সেকেলে পদ্ধতিতে তনু হত্যার তদন্তে লাভ হবে না


প্রকাশিত: ০৮:০০ এএম, ০২ এপ্রিল ২০১৬

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা বলেছেন, সেকেলে পদ্ধতিতে তনু হত্যার তদন্তে লাভ হবে না। তদন্ত করতে হবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে।

শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন দেশের প্রধান বিচারপতি।

প্রধান বিচারপতি বলেন, তনু হত্যার ঘটনা একটি আধুনিক অপরাধ। পুরনো মানসিকতায় তদন্ত করে এর সুষ্ঠু বিচার সম্ভব নয়। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে প্রচলিত ফৌজদারি আইনের মিল নেই। একে ঢেলে সাজাতে হবে। ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি আইন দিয়ে তনু হত্যার বিচার করা যাবে না।
 
সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ড বর্তমানে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়। এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ও ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবিতে প্রতিদিনই সভা-সমাবেশ হচ্ছে। থানা, ডিবি ঘুরে এ মামলার তদন্তভার এখন রয়েছে সিআইডিতে।   

আইন প্রণেতাদের সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেছেন, আইন প্রণেতাদের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো তারা আইন সম্পর্কে অজ্ঞ।

এ অনুষ্ঠানে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্তের বিষয়েও কথা বলেন এসকে সিনহা। এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তের বিষয়েও তিনি মনে করেন, সেকেলে পদ্ধতিতে তদন্তে করে কোনো লাভ হবে না।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নিজবাসা থেকে উদ্ধার করা হয় মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনির ক্ষত-বিক্ষত মরদেহ। এরপর চারবছর কেটে গেলেও মামলার তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।   

প্রধান বিচারপতি আরো বলেন, আগে দেখতাম সংসদে আইন প্রণয়ন নিয়ে বিতর্ক হতো, এখন আর হয় না। সংসদে আমরা শেখার মতো কিছু দেখি না।   

১৯৬০ সালে বিচারব্যবস্থা যেভাবে শুরু হয়েছিল সমাজব্যবস্থা এখন আর সেরকম নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাই ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করতে হবে।

সাংসদদের সমালোচনা করে প্রধান বিচারপতি বলেন, এর আগে সংসদে আইনের ওপর ব্যাপক আলোচনা-বিতর্ক হতো। কিন্তু এখন কোনো বিতর্ক হয় না, আলোচনা হয় না। ফলে আইনসভায় আইনের চর্চা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এ জন্য এখনকার প্রত্যেকটা আইন ত্রুটিপূর্ণ থেকে যায়। জনগণ ভোগান্তিতে পড়ে যান। বিচার বিভাগে চাপ পড়ে।

তিনি বলেন, বিচারবিভাগ হলো মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। এটা যদি শেষ হয়ে যায় জনগণ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। এটা যদি আমরা ধ্বংস করে ফেলি তবে কিছুই থাকেব না। জনকণ্ঠের মামলার রায়ে বলে দিয়েছি সব।

তিনি আরো বলেন, হ্যাঁ, আমাদের ভুল থাকতে পারে, আপনার লিখবেন, বলবেন, আলোচনা-সমালোচনা করবেন।

বিচার ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, তিনটি বিষয়ে পরিবর্তন আনা জরুরি। আইনজীবীদের কমার্শিলিয়াজম এবং বিচার ব্যবস্থা বাণিজ্যিক হয়ে যাওয়াটা প্রধান। এছাড়া বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে প্রচলিত আইনের মিল নেই। একে ঢেলে সাজাতে হবে। সেই সঙ্গে অধিকার সচেতন হওয়া সত্ত্বেও আমাদের দায়িত্ব ভুলে যাওয়াটাও অন্যতম প্রতিবন্ধকতা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশে আইনের সংস্কার ও আইন কমিশন’ এবং ‘সিলেক্টেড রাইটিংস অন ইন্টারন্যাশনাল ল : কনস্টিটিউশনাল ল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’ শীর্ষক দুটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বই দুটির লেখক আইন কমিশনের সদস্য প্রফেসর ড. এম শাহ আলম।

মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন- বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান প্রফেসর আব্দুল মান্নান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারাকাত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ও জগন্নাথ বিশ্বাবদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাসুম বিল্লাহ।

সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, এ দেশের যেখানে রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম, সেখানে বিচার বিভাগ আলাদা কোনো দ্বীপের মতো নয় যে সব জায়গায় অনিয়ম থাকবে আর বিচার বিভাগের সব ফেরেশতা হয়ে যাবে, এটা হতে পারে না। বিচার বিভাগেও কিছু অনিয়ম আছে, কিন্তু সেটা পাঁচ থেকে ১০ শতাংশের বেশি না। এই প্রক্রিয়া মেনে নিয়েই আমাদের মানুষের জন্য কাজ করে যেতে হবে।

প্রধান বিচারপতি বলেন, আমাদের দেশের বেশির ভাগ আইন অচল হয়ে গেছে। এসব আইনের ব্যবহারের কার্যকারিতা অনেক কম। এসব আইনের ব্যাপক সংস্কার করা না হলে বিচার বিভাগ আরো মুখ থুবড়ে পড়বে।

এফএইচ/এনএফ/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :