জমে উঠেছে লালনের দোল উৎসব


প্রকাশিত: ০৮:১২ এএম, ২৪ মার্চ ২০১৬

কোনো এক চৈত্রের দোল পূর্ণিমায় কুষ্ঠ রোগী লালন কালী নদীতে ভেলায় ভাসতে ভাসতে কুষ্টিয়ার এই ছেঁউড়িয়ায় আসেন। এখানকার বাসিন্দা মলম শাহ তাকে উদ্ধার করে সেবা-চিকিৎসা করে বাঁচিয়ে তোলেন। লালন শাহ তার জীবদ্দশায় কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ার কালীগঙ্গা নদীর তীরে রাতভর তত্ব কথা আলোচনা ও গান বাজনা নিয়ে মগ্ন থাকতেন।

কালী গাঙ্গের সেই যৌবন আজ আর নেই। তবে নদীর স্রোত থেমে গেলেও সাঁইজির ভক্তরা থেমে যাননি। ১২৯৭ বঙ্গাব্দের পয়লা কার্তিক তার মৃত্যুর পরও মরাকালী গঙ্গার বুকেই এ উৎসব চালিয়ে আসছেন লালনের অনুসারীরা। এটিকে দোল উৎসব হিসেবেই জানেন লালন অনুসারীরা।

প্রতি বছরের ন্যায় এবারেও বসেছে ‘মনের মানুষ’ তালাশের মেলা। তবে এবার স্বাধীনতা দিবসের কারণে ৫ দিনের উৎসবকে কাঁটছাট করে ৩ দিনের করা হয়েছে।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় লালন একাডেমির আয়োজনে এ উৎসবে যোগ দিতে এরই মধ্যে দেশ-বিদেশ থেকে বাউল তীর্থভূমি ছেঁউড়িয়ার আখড়া বাড়িতে ছুটে এসেছেন সাধু-গুরু, বাউল, ভক্তরা।

ছোট দলে ভাগ হয়ে দরদ ভরা গলায় গেয়ে চলেছেন লালনের গান। আবার কেউ বা মেতে উঠেছেন গুরুবাদি বাউল ধর্মের নিগুড় তত্ব কথার আলোচনায়। এসেছেন দেশ বিদেশের নানা বয়সি দর্শনার্থীরাও। এ আয়োজনে যোগ দেয়ার জন্য পূর্ব থেকে বাউলদের কোনো চিঠি দেয়া হয় না, জানানো হয় না নিমন্ত্রণ। তারপরও এক অদৃশ্য সুতোর টানে এরা দলে দলে ছুটে আসেন এ বাউল ধামে।

আখড়া বাড়ির আঙ্গিনায় বসার জায়গা হবে না বলে অনুষ্ঠান শুরুর ১০ দিন আগেই এসে আসন পেতেছেন ঢাকার মুন্সীগঞ্জের লালন ভক্ত ষাটোর্ধ্ব রেজাউল শাহ। আলাপকালে এই প্রবীন বাউল সাধক বলেন, ‘বছরে দুবার সাঁইজির বারামখানায় সাধু-গুরুদের মিলন মেলা বসে। এই দিন আসলে কিছুতেই বাড়িতে মন টেকে না। সংসারের সব মায়ার সুতো ছিঁড়ে চলে আসি আখড়া বাড়ি। গেল ৩০ বছর ধরে এমনটাই করে আসছি। গুরু আমারে খুব টানে গো। তিনি আমারে ঘরে থাকতে দেন না। তাই পাগলের মতো ছুটে আসি।’

আরেক বাউল সাধক ফকির পরান শাহ বলেন, ‘আগে আসলে সাঁইজির মাজারের কাছাকাছি বসার জায়গা মেলে। আবার অনেক দিন ধরে এখানে কাটানো যায়। এর যে কি আনন্দ, কি স্বাদ তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।’

এদিকে লালন একাডেমিও সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছেন অতিথিদের সবরকম সুবিধা নিশ্চিত করতে। এছাড়া এ উৎসবকে নির্বিঘ্ন করতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। লালন একাডেমির সভাপতি কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন জানান, ‘প্রতি বছরের মত এবারও হাজার হাজার বাউল ভক্ত ও দর্শনার্থীদের ভিড় জমবে লালনের আখড়া বাড়িতে। তাই সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’

লালন একাডেমির (ভারপ্রাপ্ত) সাধারণ সম্পাদক সেলিম হক বলেন, ‘২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস, এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন চলছে। এ কারণে এবার উৎসবের কলেবর ছোট করে তিন দিনের করা হয়েছে।’

বুধবার সন্ধ্যা ৭ টায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ প্রধান অতিথি থেকে তিন দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেছেন। সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন। মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন লালন গবেষক অ্যাডভোকেট লালিম হক।

লালনভক্তদের মতে, লালন সাঁইজি তার গানের মধ্যে দিয়ে জাতপাতহীন সমাজ ব্যবস্থার দর্শন দেখিয়েছেন। তিনি গানের মধ্যে দিয়ে সমাজের ধর্মান্ধ, গোঁড়ামি, শাসকদের পক্ষপাত বিচার ও বৈষম্য দূর করার পথ দেখিয়েছেন। সব ধর্মের ঊর্ধ্বে থেকে মরমী সাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন মানবমুক্তির জন্য সৃষ্টি করেছিলেন ফকিরী মতবাদ। তার মানবমুক্তির আলোকিত সৃষ্টি বাউল গান নিয়ে সারা বিশ্বের ভক্ত ও অনুরাগীরা তাকে চিনেন, জানেন ও হৃদয়ে লালন করেন। আর সেই টানেই এই দিনে সবাই ছুটে আসেন লালনের কাছে, মনের মানুষের তালাশে।

আল-মামুন সাগর/এলএ/এবিএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।