‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্র হয় না’

আমীন আল রশীদ
আমীন আল রশীদ আমীন আল রশীদ , সাংবাদিক, কলামিস্ট
প্রকাশিত: ০৯:৩৭ এএম, ১২ জানুয়ারি ২০২৬

খ্যাতিমান ভারতীয় লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট অরুন্ধতী রায় বাংলাদেশে এসেছিলেন ২০১৯ সালের মার্চ মাসে। দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ আলোকচিত্র উৎসব ‘ছবিমেলা’য় অংশ নিতে এসেছিলেন। কথা ছিল ওই বছরের ৫ মার্চ বিকালে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন কমপ্লেক্স মিলনায়তনে তিনি নিজের লেখকজীবন নিয়ে কথা বলবেন। কিন্তু বক্তৃতা অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি দিয়েও শেষ পর্যন্ত তা প্রত্যাহার করে নেয় পুলিশ। কিন্তু কী কারণে অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি বাতিল করা হলো, এর কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি পুলিশ। (প্রথম আলো, ০৫ মার্চ ২০১৯)।

এই ঘটনার আগ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের বিরাট অংশ জানতোই না যে, অরুন্ধতী রায় ঢাকায় এসেছেন এবং একটি অনুষ্ঠানে তার বক্তৃতা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পুলিশের তৎপরতা, অতি উৎসাহ কিংবা তাকে কথা বলতে না দেওয়ার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে অরুন্ধতীর নামা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং পাড়ামহল্লার চায়ের দোকানেও তখন বিষয়টা নিয়ে আলোচন-সমালোচনা শুরু হয়। মানুষ মূলত পুলিশকেই দোষারোপ করে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত যে একটি থানার একজন ওসির নয়, বরং অরুন্ধতীর মতো একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখককে আমন্ত্রণ জানিয়ে কথা বলতে না দেওয়ার পেছনে যে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে কোনো কোনো গোয়েন্দা সংস্থাই মূল ভূমিকা পালন করেছে—তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।

যে অরুন্ধতী রায়ের আগমনের খবরটি মূলত তার ভক্ত অনুরাগী, পাঠক, অনুষ্ঠানের আয়োজক এবং অংশগ্রহণকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, সেই খবরটি রাষ্ট্র হয়ে গেলো রাষ্ট্রময়। এতে কার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হলো? অরুন্ধতী রায় কী এমন কথা বলতেন যা বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারকে বিব্রত করতো বা অসুবিধায় ফেলতো? একজন অরুন্ধতী রায়ের একটি বক্তৃতায় কিংবা লেখক জীবন নিয়ে তার স্মৃতিচারণ ও অভিজ্ঞতার বিবরণকে সরকার কি পারমাণবিক বোমার চেয়েও বেশি শক্তিশালী মনে করেছিল নাকি প্রথাবিরোধী লেখক তথা রাষ্ট্রীয় নানা অনাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকায় যেহেতু অরুন্ধতী রায়ের ব্যাপারে ভারতের শাসকগোষ্ঠীর একটা অ্যালার্জি ছিল এবং এখনও আছে, সে কারণে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের চাপেই তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তাকে ঢাকার মাটিতে খোলামেলা কথা বলতে দিতে ভয় পেয়েছে?

অরুন্ধতী রায় ভারতের মতো একটি বিশাল দেশের শক্তিশালী সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বেশ আলোচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তার বাংলাদেশে আগমন এবং বক্তৃতা দেওয়ার বিষয়টিকে সরকার কেন নিছকই অ্যাকাডেমিক ব্যাপার হিসেবে গণ্য করতে পারলো না? কেন তার পূর্বনির্ধারিত স্থানে অনুষ্ঠান বাতিল করে পরিস্থিতি গরম করে দেওয়া হলো?

অরুন্ধতী রায় বক্তৃতা দিলে সেই সংবাদ পত্রিকার পাতায়, নিউজ পোর্টালে কিংবা টেলিভিশনের স্ক্রিনে যতটা বড় আকারে বা গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হতো, ‘পুলিশ অরুন্ধতী রায়কে কথা বলতে দিচ্ছে না’—এই সংবাদটি তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি গুরুত্বসহকারে ও ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। তাতে কার লাভ হলো? বরং এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সরকারও কি বিশ্বে এই বার্তাটি দিল না যে, বাংলাদেশে কথা বলার স্বাধীনতা নেই, এমনকি একজন বিদেশি লেখকও সেখানে গিয়ে তার নিজের জীবনের গল্প বলতে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন? বাংলাদেশ যে প্রতি বছর গণতন্ত্র, সুশাসন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে তলানিতে থাকে, তার পেছনে এসব ঘটনার ভূমিকা ব্যাপক। অথচ একজন অরুন্ধতী রায় ঢাকার বুকে নিজের অভিজ্ঞতা এমনকি নাগরিক অধিকারের নানা বিষয়ে সরকারের সমালোচনা করলেও সেটি সরকারের ভাবমূর্তি যতটা না ক্ষুণ্ন করতো, তার চেয়ে বেশি ক্ষুণ্ন হয়েছে তাকে কথা বলতে না দেওয়ার মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ তাকে কথা বলতে দিলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যতটা ভালো হতো, বলতে না দেওয়ার ঠিক ততটাই খারাপ হলো। উন্নয়নের প্রকল্প থেকে হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করার অঙ্কটা নীতিনির্ধারকরা যত ভালো বোঝেন, একজন লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক বা অ্যাক্টিভিস্টের মুখ বন্ধ করা বা গলা টিপে ধরা বা কথা বলার কারণে তাকে জেলে ঢুকিয়ে দেওয়ার ফলে যে তাদের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়—সেটি হয়তো বুঝতে পারেন না।

৭ বছর আগের এই ঘটনার উল্লেখ করার কারণ হলো, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একটি অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের পরেও দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিকের মত ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা ও সুরক্ষা নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। আমাদের সরকার এবং তাদের স্টেকহোল্ডাররা সম্ভবত এখনও এটা বুঝতে অপারগ যে, মিডিয়ার মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করা বা গণমাধ্যমকে চাপে রাখার ঘটনাগুলো আসলে বুমেরাং হয়। সরকারের কর্তারা হয়তো এটা বুঝতে পারেন না যে, কাউকে কথা বলতে দিলে সে যা বলবে, বলতে না দিলে সে বলবে বা বলতে চাইবে তার চেয়ে অনেক বেশি—যা সরকারকে অধিকতর বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলবে। অর্থাৎ সরকার বা রাষ্ট্র যদি কারো মুখ বন্ধ করে বা করতে চায়, তাহলে ওই কথাগুলো অন্য কেউ অন্য কোনো প্লাটফর্মে বা ফোরামে ঠিকই বলবে। দেশে না হোক বিদেশের গণমাধ্যমে আসবে।

সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে কাউকে কথা বলতে না দেওয়া বা কথা বললেই তাকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীবদ্ধ করা তথা ট্যাগিংয়ের শিকার করার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, সেটি একসময় ট্যাগিংয়ের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরকেই যে গ্রাস করবে, এই সহজ উপলব্ধিটা অনেকের ভেতরেই নেই। মনে রাখা দরকার, নদীকে স্বাভাবিকভাবে চলতে দিলে তার চেহারা একরকম, বাধা দিলে অন্যরকম। সে তখন রুদ্ররূপ ধারণ করে।

আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি যদি জনগণের ম্যান্ডেট পেয়ে ক্ষমতায় আসে, তাহলে তাদের আমলে অন্তত অরুন্ধতী রায়ের মতো কোনো লেখকের অনুষ্ঠান বন্ধ, গণমাধ্যমে আগুন কিংবা সাংবাদিকদের হেনস্তার ঘটনা ঘটবে না এবং ঘটলেও রাষ্ট্র নির্লিপ্ত থাকবে না—এটাই সাংবাদিকরা প্রত্যাশা করছেন। সাংবাদিকরা মূলত তারেক রহমানকে পরোক্ষভাবে এটাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, কথা বলতে দিলে সরকারের যে ক্ষতি হবে, বলতে না দিলে বা গণমাধ্যম ও নাগরিকে কণ্ঠরোধের চেষ্টা করলে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের ক্ষতি হবে তার কয়েক গুণ বেশি।

সম্প্রতি দেশের শীর্ষ দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা-ভাঙচুর ও আগুনের দিন ইংরেজি দৈনিক নিউ এইজের সম্পাদক নূরুল কবীরকেও হেনস্তা করেছে একদল লোক—যাদেরকে ‘মব’ বলে সম্বোধন করাই শ্রেয়। চরম ফ্যাসিস্ট বা স্বৈরাচারের আমলেও বাংলাদেশে যা না হয়েছে, সেটি এবার হলো একটি নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে—যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় শান্তিতে নোবেলজয়ী একজন অর্থনীতিবিদ—সারা বিশ্বে যার সুনাম। যত যুক্তিই দেখানো হোক না কেন, রাষ্ট্র বা সরকার, বিশেষ করে সরকার প্রধান এর দায় এড়াতে পারেন না।

শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত একটি সংলাপে বক্তারা বলেন, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর সহিংসতা বেড়ে যাওয়া দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুতর ব্যর্থতার প্রতিফলন। বিশেষ করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে হামলার ঘটনায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও তথ্যপ্রবাহের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে তারা মনে করেন।

অনুষ্ঠানে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন রেখে বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এখন নাগরিকদের নাকি মবের হাতে? তিনি বলেন, বাংলাদেশ ক্রমেই বিভক্ত হয়ে পড়ছে; কার্যকর কমিশনের অভাব এবং ভিন্নমতকে ‘বিদেশি এজেন্ট’ আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করছে।

একই দিনে রাজধানীর একটি হোটেলে সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই অনুষ্ঠানেও সাংবাদিকরা গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমকর্মীদের স্বাধীনতা ও সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘আমরা চাই গণতন্ত্র, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সুশাসন।’ নিউ এইজের সম্পাদক নূরুল কবীর স্পষ্ট করেই বলেন, ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্র হয় না।’ আর মানবজমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে গণমাধ্যম স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু মব ভায়োলেন্সের কারণে আমরা অনেক সময়ই সাহসী হতে পারি না।’

এসব কথার ভেতর দিয়ে যেটা খুব পরিষ্কার তা হলো, আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি যদি জনগণের ম্যান্ডেট পেয়ে ক্ষমতায় আসে, তাহলে তাদের আমলে অন্তত অরুন্ধতী রায়ের মতো কোনো লেখকের অনুষ্ঠান বন্ধ, গণমাধ্যমে আগুন কিংবা সাংবাদিকদের হেনস্তার ঘটনা ঘটবে না এবং ঘটলেও রাষ্ট্র নির্লিপ্ত থাকবে না—এটাই সাংবাদিকরা প্রত্যাশা করছেন। সাংবাদিকরা মূলত তারেক রহমানকে পরোক্ষভাবে এটাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, কথা বলতে দিলে সরকারের যে ক্ষতি হবে, বলতে না দিলে বা গণমাধ্যম ও নাগরিকে কণ্ঠরোধের চেষ্টা করলে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের ক্ষতি হবে তার কয়েক গুণ বেশি। যে ক্ষতি এখন অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ টের পাচ্ছে।

লেখক : সাংবাদিক ও লেখক।

এইচআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।