‘আল্লাহ ওসি স্যারকে বাঁচায় রাখুক’

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৩৬ পিএম, ১১ মে ২০২১ | আপডেট: ১০:০৮ পিএম, ১১ মে ২০২১

ঘড়ির কাটায় তখন রাত আড়াইটা। কেউবা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, কেউবা নিচ্ছেন সেহরির প্রস্তুতি। এমন সময় শ্বাসকষ্ট শুরু হলো চট্টগ্রামের আনোয়ারার বাসিন্দা ৮৩ বছর বয়সী বৃদ্ধ মফিজুর রহমানের। এত রাতে আনোয়ারার কোথাও অক্সিজেন পাচ্ছিলেন না বৃদ্ধের ছেলে। হঠাৎ তার ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসিনের ফেসবুক আইডির একটি ভিডিওর কথা মনে হয়। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল দিয়ে ওসির নম্বর নিয়ে ফোন দেন। ওসিও তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা করেন অক্সিজেনের। সুদূর শহরের ডবলমুরিং থানা থেকে অক্সিজেন নিয়ে গিয়ে বাঁচান বিছানায় ছটফট করতে থাকা বাবাকে। প্রতিক্রিয়ায় ধন্যবাদ দিয়ে বলেন, ‘আল্লাহ ওসি স্যারকে বাঁচিয়ে রাখুক।’

জানা গেছে, বৃদ্ধের ছেলে মো. জিয়াউল হাসান চট্টগ্রাম শহরের একটি দোকানে চাকরি করেন। থাকেন ডবলমুরিং এলাকার একটি ভাড়া বাসায়। কিছুদিন আগেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে জেনেছেন ডবলমুরিং থানা থেকে অক্সিজেন দেয়া হয়। কিন্তু এটা তো ডবলমুরিং থানার বাসিন্দাদের জন্য। তারপরও বৃদ্ধের ছেলে তার বাবাকে বাঁচাতে ফোন দিতে মোবাইল বের করেন। ডবলমুরিং থানার কারও নম্বর না থাকায় ফোন দেন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ। সেখান থেকে থানার ওসির নম্বর দেয়া হয়।

নম্বর পেয়ে মধ্যরাতে কাঁপা কাঁপা গলায় ফোন করেন ওসি মোহাম্মদ মহসিনকে। বলেন, ‘স্যার আমার বাবার অবস্থা খুবই খারাপ। এখনই অক্সিজেন প্রয়োজন।’ কথা বিশ্বাস করাতে প্রেসক্রিপশনও পাঠান ইনবক্সে।

oc-2

ফোনের অপরপ্রান্ত ওসি বলেন, ‘আপনার বাবা যে এলাকার বাসিন্দা হোক, এটা বিষয় না। আপনি থানায় গিয়ে আমার কথা বলে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে যান।’

সোমবার (১০ মে) মধ্যরাতের এ ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে বৃদ্ধের ছেলে মো. জিয়াউল হাসান জাগো নিউজকে বলেন, গতকাল মধ্যরাতে আমার বাবার হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। এত রাতে আমি কোথাও অক্সিজেন পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ মনে হলো ওসি মহসিন স্যারের বিনামূল্যে অক্সিজেন প্রদানের একটা ভিডিওর কথা। কিন্তু আমার কাছে তার মোবাইল নম্বর ছিল না। তাই ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে তার নম্বর নেই। ফোন দিলেই সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলেন, থানা থেকে অক্সিজেন নিয়ে যান। এরপর আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই অক্সিজেন নিয়ে আমার বাবাকে দেই। এতেই তিনি খানিকটা স্বস্তি ফিরে পান।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, ‘ওসি স্যার অক্সিজেন না দিলে হয়তো আমার বাবার কোনো অঘটন ঘটতো। মহসিন স্যার অনেক ভালো মানুষ। আল্লাহ তার মতো মানুষকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখুক। আমি তার কর্মকাণ্ড নিয়মিত ফেসবুকে দেখি। তার কর্মকাণ্ড আমার খুব ভালো লাগে। তার বেশকিছু কর্মকাণ্ড নিজেই অনুসরণ করার চেষ্টা করি। আমার বন্ধুদেরকে স্যারের মানবিকতার কথা বলি। ইনশাআল্লাহ সামনে সুযোগ হলে মানবিক কাজে স্যারের সঙ্গে অংশ নেব।’

জানা গেছে, ফেসবুকে ওসি মহসিনকে ফলো করেন ৬ লাখ ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষ। সেখানে পুলিশি কর্মকাণ্ড তুলে ধরার পাশাপাশি নিয়মিত প্রচার করেন বিভিন্ন সচেতনতামূলক বিষয়। তিনি চট্টগ্রাম নগরের ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হলেও ফেসবুকের পরিচয়ে দূর-দূরান্ত থেকে তাকে নানা সমস্যা নিয়ে মানুষ ফোন দেন। সমাধানের চেষ্টাও করেন নিজের সাধ্যমতো।

oc-2

দেশজুড়ে আলোচিত এই পুলিশ কর্মকর্তা এবছর রমজানের শুরুতে চালু করেছেন একটি বিনামূল্যে ইফতার ও সেহরির দোকান। থানার কর্মকর্তাদের উদ্যোগে গড়ে তোলা এই দোকানে প্রতিদিন বিনামূল্যে ইফতার ও সেহরি করেন কয়েক হাজার মানুষ। পুরো রমজানজুড়ে পুলিশের এই দোকান থেকে উপকৃত হয়েছেন নিম্নআয়ের অনেক মানুষ।

আবার তার উদ্যোগে ‘হ্যালো ওসি’ নামে একটি কর্মসূচি প্রশংসিত হয়েছে স্বয়ং পুলিশ বিভাগেই। পরবর্তীতে তার উদ্ভাবিত এই পুলিশি সেবা নগরের সবকটি থানায় তো বটেই, দেশের বিভিন্ন থানাই চালু হয়েছে। সেই কর্মসূচির মাধ্যমে থানার ওসি হাজির হন বিভিন্ন এলাকায়। সেখানে সাধারণ মানুষ সরাসরি ওসির সঙ্গে কথা বলে বিভিন্ন সমস্যা হবে সমাধান করতে পারেন।

এ ছাড়া গত বছর করোনার সময়ে কোতোয়ালি থানায় দায়িত্ব পালনকালে নানামুখী মানবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে প্রশংসিত হয়েছেন ওসি মহসিন। গানে গানে মানুষকে সচেতনতার পাশাপাশি ওষুধ নিয়ে ছুটে গেছেন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। আবার বাজার করতে মানুষের যাতে বের হতে না হয়, সেজন্য পুলিশের গাড়িতে করে বাজার নিয়ে পৌঁছে দিয়েছেন মানুষের ঘরে ঘরে।

জানতে চাইলে ওসি মোহাম্মদ মহসিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘গতকাল দিবাগত রাতে আমি সেহরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় এক যুবক ফোন করে বললেন, তার বাবার জরুরি অক্সিজেন লাগবে। তাদের বাড়ি আনোয়ারা, সেখানে রাতে কোথাও অক্সিজেন পাচ্ছেন না। এরপর আমি তাকে থানায় এসে নিয়ে যেতে বলি। পাশাপাশি দোয়া করেছি, বাবার জন্য সন্তানের এই চেষ্টা আল্লাহ যেন কবুল করেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের কাছে থেকে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, আমাদের সামান্য প্রচেষ্টায় অনেকের বড় উপকার হয়। তাই আমি এ কাজকে নেশা হিসেবে নিয়েছি। আমার নিজের অবস্থান থেকে যতটুকু সম্ভব মানুষকে সেবা দেয়ার চেষ্টা করি।’

মিজানুর রহমান/ইএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]