিংবা আগে তারা নেশা করেছিল কি না তা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।

মরদেহের সুরতহাল করা মোহাম্মদপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মুকুল দে জানান, উপর থেকে পড়ে যাওয়ায় তার ভেতরে ব্লিডিং হয়েছে। কোমর থেকে নিচের অংশের হাড় ভেঙে বেরিয়ে গেছে। তবে শরীরের উপরের অংশে কোনো আঘাত দেখা যায়নি। সে মাদকাসক্ত ছিল কি না বা কোথায় কোথায় আঘাত পেয়েছে, ময়নাতদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ বিষয়ে এখনো মামলা দায়ের করা হয়নি তবে একটি ইউডি (আন ন্যাচারাল ডেইথ) মামলার প্রস্তুতি চলছে।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গের সামনে অভির মামা রোহান জাগো নিউজকে বলেন, সকাল ৮টার দিকে অভি বাসা থেকে বের হয়ে যায়। এরপর থানা থেকে দুর্ঘটনার খবর দিলে আমরা হাসপাতালে আসি। এর বাইরে কোনো কারণ আমাদের জানা নেই। অভির খানিকটা উচ্চতা ভীতি ছিল, তবে ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। অভি মাদকাসক্ত ছিল না, জানামতে তার বন্ধুদের মধ্যে বা পারিবারিক অন্য কোনো সমস্যা ছিল না বলেও জানান রোহান।

জেইউ/এসএইচএস/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :