পবিত্র মাহে রমজান: আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতের মাস

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
প্রকাশিত: ১০:২৯ এএম, ০২ মার্চ ২০২৬

এবারও রহমত, মাগফেরাত আর নাজাতের সওগাত নিয়ে এসেছে পবিত্র রমজান মাস। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা:) রমজান শুরু হবার দুমাস পূর্ব থেকেই মহান আল্লাহর কাছে এ মাস প্রাপ্তির দোয়া করতেন। তিনি বলতেন, “হে আল্লাহ্, আমাদেরকে রজব ও শাবান মাসে বরকত দান কর এবং রমজান মাস পর্যন্ত বেঁচে থাকার তৌফিক দান কর।” তাই সকল মুমিন মানুষের প্রত্যাশা এরূপ হওয়া উচিত। কারণ, রমজান মাস অনাবিল রহমতের প্রশান্তির মত কল্যাণে ভরা এক পুণ্যের বসন্ত নিয়ে প্রতিবছর আমাদের নিকট হাজির হয়।

রমজান যেহেতু সংযম ও আত্মশুদ্ধির ভরা বসন্ত সেহেতু এ মাসকে গুরুত্ব দিতে হবে পরিপূর্ণরূপে। এ মাসের ফজিলত যেমন অনেক তেমনি একে মর্যাদা দিতে কোন মু’মিন ব্যক্তির মোটেও কার্পণ্য করা উচিত নয়। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মুসলমান নারী-পুরুষের জন্য রমজানের ত্রিশ দিন রোজা রাখা ফরজ। অসুস্থ ব্যক্তির নিয়মানুযায়ী ক্কাফ্ফারা দেয়ার বিধান রয়েছে। তাই, বিনা কারণে রোজা না রাখা বড় গুনাহর কাজ।

আমরা যারা রোজা পালন করছি তাদের জন্য করণীয় অনেক কিছু রয়েছে। প্রথমত: রোজা রাখার জন্য মনকে শুদ্ধ করে নিয়ত করতে হবে। যে খাবার খেয়ে রোজা রাখছি সেটা সৎ উপার্জনে সংগৃহীত হালাল খাবার কি না? আমি একজন চাকুরিজীবী-অসৎ কি না? ঘুস-দুর্নীতিতে অভ্যস্ত কি না? আমি একজন ব্যবসায়ী-ওজনে কম দেই কি না? ভেজাল দ্রব্য তৈরি, মজুত, সরবরাহ ও বিক্রয় করি কি না? অতি মুনাফা করি কি না? মিথ্যা কথা বলি কি না? সন্ত্রাস, চুরি-ডাকাতি, ব্যাংকচুরি, প্রতারণা, ধর্ষণ, চোগলখুরি, জালিয়াতি করি কি না? আমি বাবা-মাকে কষ্ট দিই কি না? আমি আমার দায়িত্বে অবহেলা করে রোজা আছি কি না?

দ্বিতীয়ত: অনেক দুর্নীতিবাজ ও অসৎ ব্যক্তি একদিকে অসৎ কাজ করেন এবং পাশাপাশি নামাজ রোজা পালন করেন। একটি সাইক্লিক অর্ডারে তাদের ভাল ও মন্দ কাজ চালাতে থাকেন। তারা মনে করেন- খারাপ কাজ করলাম পাশাপাশি ভাল কাজ করলাম। ভাল কাজের বদৌলতে খারাপ কাজটি মাইনাস হয়ে যাবে। এভাবে ভাল-মন্দের প্লাস-মাইনাসের বিষয়ে তারা আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। এরা খুবই ভয়ংকর মানুষ। শুনেছিলাম, একজন সরকারি কর্মচারী ঘুসখোর ব্যক্তি ছিলেন কিন্তু তিনি নামাজও আদায় করতেন। একব্যক্তি তাকে ঘুস দিতে এসে দেখেন তিনি ওজু করছেন।

তাই কি করবেন-কি বলবেন ভেবে ইতস্তত: করছিলেন। সেসময় দ্বিধা না করে তিনি ঘুস নিয়ে পকেটে পুরলেন! আবার নতুন করে অজু করে নিলেন এই ভেবে যে তার হাতের গুনাহটা ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে ঝরে যাবে! আমাদের সমাজে এরকম ভণ্ড, বেঈমান মানুষের সংখ্যা প্রচুর। এরা একশ্রেণির রোজাদার কিন্তু ঘুসের বিষয়টি সামনে এলে এরা আত্মভোলা- যেন তবু ঘুস নেয়, তবু দেয় তবু খায়। এরা এরা মহান আল্লাহতা’য়ালার সাথেও প্রতিনিয়ত প্রতারণা করতে কুণ্ঠিত হয় না।

একজন ভিক্ষুক বা জাকাতপ্রার্থী সেই বেড়া ডিঙিয়ে বা বেতনভুক পাহারাদারদের লাঠির ভয়ে ধারে কাছে পৌঁছুতে পারে না। তাই ধনী মুসলমানদের তাঁদের মজুদ অর্থ-সম্পদের জন্য নির্ধারিত পরিমাণ বাৎসরিক জাকাত নির্ণয় করত সেটাকে সুষ্ঠুভাবে বণ্টনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই একজন গরীব দুঃখীর দুঃখগুলো অনুভব করতে শেখা যাবে। রমজান মাসে শয়তান শিকলে বন্দী থাকে বিধায় মাসে রোজাদার মানুষের মনে প্রশান্তি ও একটা স্বর্গীয় অনুভূতির সৃষ্টি হয়। এই স্বর্গীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে গরীব-দুঃখীদের জন্য এদেশের ধনাঢ্য ব্যক্তিগণ নিজ নিজ পুণ্য-পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেন।

কিন্তু এভাবে যদি সবাই ভাল-মন্দের প্লাস-মাইনাসের থিওরিতে আত্মপ্রসাদ লাভ করতে চেষ্টা করতে থাকে তাহলে ভাল জিনিসগুলো এক সময় বিলীন হয়ে যায়-মন্দগুলো স্থান দখল করে ফেলে। ঠিক যেমন নদীর মিঠা পানির স্রোতে কমজোরি হলে সমুদ্রের লোনা পানি নদীকে গ্রাস করে ফেলে। তাই মানুষকে ঈমানদার হতে হবে। রমজানের রোজা মানুষের ভিতরের মন্দস্পৃহাগুলোকে পুড়িয়ে দিয়ে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে পারে। সেক্ষেত্রে খাঁটি রোজা রাখতে হবে।

তৃতীয়ত: রোজার সময় অসংযমী হওয়া খুবই খারাপ লক্ষণ। একজন সীমিত আয়ের সৎ মানুষ সবসময় হিসেব করেই পথ চলেন। তাঁর কর্মস্থল, সংসার ও ব্যক্তিগত জীবনে নিয়মানুবর্তিতার ছাপ লক্ষণীয়। সততার জন্য তাঁর সব কাজে রহমতের ছোঁয়া লেগে থাকে। তিনি তাতেই পরিতৃপ্ত থাকেন। অপরদিকে একজন অসৎ ও অসংযমী মানুষের মধ্যে অভাব চিরসাথি। চকবাজারের ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ নামক বাদশাহী খাবার দিয়েও তার তৃপ্তি হয় না।

আপনি একাই দৈনিক হাজার হাজার টাকার ইফতারি কিনে নিয়ে পাঁচ তারকা হোটেলে বসে ধনী বন্ধু-বান্ধবীদের নিয়ে উল্লাস করে ইফতার করবেন-আর কেউ একটু ছোলা-মুড়ি পাবার আশায় থালা হাত বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াবে- এই রোজার শিক্ষা নয়। বরং আপনার একটু সহযোগিতা পেলে খব সহজেই এলাকায় মসজিদে, ক্লাবে গরিবদের জন্য ইফতারের আয়োজন করা যেতে পারে। এভাবে রমজানের রোজা মানুষের ভিতরের মন্দরিপু-খাই খাই ভাব পুড়িয়ে দিয়ে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে পারে। সেক্ষেত্রেও খাঁটি রোজাদার হতে হবে।

চতুর্থত: এভাবে রোজার মাধ্যমে ব্যক্তি মানুষের আত্মা পরিশুদ্ধ করতে করতে একসময় আমাদের জাতীয় জীবনে সবার কলুষিত আত্মাগুলো পরিশুদ্ধ হয়ে যেতে পারে অন্যথায় নয়। রোজার শিক্ষা একজন অনাহারী মানুষের কষ্ট বুঝতে শেখায়, একজন গরীব দুঃখীর দুঃখগুলো অনুভব করতে শেখায়। কিন্তু আমরা পর্যবেক্ষণ করছি- আমাদের দেশে রোজাদার বেড়েছে, নামাজি বেড়েছে পাশাপাশি ভিক্ষুক ও জাকাতপ্রার্থীর বেড়েছে। তার কারণ হলো-এদেশে ধনী-গরীব মানুষের মধ্যে ব্যবধান বেড়ে চলেছে। ধনীদের সম্পত্তির বেড়ার বাহার ও পাহারাদার বেড়েছে।

একজন ভিক্ষুক বা জাকাতপ্রার্থী সেই বেড়া ডিঙিয়ে বা বেতনভুক পাহারাদারদের লাঠির ভয়ে ধারে কাছে পৌঁছুতে পারে না। তাই ধনী মুসলমানদের তাঁদের মজুদ অর্থ-সম্পদের জন্য নির্ধারিত পরিমাণ বাৎসরিক জাকাত নির্ণয় করত সেটাকে সুষ্ঠুভাবে বণ্টনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই একজন গরীব দুঃখীর দুঃখগুলো অনুভব করতে শেখা যাবে। রমজান মাসে শয়তান শিকলে বন্দী থাকে বিধায় মাসে রোজাদার মানুষের মনে প্রশান্তি ও একটা স্বর্গীয় অনুভূতির সৃষ্টি হয়। এই স্বর্গীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে গরীব-দুঃখীদের জন্য এদেশের ধনাঢ্য ব্যক্তিগণ নিজ নিজ পুণ্য-পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেন। নতুবা, স্বর্ণ ব্যবসায়ীর একটি কু-সন্তানের মত আপনার সন্তানের অবস্থা হলে ঠেকাবেন কি করে?

পবিত্র এ রমজান মাসে পবিত্র কোরআন শরীফ নাজিল হয়েছে। এ মাসেই শ্রেষ্ঠ রাত্রি পবিত্র ‘লাইলাতুল ক্কদর’ রয়েছে। এ মাস দোয়া কবুলের মাস। মহানবী (সা:) বলেছেন, ‘রমজান মাসে দোয়া কবুল হয়’ (মুসনাদ আহমাদ)। তিনি আরো বলেন, ’আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রমজানের প্রতি রাতে বহু মানুষকে মুক্তি দিয়ে থাকেন এবং প্রতি রাত ও দিবসে মুসলমানদের দোয়া ও প্রার্থনা কবুল করা হয়’ (সহি আততারগিব- ওয়াততারহিব)।

আসুন আমরা সবাই পবিত্র রমজানের সুযোগকে কাজ লাগিয়ে সংযমী হই, আত্মশুদ্ধির এই ভরা বসন্তকে কাজে লাগিয়ে পুণ্যবান হয়ে মুক্তি খোঁজার চেষ্টা করি এই প্রত্যাশা সবার কাছে।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন।

এইচআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।