কুমিল্লা-নোয়াখালী চার লেন
ধুলা-কাদায় নাকাল মাইজদীবাসী, বিপাকে ব্যবসায়ীরা
কুমিল্লা-নোয়াখালী চার লেন আঞ্চলিক মহাসড়কের মাইজদী অংশের কাজের ধীরগতিতে চরম ভোগান্তিতে এলাকাবাসী। বর্ষায় খানা-খন্দ কাদা আর শীত মৌসুম আসতে না আসতেই ধুলাবালিতে বিপর্যস্ত জনজীবন। চলাচলে অসুবিধার পাশাপাশি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা-বাণিজ্য। প্রকল্পের কাজ ২০২০ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মেয়াদ বাড়িয়ে জুন ২০২২ করা হয়। সেই মেয়াদেও শেষ হয়নি। এলাকার লোকজন মানববন্ধনও করেছে দ্রুত কাজ শেষ করার তাগিদে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ধুলা নিরসনে প্রয়োজনীয় পানি ছিটায় না বলেও অভিযোগ এলাকাবাসীর। তবে সড়ক বিভাগ বলছে, ডিসেম্বরের মধ্যে সব সমস্যা নিরসন হবে।
২০১৭ সালের নভেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটির (একনেক) এক সভায় ‘কুমিল্লা (টমছম ব্রিজ) থেকে নোয়াখালী (বেগমগঞ্জ) আঞ্চলিক মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ’ শীর্ষক প্রকল্প অনুমোদন হয়। প্রায় ২ হাজার ১শ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। যার বাস্তবায়নকাল ছিল ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। পরে সময় বাড়িয়ে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত করা হয়। মোট তিন ধাপে কাজটি হচ্ছে।
জানা যায়, প্রথম ধাপে কুমিল্লার টমছম ব্রিজ থেকে লালমাই পর্যন্ত অংশের কাজ প্রায় শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে লালমাই থেকে লাকসাম বাজার পর্যন্ত নির্মাণকাজ ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতা, সিদ্ধান্তহীনতা ও মামলা মোকাদ্দমায় চলছে ঢিমেতালে।

তৃতীয় ধাপে লাকসাম থেকে নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ চৌরাস্তা পর্যন্ত অংশের কাজ চলছে দ্রুতগতিতে। আগামী ডিসেম্বরে এ অংশের কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, প্রকল্পের নোয়াখালী অংশের চৌরাস্তা-মাইজদী-সোনাপুরে সড়ক প্রশস্তকরণ কাজ চলমান। বড় বড় এস্কেভেটর সড়কের দু’পাশ থেকেই মাটি তোলা ও বালু ফেলার কাজ করছে। সড়কের দুপাশে কোথাও গর্ত করা হচ্ছে, আবার কোথাও মাটি ফেলা হচ্ছে। কোথাও চলছে সড়ক সমান করার কাজ। গর্তগুলোয় জমেছে ময়লা-পানি। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় একই সময়ে সড়ক দিয়ে চলছে সব ধরনের যানবাহন। কাদা ও ধুলোবালিতে ভোগান্তির শেষ নেই চলাচলকারীদের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চৌমুহনী চৌরাস্তা-মাইজদী-সোনাপুর জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত ১৩ দশমিক ৩৮ কিলোমিটার সড়ক অংশের তিনটি প্যাকেজের মধ্যে এক নম্বর প্যাকেজের প্রায় চার কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ এখনো বাকি। ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড ও ইনফ্রাটেক নামে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সড়ক নির্মাণের কাজ করছে। যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কাজে ধীরগতির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পানি ছিটায় না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দুটি। সড়ক বিভাগ বিদ্যুৎ ও বাখরাবাদ গ্যাস বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করছে না।
অন্যদিকে, ভাঙা রাস্তায় বাস চালাতে গিয়ে সময় নষ্ট, যানজট আর গাড়ি বিকল হওয়ায় ক্ষুব্ধ পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। ভোগান্তিতে পড়ে বিরক্ত হচ্ছেন দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীরা।

করোনার আগে মাইজদী সড়কে খাবারের দোকান খুলেছিলেন তরুণ উদ্যোক্তা রনি। কয়েক লাখ টাকা খরচ করে অন্দর সজ্জার কাজ করেছিলেন। রনির স্বপ্ন ছিল কুমিল্লা-নোয়াখালী চার লেন সড়কের কাজ শেষ হলে জমজমাট হয়ে উঠবে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতিতে সব আশায় গুড়ে বালি। পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি কাজ। সড়কের খানাখন্দ, ধুলাবালিতে অতিষ্ঠ হয়ে ঠিকমতো ব্যবসা শুরুই করতে পারেননি ওই উদ্যোক্তা। তার অবস্থা আরও শতাধিক উদ্যোক্তার।
রনি জাগো নিউজকে বলেন, চার লেন সড়কের নির্মাণকাজে ধীরগতির কারণে মাইজদী শহরের ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত। অধিকাংশ সময় সড়কে যানজট লেগে থাকছে। মানুষ ধুলাবালির মধ্যে কেনাকাটা করতে আসতে চায় না। কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য আমরা প্রশাসনের হস্তক্ষেপও চেয়েছি।
মাইজদী প্রধান সড়ক সংলগ্ন ব্যবসায়ীরা জানান, সড়কে কাজের কারণে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ধুলা, মাটি ও কাদায় তাদের পণ্যসামগ্রী নষ্ট হয়। বাতাসে অতিমাত্রার ধুলোবালির কারণে তারা নিজেরাও বেশিক্ষণ দোকানে থাকতে পারছেন না।
গণমাধ্যমকর্মী নাসিম শুভ জাগো নিউজকে বলেন, দ্রুত এ প্রকল্পের কাজ শেষ করার জন্য মাইজদী, সোনাপুরের সর্বস্তরের জনগণ মানববন্ধনসহ একাধিক কর্মসূচি পালন করেছে। ধীরগতিতে চলছে নির্মাণকাজ। বর্ষায় প্রধান সড়কগুলো কাদামাটিতে পরিপূর্ণ থাকছে আর শীতে বাড়ছে ধুলাবালি। খানাখন্দে পরিপূর্ণ সড়কে চরম দুর্ভোগে নাকাল হতে হচ্ছে পথচারীদের।

জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ আহমেদ আহাদ উল্লাহ (নোয়াখালী ডিভিশন) জাগো নিউজকে বলেন, নোয়াখালী অংশের কাজ মোটামুটি শেষ হয়ে যাবে। দ্রুতগতিতে কাজ হচ্ছে। আর দুই কিলোমিটারের মতো সড়ক নির্মাণকাজ বাকি।
কাজের দীর্ঘসূত্রতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ, স্থাপনা সরাতে আমাদের বেগ পেতে হয়েছে। এ কারণে একটু দেরি হচ্ছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির প্রজেক্ট ম্যানেজার মাসুম বিল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, সড়ক বিভাগের সহযোগিতায় দ্রুতই শেষ হবে নোয়াখালী অংশের কাজ। জনভোগান্তি কমাতে আমরা কাজ করছি। দ্রুত পিচ ঢালাই ও পানি ছিটানোর কাজ চলছে। আশা করছি শিগগির এ ভোগান্তির অবসান ঘটবে।
নির্মাণকাজের জন্য মাইজদী এলাকায় ধুলোবালি বেড়েছে। যে কারণে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়েছে জানিয়ে নোয়াখালী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. তানভীর হোসেন বলেন, ধুলাবালির কারণে শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। জনসাধারণের মধ্যে বাড়ছে চুলকানি, অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টজনিত রোগ।
তার মতে, রাস্তাঘাট এমনভাবে নির্মাণ এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে যাতে অতিরিক্ত ধুলাবালি তৈরি না হয়।
এসএম/এএসএ/এমএস