সিনহা হত্যা: ৭ দিনে ৬ সাক্ষীর জবানবন্দি-জেরা সম্পন্ন

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
প্রকাশিত: ০৫:৩৩ পিএম, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত মেজর (অব.) সিনহা হত্যা মামলার আনুষ্ঠানিক বিচারকার্যের তৃতীয় দফা সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য হয়েছে আগামী ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর। বুধবার (৮ সেপ্টেম্বর) দ্বিতীয় দফা সাক্ষ্যগ্রহণের শেষ দিনে ঘটনাস্থলের পাশের মসজিদের ইমাম শহিদুল ইসলামের সাক্ষ্য ও জেরা শেষে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মো. ইসমাইল এ আদেশ দেন। এ নিয়ে দ্বিতীয় দফা সাক্ষ্যগ্রহণের সাত দিনে ছয় জনের সাক্ষ্য ও জেরা সম্পন্ন হয়েছে।

বুধবার কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম এ তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, দ্বিতীয় দফার শেষ দিন বুধবার ১০টায় আদালতের কার্যক্রম শুরুর পর শহিদুল ইসলামের জবানবন্দি শেষে জেরার মাধ্যমে দ্বিতীয় দফার টানা চারদিনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। অন্য ৬ দিনের সাক্ষ্য ও জেরা শেষ হতে সন্ধ্যা হলেও ষষ্ঠ সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জেরা কার্যক্রম দুপুর আড়াইটায় শেষ হয়। পরে আদালত এ দিনের মতো মুলতবি ঘোষণা করে পরবর্তী দিন ধার্য করেন বিচারক। মামলার তৃতীয় দফা সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ২০-২২ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করা হয়েছে।

আদালত সূত্র জানায়, অন্য দিনের মতো বুধবারও সকাল পৌনে ১০টার দিকে মামলার আসামি সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ, পরিদর্শক লিয়াকতসহ ১৫ আসামিকে কারাগার হতে আদালতে আনা হয়। দ্বিতীয় দফার চতুর্থ দিনের জন্য ইমাম শহিদুল ইসলামের সাক্ষ্যের হাজিরা দেওয়া হয়। প্রথম দিন ছয় জনের এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে তিন জনের হাজিরা দেওয়া হলেও মাত্র একজন করেই সাক্ষ্য ও জেরা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। শেষদিন হিসেবে বুধবার একজনের হাজিরা দেওয়া হয়। কিন্তু দুপুর আড়াইটার দিকে ষষ্ঠ সাক্ষীর জেরা সম্পন্ন হওয়ায় বাকি দুই সাক্ষীকে আদালতে হাজির করেন সরকারি কৌঁসুলি। কিন্তু বিচারক আদালত মুলতবি ঘোষণা করায় এ দিন আর সাক্ষ্য নেওয়া হয়নি।

পিপি অ্যাডভোকেট ফরিদুল বলেন, আমাদের চেষ্টা সব সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জেরা দ্রুত সম্পন্ন করার। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের অসহযোগিতায় সেটি সম্ভব হয় না। তারা সাক্ষীকে অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করে সময় নষ্ট করেন। আর ১৫ আসামির ১৫ আইনজীবী আলাদাভাবে আধঘণ্টা করে জেরার সময় নিলে সাড়ে সাত ঘণ্টা সময় লাগে। জবানবন্দি নিতেও সময় লাগে ঘণ্টা দেড়েক। এতে আদালতের কর্মঘণ্টা নয় ঘণ্টা এবং মধ্যাহ্ন বিরতিসহ দাঁড়ায় ১০ ঘণ্টা। ফলে একজনের বেশি সাক্ষ্য নেওয়া সম্ভব হয়ে উঠছে না। কিন্তু বিচারকার্যের সপ্তম দিনে স্বল্প সময়ে জবানবন্দি ও জেরা শেষ হওয়ায় আগামী ধার্য দিনেও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালতকে এভাবে সহযোগিতা করবেন বলে আমার বিশ্বাস।

jagonews24

আদালতের সংশ্লিষ্ট আইনজীবী বাপ্পী শর্মা জানান, গত ২৩ আগস্ট শুরু হয় মেজর সিনহা হত্যা মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার কার্যক্রম। সাক্ষ্যগ্রহণে আদালতের নির্ধারণ করা প্রথম তিনদিনের প্রথম দিন পুরো ও দ্বিতীয় দিনের অর্ধেক সময় মামলার বাদী নিহত সিনহার বড় বোন শারমিন ফেরদৌসের সাক্ষ্য ও জেরা হয়। পরে শুরু হয় সিনহার সফরসঙ্গী ও হত্যার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী সিফাতের সাক্ষ্য। এ দু্ইজনের সাক্ষ্য ও জেরার মধ্য দিয়ে শেষ হয় বিচারকার্যের প্রথম নির্ধারিত তিন দিন। ফলে এ তিনদিনের জন্য নোটিশ পাওয়া ১৫ সাক্ষীর মধ্যে বাকি ১৩ জনের সাক্ষ্য নেয়া সম্ভব হয়নি। ২৫ আগস্ট আদালত ৫ থেকে ৮ সেপ্টম্বর টানা চারদিন পরবর্তী সাক্ষ্যের জন্য দিন ধার্য করেন। সেই হিসেবে রোববার (৫ সেপ্টেম্বর) সকাল সোয়া ১০টার দিকে বাকি সাক্ষীদের একজনের সাক্ষ্য শুরু হয়ে সারাদিন তাকেই জেরায় দিন শেষ হয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনও একই ভাবে একজন সাক্ষীর জবানবন্দি ও জেরা হয়েছে। শেষদিনও একই ভাবে একজনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। এতে সাত দিনে সাক্ষ্য নেওয়া গেছে মাত্র ৬ জনের। মামলায় মোট সাক্ষী ৮৩ জন। সাক্ষ্য ও জেরার সময় ১৫ আসামি কাঠগড়ায় উপস্থিত রাখায় পুরো জেলা জজ আদালত এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।

উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান। তার সঙ্গে থাকা সাহেদুল ইসলাম সিফাতকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এরপর সিনহা যেখানে ছিলেন, সেই নীলিমা রিসোর্টে ঢুকে তার ভিডিও দলের দুই সদস্য শিপ্রা দেবনাথ ও তাহসিন রিফাত নুরকে আটক করে। পরে তাহসিনকে ছেড়ে দিলেও শিপ্রা ও সিফাতকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। এই দুইজন পরে জামিনে মুক্তি পান।

সিনহা হত্যার ঘটনায় মোট চারটি মামলা হয়। ঘটনার পরপরই পুলিশ বাদী হয়ে তিনটি মামলা করে। এর মধ্যে দুইটি মামলা হয় টেকনাফ থানায়, একটি রামু থানায়। ঘটনার পাঁচ দিন পর ৫ আগস্ট কক্সবাজার আদালতে টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ৯ পুলিশের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। চারটি মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় র‌্যাব।

২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও র‌্যাব-১৫ কক্সবাজারের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. খায়রুল ইসলাম।

অভিযুক্ত আসামিদের মধ্যে পুলিশের ৯ সদস্যরা হলেন- বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, পরিদর্শক লিয়াকত আলী, কনস্টেল রুবেল শর্মা, এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুল করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, এএসআই লিটন মিয়া ও কনস্টেবল সাগর দেব নাথ।

অন্য আসামিরা হলেন- আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) সদস্য এসআই মো. শাহজাহান, কনস্টেবল মো. রাজিব ও মো. আব্দুল্লাহ এবং টেকনাফের বাহারছড়ার মারিষবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও পুলিশের করা মামলার সাক্ষী নুুরল আমিন, মো. নিজাম উদ্দিন ও আয়াজ উদ্দিন। আসামিদের ১২ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে ওসি প্রদীপ, কনস্টেবল রুবেল শর্মা ও সাগর দেব আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি। এর আগে আসামিদের তিন দফায় ১২ থেকে ১৫ দিন রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল।

সায়ীদ আলমগীর/ইউএইচ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]