‘অন্তর মম বিকশিত করো, অন্তরতর হে’
মাথার ওপর গনগনে রোদ, কখনো বা বোল পাল্টে আকাশ কালো করে আসছে ঝুম বৃষ্টি। বৈশাখ আসছে, বৈশাখ ডাকছে, আবহাওয়ার মতিগতি বোঝা বড় দায়। পুরনো সব জীর্ণতাকে মুছে ফেলে নতুনত্বকে জয় করে নিতে সবকিছুই সাজছে নতুনভাবে। প্রকৃতিতেও যেন তার ব্যতিক্রম নয়। নতুনত্বের ছোঁয়া লেগেছে নিকুঞ্জের বৃক্ষরাজিতেও। শুধু বাহ্যিকভাবে নয়, রাঙাতে হবে প্রত্যেক হৃদয়ের সত্ত্বাকেও। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘অন্তর মম বিকশিত করো, অন্তরতর হে।’ আর এটিকেই নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪২৩ বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য হিসেবে।
এসো হে বৈশাখ, এসো এসো হে! বাঙালির প্রাণের অন্যতম মহোৎসব পহেলা বৈশাখ। প্রবাহমান ধারায় নানা লোকাচার উৎসবে প্রাণ পেয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে বাঙালির কৃষ্টি। বাঙালির প্রাণের এই উৎসব মূলত বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জাতিসত্ত্বার প্রতীকী উপস্থাপনা। এই দিনটিতে বাংলাদেশের মানুষ বাঙালিত্বের মন্ত্রে দীক্ষিত হয় আরো একবার। যে দিনটিতে ধর্ম, গোত্র, সম্প্রদায় বলতে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। শুভ্রতায় মুছে যাবে সকল গ্লানি। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’
তাইতো এমন দিনটির অপেক্ষায় থাকে পুরো বাঙালি জাতি। দেশের সার্বজনীন এ মহোৎসবকে বরণ করতে ইতোমধ্যে নানা পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি শুরু হয়েছে দেশব্যাপি। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে চলছে বৈশাখের সবচেয়ে বড় আয়োজন মঙ্গল শোভাযাত্রার মহাযজ্ঞ প্রস্তুতি। চারুকলার ছাত্র-ছাত্রীরা রাত-দিন কাজ করছেন অবলিলাক্রমে।
কোনো ধরনের অন্যের সহযোগিতা ছাড়া বাঙালির এ স্বতন্ত্র উৎসবের শোভাযাত্রাটি চারুকলার শিক্ষার্থীরা করে থাকে সম্পূর্ণ নিজেদের অর্থায়নে। নিজেদের তৈরি নানা লোকজ শিল্পকর্ম বিক্রি করেই তারা এ খরচ জোগায়। পাশাপাশি চলে শোভাযাত্রার জন্য বিভিন্ন ধরনের মোটিফ তৈরির কাজও।
মঙ্গলবার বিকেলে চারুকলায় ঢুকে দেখা যায়, প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। মূল গেইট দিয়ে প্রবেশ করতেই দেখা যায় হাতের বাম পাশে বিভিন্ন প্রাণীর মুখোশ ও সরা তৈরির কাজ করছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। আবার ডান পাশে চলছে রং তুলির কাজ। একদম দক্ষিণ-পশ্চিম কর্নারে সাজানো হয়েছে ইতোমধ্যে তৈরি হওয়া শিল্প-কর্মসমূহ। এর থেকে একটু সামনে এগুলো দেখা যায়, পেপারম্যাট মস্কের মুখোশ। যাতে স্থান পায় রাজা-রাণীসহ বিভিন্ন প্রাণীর মুখোশও। তার একটু সামনে গেলে দেখা যায় বাগানের মধ্যে বাঁশের চটা বেঁধে শিক্ষার্থীরা তৈরি করেছেন বাঘ, হাঁস, বিড়াল, শখের হাঁড়ি, শিশু হরিণ, পেঁচা, কাগুজে বাঘ, ছোট-বড়-মাঝারি আকৃতির পাখিসহ দারুণ সব মোটিফের কাঠামো।
আবার মূল প্রবেশ পথ দিয়ে বকুলতলার দিকে যেতেই চোখে পড়ে হাতের ডান পাশের রুমে বিক্রির জন্য বিভিন্ন সাজ-সজ্জার জিনিস তৈরি করছে চারুকলার শিক্ষার্থীরা। সকলে ব্যস্ত যার যার ওপর অর্পিত কাজে। কেউ ছবি আঁকছেন, কেউ মুখোশ গড়ছেন, কেউ বা আবার হাঁড়ি-পাতিলের ওপর কারুকার্য তৈরি করছেন। সেগুলোই কিছুক্ষণ পর টাঙানো হচ্ছে দেয়ালে। চমৎকার এসব শিল্পকর্ম অপরুপ সৌন্দর্যে সাজিয়ে তুলেছে পুরো চারুকলা প্রাঙ্গণকে।
কাজের ফাঁকে কথা হয় ছবি আঁকার কাজে ব্যস্ত থাকা ২০তম ব্যাচের প্রাচ্যকলা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্রী নওরীন মিশার সঙ্গে। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘কাজ অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে। আগামী মঙ্গল শোভাযাত্রার আগের রাত পর্যন্ত কাজ করবো। মঙ্গল শোভাযাত্রার কাজ করতে আলাদা কোনো দীক্ষার প্রয়োজন হয় না। এ কাজের স্পৃহা জোগায় বাঙালিত্বের মন্ত্র। সারাবছর মঙ্গল শোভাযাত্রার কাজের জন্য মুখিয়ে থাকি।’ এই বছর পহেলা বৈশাখ উদযাপনে নেতৃত্বে থাকছে বরাবরের মতো চারুকলার সবচেয়ে সিনিয়র ব্যাচ ১৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। এছাড়া অন্যান্য ব্যাচের শিক্ষার্থীরা তো আছেনই। আর তাদের এই পরিশ্রমের দেখভাল করছেন চারুকলার শিক্ষকরা।
খুব বেশি দূরে নয়, দ্রুতই এগিয়ে আসছে পহেলা বৈশাখ। আর এই দিবসটিকে রাঙিয়ে তুলতে রং-তুলি নিয়ে মেতে আছেন নবীন শিল্পীরা। সঙ্গে মানব মনে সচেতনতা জাগ্রত করতে প্রতি বছরের ন্যায় এবারো মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্যটি মানুষজনকে দিচ্ছে নতুন বার্তা। রাষ্ট্র চাইলে চলমান কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সেটিকে একেবারে নির্মূল করতে পারে না। পারে মনব হৃদয়ের প্রত্যেকটি সত্ত্বা। সে সত্ত্বাকে জাগ্রত করতে হবে। অন্তর্জামীকে বলছে তুমি রূপ নাও নতুন আদর্শে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে চলমান শিশু হত্যাসহ বেশ কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথের সঞ্চয়িতা কাব্যগ্রন্থ থেকে এবারের পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্যটি নির্ধারণ করা হয়েছে। সেটি হচ্ছে ‘অন্তর মম বিকশিত করো, অন্তরতর হে।’
চারুকলা অনুষদের ডিন ও মঙ্গল শোভাযাত্রা উদযাপন উপ-কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক নিসার হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার আমাদের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণসহ বেশ কিছু কারণে প্রস্তুতি শুরু করতে একটু বিলম্ব হয়েছে। তবে যথা সময়ে কাজ শেষ হবে। ঐতিহ্যগতভাবে এবারো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বরাদ্দ পাওয়া অর্থ ও আমাদের শিক্ষার্থীদের তৈরি শিল্পকর্ম বিক্রির অর্থ দিয়েই আমরা মঙ্গল শোভাযাত্রা করবো। সে জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো ধরনের স্পন্সর নেয়া হচ্ছে না। তবে এ বছর থেকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আমাদের কিছু অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করবে।’
এমএইচ/বিএ