মূল্যস্ফীতির দৌড়, দুর্দশা এবং চ্যালেঞ্জ

আব্দুল বায়েস
আব্দুল বায়েস আব্দুল বায়েস , সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: ১১:২০ এএম, ০২ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশে বর্তমানে সব ছাপিয়ে খবর হচ্ছে মূল্যস্ফীতি– আঠারো মাস আগের দশ শতাংশ ছুঁইছুঁই থেকে বর্তমানে আট শতাংশের উপর যা এই অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি। সাধারণ মানুষ থেকে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের ঘুম হারাম করছে প্রতিদিন প্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য বৃদ্ধির ঘটনা, নতুন সরকারের গলার কাঁটা তো বটেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অব্যাহত ঊর্ধ্বগতিকে বলে মূল্যস্ফীতি, ইংরেজিতে ইনফ্লেসন।

ইনফ্লেসন ঘিরে উষ্মা, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার যথেষ্ট কারণ থাক। এর একটা স্বল্পমেয়াদি সুবিধার কথা উইলিয়াম ফিলিস নামে এক অর্থনীতিবিদ দিয়েছেন এভাবে- মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের মধ্যকার সম্পর্ক বিপরীতমুখী অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির সাথে মূল্যস্ফীতি আসে যা উৎপাদককে উৎসাহিত করে উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে এবং বেকারত্ব হ্রাস করে। যাই হোক, স্বল্পকালীন সময়ে সুবিধা দিলেও দীর্ঘকালীন সময়ে যে মূল্যস্ফীতি ক্ষতিকর, তা নিয়ে সন্দেহ আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই মূল্যস্ফীতি নয় বরং মূল্যস্ফীতির হারটা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ একদিকে যে হারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে অন্যদিকে যে হারে মানুষের আয় বাড়ছে। প্রথমটি যদি দ্বিতীয়টির আগে দৌড়ায়, মূল্যস্ফীতি হয় ভিলেন, আর আয়ের পেছনে পড়লে হয় সে হিরো।

অর্থনীতির বিদ্যমান বিতর্কে ইনফ্লেসনের সাধারণত চারটি প্রভাব নিয়ে কথা হয়- (ক) ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস; (খ) স্বল্পকালীন সময়ে বেকারত্ব কমে যাওয়া (ফিলিপ্স কার্ভ ) যা একটু পূর্বে উল্লেখিত; (গ) সম্পদ নিয়োগে অনিশ্চয়তা; (ঘ) রপ্তানি হ্রাস এবং আমদনি বৃদ্ধি এবং (উ) দীর্ঘকালীন সময়ের প্রেক্ষিতে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি হ্রাস পাওয়া অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হোঁচট খাওয়া। আবার, অর্থনীতিবিদদের কেউ মনে করেন ৫-৭ শতাংশ হারে মূল্য বৃদ্ধি ঘটলে প্রবৃদ্ধির উপর আঘাতটা ততো প্রবল নাও হতে পারে কিন্তু এর উপরে মূল্যস্ফীতির হার মানে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।’

দুই.

বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি– এখন প্রায় সাড়ে আট শতাংশের মতো-  উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এই হারে মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রক্ষেপিত হারের চেয়ে বেশ বেশি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিকূলে। অন্যদিকে, বিশেষত বিভিন্ন আর্থসামাজিক গোষ্ঠীর কল্যাণের ( ওয়েল বিইং) উপর এর বিরূপ প্রভাব সুখদায়ক নয়। প্রসঙ্গত, স্বীকার করতেই হবে যে এই মূল্যস্ফীতির পেছনে কাজ করেছে প্রথমত কভিড এবং পরে চলমান রাশিয়া -ইউক্রেন যুদ্ধ- অর্থনীতির ভাষায় কষ্ট -পুস ইনফ্লেসন। উভয় ক্ষেত্রে সাপ্লাই চেন বিঘ্ন হওয়া জ্বলন্ত উনুনে হাওয়া দিয়েছে। ইরান-আমেরিকা/ইসরায়েল চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষিতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হবার কারণে বিশেষত বাংলাদেশে এর প্রভাব অনেক। 

যাই হোক, মূল্যস্ফীতির চলমান ডিসকোর্সে দরিদ্র শ্রেণির উপর মূল্যস্ফীতির বিরূপ প্রভাব প্রাধান্য পাবে সেটাই স্বাভাবিক কেননা গরিব মানুষ তার আয়ের প্রায় ৬০ ভাগ খরচ করে খাদ্য ক্রয়ে এবং তার মধ্যে চল্লিশ ভাগ চলে যায় চাল ক্রয়ে। মূল্যস্ফীতি যখন বাড়তে থাকে তখন শ্রমিকের মজুরি শ্রমিকের কাছ থেকে মুনাফার দিকে ধাবিত হয় বলে এমন দাবি করা হয় যে, মূল্যস্ফীতি আয় বৈষম্য সৃষ্টি করে কারণ এটা ধনীর চেয়ে গরিবকে আঘাত করে বেশি।

মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির সূত্রে ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং মানুষের অর্থনৈতিক অবনতি ঘটে– এমন একটা ব্যাখ্যা নিতান্তই হালকা, সরলরৈখিক এবং, বলা যেতে পারে, তা জলের উপর ওড়াওড়ি কিন্তু জল স্পর্শ করা নয়। মূল্যস্ফীতির আসল অগোচরে থাকা প্রভাবটা আলোতে আসে যখন আমরা গরিবের পুষ্টির কথা ভাবি। বাংলাদেশে বর্তমানে চার সদস্যের একটা পরিবারে সুষম খাদ্য সরবরাহে প্রতি মাসে প্রয়োজন প্রায় ১৯ হাজার টাকা- ‘একজন দিনমজুর, রিক্সাচালক, চর্মকার কিংবা গৃহস্থালির কাজে নিযুক্ত মানুষসহ যে-কোনো নিম্ন আয়ের গরিব মানুষ এখন প্রতিদিন যে আয় করছে, তাতে এই পুষ্টি জোগানো প্রায় অসম্ভব।’

মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির সূত্রে ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং মানুষের অর্থনৈতিক অবনতি ঘটে– এমন একটা ব্যাখ্যা নিতান্তই হালকা, সরলরৈখিক এবং, বলা যেতে পারে, তা জলের উপর ওড়াওড়ি কিন্তু জল স্পর্শ করা নয়। মূল্যস্ফীতির আসল অগোচরে থাকা প্রভাবটা আলোতে আসে যখন আমরা গরিবের পুষ্টির কথা ভাবি। বাংলাদেশে বর্তমানে চার সদস্যের একটা পরিবারে সুষম খাদ্য সরবরাহে প্রতি মাসে প্রয়োজন প্রায় ১৯ হাজার টাকা- ‘একজন দিনমজুর, রিক্সাচালক, চর্মকার কিংবা গৃহস্থালির কাজে নিযুক্ত মানুষসহ যে-কোনো নিম্ন আয়ের গরিব মানুষ এখন প্রতিদিন যে আয় করছে, তাতে এই পুষ্টি জোগানো প্রায় অসম্ভব।’

তিন.

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলছেন, ‘যথেষ্ট সাক্ষীসাবুদসহ বলা যায় যে, দুর্ভিক্ষে যত মানুষ মারা যায় তার চেয়ে বেশি মারা যায় কম পুষ্টির কারণে এবং অপুষ্টির কারণে অনেকে খুবই কষ্টকর জীবনযাপন করেন। অপুষ্টির শিকার মা যে সন্তান জন্ম দেন সে হয় খর্বকায় কিংবা রোগা। ভয়ংকর উত্তরাধিকার হিসেবে অপুষ্টি এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়। এই সমস্ত শিশুরা পরবর্তীকালে অপুষ্টিজনিত ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে না। তারা প্রায়শ অসুস্থ হয়ে পড়ে, ভালোভাবে শিখতে পারে না এবং বয়ঃপ্রাপ্তিতে তারা থাকে কম উৎপাদনশীল। সুতরাং, একটা দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র বা দারিদ্র্য জাল তৈরি হতে পারে যেখানে কম পুষ্টির কারণে দুর্বল স্বাস্থ্য, কম মজুরি এবং কম পুষ্টি।

চার.

এরই মধ্যে এসেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর। তাকেই সব সামলাতে হবে। এবার করণীয় নিয়ে কিছু কথা। বাজার অর্থনীতিতে চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে ভারসাম্য আসে কিন্তু বাংলাদেশের বাজার প্রতিযোগিতামূলক নয় যাতে ভোক্তা তার উদ্বৃত্ত ধরে রাখতে পারে। এখানে উৎপাদকরা উদ্বৃত্ত ভোক্তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় নানা ফাঁকফোকরে। এখানে মূল্যবৃদ্ধির পেছনে মার্কেট ম্যানিপুলাসন কাজ করতে পারে আর তাই কঠোর নজরদারি দরকার। দরকার আরও চাহিদা সংকোচন নীতি, কৃষিতে ভর্তুকি এবং বিলাসী- ব্যয় কমানো।

ইতোমধ্যে সরকার এ সংক্রান্ত যে পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলো যথেষ্ট না হলেও অত্যন্ত কাম্য ছিল। তবে গেল গভর্নরের সুদের হার বৃদ্ধি কেন মূল্যস্ফীতির কাম্য হ্রাস ঘটাতে পারলো না তা গবেষণার বিষয়। কিন্তু, মূল্যস্ফীতি ঘটলে সুদের হার বৃদ্ধির প্রথাগত নীতি- সুপারিশ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ কেন গড়িমসি করছে তা বোধগম্য নয়। শুনলাম, শিল্পপতিদের সংগঠনের সভাপতি সুযোগ্য তাও দু’একটা কথা না বললেই নয়।

প্রথমত, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতির মুখে মানুষের হাতে যেন উপার্জনক্ষম কাজ থাকে (অমর্ত্য সেনের ‘এনটাইটেলমেন্ট’ ) সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, গরিব শ্রেণির জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় ভর্তুকি সমেত খাদ্যের জোগান দিতে হবে; তৃতীয়ত, অপুষ্টি হ্রাসের জন্য প্রতিশ্রুতি নিয়ে সহায়ক রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য পরিবেশ তৈরির জন্য সহায়ক নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ। তাছাড়া, পুষ্টিকর খাবার যেমন ডালজাতীয় শস্য, ফলমূল ও সবজিবিষয়ক গবেষণা ও উন্নয়ন (আর অ্যান্ড ডি) বিনিয়োগ, বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে পুষ্টি ও খাদ্যসংক্রান্ত জ্ঞান, আচরণগত পরিবর্তনে সচেতনতা, ময়লা-আবর্জনা ও মলমূত্র যাতে শিশুদের মুখে যেতে না পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা। সুতরাং কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ খাতের মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয় প্রয়োজন।

আমরা নতুন গভর্নরের সাফল্য কামনা করি। তিনি যেন মূল্যস্ফীতি হ্রাস এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নীতি সূচক সমর্থন দেন এবং তার প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা সংরক্ষণে অযাচিত সরকারি হস্তক্ষেপ রোধে কঠোর হন। 

পাদটীকা-

স্ত্রী : মূল্যস্ফীতি কথাটার মানে কী?

স্বামী : যখন আমাদের বিয়ে হয়, তখন তুমি ছিলে ৩৬-২৪-২৪ । এখন তুমি ৪২-৪২-৪২। তোমাকে দেখায় বড় কিন্তু কর্মক্ষমতা কম। মূল্যস্ফীতি ঘটলে টাকারও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায়– বস্তাভর্তি টাকার বিনিময়ে পকেট ভর্তি মাল– এবং এর নাম ইনফ্লেসন।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, কলামিস্ট। সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

এইচআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।