মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সেনা সদরদপ্তর

আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ পরিচালনার সাক্ষী তেলিয়াপাড়া চা বাগান

রাসেল মাহমুদ
রাসেল মাহমুদ রাসেল মাহমুদ , নিজস্ব প্রতিবেদক হবিগঞ্জ থেকে ফিরে
প্রকাশিত: ১০:৩৮ এএম, ০৩ অক্টোবর ২০২২

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ঘুমন্ত বাঙালির ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার সেই ঐতিহাসিক ঘোষণার পর শুরু হয় বাঙালির স্বাধিকার আদায়ের লড়াই তথা মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর কয়েক দিন পার হলেও যুদ্ধ পরিচালনার কোনো নকশা বা কৌশল তখনো গ্রহণ করা হয়নি।

এর এক সপ্তাহ পর ৪ এপ্রিল হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ব্যবস্থাপকের বাংলোয় বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের রণকৌশল নির্ধারণে প্রথম বৈঠকে বসেন তৎকালীন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সেই বৈঠকে অংশ নেন প্রধান সেনাপতি ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী ও সহ-সর্বাধিনায়ক এম এ রব। ওই বৈঠকেই এম এ জি ওসমানীকে সর্বাধিনায়ক মনোনীত করা হয়। প্রণয়ন করা হয় স্বাধীনতাযুদ্ধের নকশা বা রণনীতি। সেখানেই মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হিসেবে শপথ নেন এম. এ. জি ওসমানী। যুদ্ধ পরিচালনার আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও দেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সেনা সদরদপ্তর হিসেবে পরিচিত সেই স্মৃতিসৌধটি স্বাধীনতার ৫০ বছর পর আজও বাঙালির মুক্তির ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা যায়, তেলিয়াপাড়া চা বাগানে স্বাধীনতাযুদ্ধের নকশা প্রণয়নে সঠিক কৌশলে যুদ্ধ পরিচালনা এবং যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার শপথ পাঠের জন্য বৈঠকে বসেন তৎকালীন মেজর সি আর দত্ত, মেজর জিয়াউর রহমান, কর্নেল এম এ রব, ক্যাপ্টেন নাসিম, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর কে এম সফিউল্লাহ, মেজর কাজী নূরুজ্জামান, মেজর শাফায়াত জামিলসহ সেনা ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ঊর্ধ্বতন ২৭ জন কর্মকর্তা। ওই বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক আতাউল গণি ওসমানী ভারতের আগরতলা থেকে এসে যোগ দেন। ছিলেন সহ-সর্বাধিনায়ক এম এ রবও।

আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ পরিচালনার সাক্ষী তেলিয়াপাড়া চা বাগান

বৈঠকে পুরো দেশকে চারটি সামরিক অঞ্চলে বিভক্ত করা, সেক্টর কমান্ডার নির্বাচন, এস কে ও জেড ফোর্স গঠনসহ বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ব্যবস্থাপকের বাংলোটি ২ ও ৪ নম্বর সেক্টর কার্যালয় হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। দুর্গম স্থানের সেই বাংলোয় বৈঠক শেষে এম. এ. জি ওসমানী নিজের পিস্তলের ফাঁকা গুলি ছুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ পরিচালনার ঘোষণা দেন। তবে এ বাংলোয় পরিচালিত সেক্টর কার্যালয়টি যুদ্ধ শুরুর মাত্র আড়াই মাস পরই পাকিস্তান সামরিক জান্তার প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে সরিয়ে নেওয়া হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালনার জন্য স্মৃতিবিজড়িত প্রথম বৈঠক স্মরণ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে সেই বাংলোর পেছনেই নির্মাণ করা হয়েছে একটি স্মৃতিসৌধ। ছোট্ট পাহাড়ের ওপর বুক টান করে দাঁড়িয়ে থাকা এ সৌধটি বুলেট আকৃতিতে নির্মিত। সৌধের সামনে দুটি ফলকে আঁকা রয়েছে শামসুর রাহমানের বিখ্যাত ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতা। মূল স্মৃতিসৌধের পাশে রয়েছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামফলক। এছাড়া স্মৃতিসৌধের সামনে একটি লেক। লাল শাপলা ফোটা এ লেকটি বর্ষাঋতুতে হয়ে ওঠে আকর্ষণীয়। লেকের ধারেই স্মৃতিসৌধ পরিদর্শনে আসা দর্শনার্থীদের বসার জন্য রয়েছে কংক্রিটের তৈরি গোলটেবিল ও বেঞ্চ। এ অঞ্চলে চা বাগানের সবুজঘেরা স্মৃতিসৌধটি দর্শনার্থীদের কাছে বরাবরই আগ্রহ ও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। আশপাশের নয়নাভিরাম চা বাগান ও পাহাড়সদৃশ ছোট ছোট টিলা পুরো এলাকায় যেন অকৃত্রিম সৌন্দর্য বিলিয়ে যাচ্ছে।

আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ পরিচালনার সাক্ষী তেলিয়াপাড়া চা বাগান

সাধারণ দিনে ঐতিহাসিক এ স্থানটিতে দর্শনার্থীদের ভিড় থাকলেও বৃষ্টির সময় তা একেবারেই হাতেগোনা। বৃষ্টির দিনে চারপাশের পরিবেশ যেমন শান্ত, স্নিগ্ধ থাকে মানুষের কোলাহলও থাকে কম।

জন্মভিটা হবিগঞ্জ হলেও চাকরির সুবাদে ঢাকায় থাকেন দীপক। নিজ এলাকায় হলেও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এ সৌধে আগে কখনো আসা হয়নি তার। এবার তিনি সেখানে এসেছেন স্ত্রী ও পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে।

ঐতিহাসিক এ স্থানে আসার পর নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে দীপক জাগো নিউজকে বলেন, শুনেছি মুক্তিযুদ্ধের সময় এখানে বসে যুদ্ধের পরিকল্পনা হয়েছিল। আগে কখনো সময় করে আসা হয়নি। এবার ছুটিতে বাড়ি এসেই সবাইকে নিয়ে ঘুরতে এলাম। বৃষ্টির দিন, তাই লোকজনও কম। স্বাধীনতার ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা এ স্থানে এসে খুব ভালো লাগছে।

রঞ্জন পাল নামের আরেক দর্শনার্থী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় এ স্থানেই প্রথম যুদ্ধ পরিচালনার বৈঠক হয়েছিল। স্মৃতিস্তম্ভের সামনে বেশ সুন্দর পরিবেশ। খুব ভালো লাগছে।

আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ পরিচালনার সাক্ষী তেলিয়াপাড়া চা বাগান

১৯৭৫ সালের জুনে স্মৃতিসৌধটি উদ্বোধন করা হয়। সাবেক সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কে এম সফিউল্লাহ সৌধটির উদ্বোধন করেন। এ সৌধ ঘিরে প্রতি বছর ৪ এপ্রিল দিনটিকে ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

স্মৃতিসৌধের তত্ত্বাবধানকারী ও তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ব্যবস্থাপক দীপেন সিংহ জাগো নিউজকে বলেন, দর্শনার্থীদের জন্য জায়গাটি উন্মুক্ত থাকে। ঐতিহাসিক এ স্থানে বছরজুড়ে তেমন কোনো আয়োজন না থাকলেও প্রতি বছর ৪ এপ্রিল ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া দিবস ঘিরে কিছু আয়োজন থাকে।

আরএসএম/এমকেআর/এসএইচএস/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।