‘বিচার বিভাগের কোনো রায় বিক্রি হয় না’
নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালতে আমার বিচার বিভাগের কোনো রায় বিক্রি হয় না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা। শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাত গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলেন, আমার বলতে দ্বিধা নেই, গবেষণায় দেখা গেছে লোয়ারকোর্ট থেকে শুরু করে হাইকোর্ট পর্যন্ত রায় বেচাকেনা হয়।
জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমি স্বদর্পে বলতে পারি আমার বিচার বিভাগে কোন মামলায় রায় বিক্রি হয় না।’ হ্যাঁ, এখানেও ইরেগুলার হচ্ছে, আমি অস্বীকার করছি না। তবে বড়জোর এটা পাঁচ থেকে দশ শতাংশ হতে পারে।
তিনি বলেন, বিচার বিভাগ আলাদা কোনো দ্বীপের মতো না। এখানে ইরেগুলারিটিজ চলবে, আমার-আপনার ছেলে মেয়েরাই এ দেশের বিচারক। এ দেশের আইনজীবীরাও এ দেশের। আমরা সবার সঙ্গেই মিশে আছি। আর হঠাৎ বিচার বিভাগের সদস্যরা ফেরেশতা হয়ে যাবে এটা কোনোমতেই আশা করা যায় না। এটা করলে আপনারা ভুল করবেন।
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘বিচার বিভাগ নিয়ে ওপেন ক্রিটিসাইজ করবেন না, কিছু কিছু ত্রুটি আছে, সেটাই রেগুলেটরি হয়। আপনারা কি জানেন রাত ৯টা পর্যন্তও বিচার বিভাগের কাজ চলে। শুক্র শনিবারেও আদালত চলে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন মিলনায়তনে বাংলাদেশে আইনের সংস্কার ও আইন কমিশন এবং সিলেক্টেড রাইটিংস অন ইন্টারন্যাশনাল ল: কনস্টিটিউশনাল ল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস শীর্ষক দুটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বই দুটির লেখক আইন কমিশনের সদস্য প্রফেসর ড. এম শাহ আলম।
বিচার ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা দূর করা প্রসঙ্গে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, একদিনে বিচার বিভাগের পরিবর্তন করা যাবে না। বিচারবিভাগের পরিবর্তনে তিনটি প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।
এক. এর জন্য আইনজীবীদের বাণিজ্যিক মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে।
দুই. বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার সাথে প্রচলিত আইনের মিল নেই। একেবারেই বিপরীত। এখন প্রযুক্তিভিত্তিক অপরাধ এমনভাবে বেড়ে গিয়েছে যে, প্রচলিত আইন দিয়ে কোনোভাবেই তার বিচার করা সম্ভব না। এটাকে ঢেলে সাজাতে হবে।
তিন. প্রত্যেকে আমরা বিভিন্ন অধিকারের কথা বলি। কিন্তু আমরা আমাদের দায়িত্ব-কর্তব্যের কথা ভুলে যাই। নাগরিক হিসেবে আমার কি কর্তব্য এটা সম্পূর্ণ আমরা ভুলে যাই। একদিকে আমি আমার অধিকারের কথা চিন্তা করবো অন্যদিকে আমি আমার দায়িত্ব-কর্তব্যের কথা ভুলে যাবো তা কোনোমতেই হয় না।
প্রধান বিচারপতি বলেন, প্রশাসন কোনো মতেই চায় না বিচার বিভাগ ঠিকমতো কাজ করুক। এটা শুধু আমার দেশে না আমেরিকা, ইংল্যান্ডেসহ পৃথিবীর সব জায়গাতেই হচ্ছে।
আমার বিচারকরা কাজ করতে পারেন না। এক বেলা বিচার করতে হয় তাদের। আবার মোবাইল কোর্টও বিচার হচ্ছে। এটা সরাসরি পরস্পরবিরোধী বিচার ব্যবস্থা। এক দেশের মধ্যে দুই বিচার ব্যবস্থা কেন চলবে? প্রশ্ন তোলেন প্রধান বিচারপতি।
বিচার ব্যবস্থার কঠোরতা নিয়ে তিনি বলেন, একজন জনপ্রতিনিধি যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন নির্বাচনের মাধ্যমে তাকে পরিবর্তন করা যায়। একজন দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাকে চাকুরিচ্যুত করা যায়। কিন্তু বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা হারিয়ে গেলে মানুষের আর যাওয়ার রাস্তা থাকে না।
প্রধান বিচারপতি বলেন, হ্যা, আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে আপনারা আলোচনা-সমালোচনা করেন। কিন্তু এটাই হলো শেষ জায়গা। আর এটাই যদি শেষ হয়ে যায় তাহলে জনগণের যাওয়ার আর কোনো জায়গা থাকবে না। আজকে যে বিচার ব্যবস্থা আছে তা যদি আমরা ধ্বংস করে ফেলি তাহলে কিছুই থাকবে না।
প্রধান বিচারপতি বলেন, বিচার ব্যবস্থার মানসিকতার পরিবর্তনের জন্য জনমত গঠন করতে হবে। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। ইগোইজমের পরিবর্তন করতে হবে, চিন্তা-চেতনার পরিবর্তন করতে হবে। মুখে বলবো রুল অব ল ইনডিপেন্ডেন্ট অব জুডিশিয়ারি কিন্তু নিজে পরিবর্তন হবো না, কোনো মতেই এখানে কিছুই করা যাবে না।
এফএইচ/এসকেডি/আরআইপি