আন্তর্জাতিক নারী দিবস
নারীরাই কেন নারীদের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যায়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বাস্তব জীবন, একটি কথা প্রায়ই শোনা যা - নারীরাই নারীর বড় শত্রু। কিন্তু কেন?
নারীর অধিকার বা সমতার প্রশ্নে অনেক সময় কেন নারীরাই অন্য নারীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন? কর্মক্ষেত্রে, পরিবারে বা সামাজিক পরিসরে এমন দৃশ্য নতুন নয়। কোনো নারী এগিয়ে গেলে আরেক নারীই কখনও কখনও তার সমালোচনায় সবচেয়ে বেশি সরব হয়ে ওঠেন। বিষয়টি ব্যক্তিগত বৈরিতার চেয়ে অনেক গভীর, এটি সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত।
দীর্ঘদিনের পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর মধ্যেই এর উত্তর লুকিয়ে আছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সমাজের নিয়ম, মূল্যবোধ ও ক্ষমতার কাঠামো এমনভাবে তৈরি হয়েছে যেখানে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিই প্রধান হয়ে উঠেছে। এই কাঠামোর মধ্যে বড় হতে হতে অনেক নারীও অজান্তেই সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রহণ করেন।
এই প্রক্রিয়াকে অনেক গবেষক ‘ইন্টারনালাইজড সেক্সিজম’ বা অন্তর্নিহিত লিঙ্গবৈষম্য হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। অর্থাৎ সমাজের বৈষম্যমূলক ধারণাগুলো দীর্ঘদিন ধরে শুনতে শুনতে সেগুলোই সত্য বলে মনে হতে শুরু করে। ফলে একজন নারী নিজের অজান্তে অন্য নারীর আচরণ, পোশাক, সিদ্ধান্ত বা উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে একই পুরুষতান্ত্রিক মানদণ্ডে বিচার করতে শুরু করেন।
ইউনাইটেড নেশনস উইমেন-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, লিঙ্গবৈষম্য শুধু পুরুষের আচরণে সীমাবদ্ধ নয়; সামাজিক কাঠামো ও সংস্কৃতির মাধ্যমে তা নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে। ফলে অনেক সময় নারীরাও সেই কাঠামোর অংশ হয়ে ওঠেন, যদিও তারা নিজেরাও এর ভিকটিম।
কর্মক্ষেত্রে এর উদাহরণ দেখা যায়। কোনো নারী সহকর্মী মাতৃত্বজনিত ছুটি নিলে কেউ কেউ সেটিকে ‘অতিরিক্ত সুবিধা’ হিসেবে তুলে ধরেন। আবার পরিবারে মেয়েদের চলাফেরা বা পোশাক নিয়ে বাজে মন্তব্য বেশিরভাগ সময় নারী আত্মীয়দের কাছ থেকেই আসে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এটি অনেক ক্ষেত্রে টিকে থাকার কৌশল হিসেবেও গড়ে ওঠে। যখন একটি সমাজে দীর্ঘদিন পুরুষের নিয়মই প্রধান থাকে, তখন সেই নিয়ম মেনে চলাই অনেকের কাছে নিরাপদ মনে হয়। তাই কেউ কেউ অজান্তেই সেই ব্যবস্থাকেই সমর্থন করতে শুরু করেন।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন বলছে, সামাজিকভাবে শেখানো আচরণ ও ধারণা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ফলে পরিবর্তন আনতে হলে শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো সামাজিক সংস্কৃতির দিকেও নজর দিতে হয়।
নারী দিবসের আলোচনায় তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো - নারীর প্রতি নারীর সহমর্মিতা। কারণ সমতা প্রতিষ্ঠা শুধু একটি লড়াই নয়, এটি একটি শেখার প্রক্রিয়া। দীর্ঘদিনের সামাজিক ‘ট্রেনিং’ বদলাতে সময় লাগে, সচেতনতা লাগে এবং সবচেয়ে বেশি লাগে পারস্পরিক সমর্থন।
সূত্র: ইউনাইটেড নেশনস উইমেন জেন্ডার ইক্যুইটি রিপোর্ট, আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন সামাজিক আচরণ বিশ্লেষণ, বিভিন্ন জেন্ডার স্টাডিজ গবেষণা
এএমপি/জেআইএম