মব-সহিংসতা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও টানাপড়েনের পর বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরকাল অতিক্রম করছে। এই সময়টিকে অনেকেই নতুন সম্ভাবনার সূচনা হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে সমাজে জমে থাকা নানা ক্ষোভ ও অসন্তোষের প্রকাশও আমরা প্রত্যক্ষ করছি। এই প্রেক্ষাপটে কোথাও কোথাও জনতার অনিয়ন্ত্রিত আচরণ বা মব সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
একটি পরিবর্তনপর্বে এমন সামাজিক অস্থিরতা নতুন কিছু নয়। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা চাপ হঠাৎ প্রকাশ পেলে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে জটিল হয়ে উঠতে পারে। তবে ইতিবাচক দিক হলো—রাষ্ট্রযন্ত্র, সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই চ্যালেঞ্জগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ধাপে ধাপে পদক্ষেপ নিচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। বর্তমান পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় তাদের সামনে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ এসেছে, যেখানে একদিকে জনমতের চাপ, অন্যদিকে আইনের শাসন বজায় রাখার দায়িত্ব—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রক্রিয়ায় বাহিনীগুলোকে আরও স্পষ্ট দিকনির্দেশনা, আইনি সুরক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় যে বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো রাষ্ট্রের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এসব ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে, আইনের শাসন আরও সুসংহত করা এবং জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় করা কতটা জরুরি। সরকার ও প্রশাসনের জন্য এটি একটি সুযোগ—আইনের একচ্ছত্র প্রয়োগক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার, এবং অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্স নীতিকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের।
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পেশাদারিত্ব, সাহস ও ত্যাগের এক দীর্ঘ ঐতিহ্য বহন করে। সময়ের প্রয়োজনে তাদের সক্ষমতা আরও বাড়ানো, আধুনিক প্রশিক্ষণ ও মানসিক সহায়তা জোরদার করা এখন অপরিহার্য। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সমান আচরণ নিশ্চিত করা হলে জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় হবে।
সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কর্তব্য। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই বিষয়ে সচেতন এবং বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারে উদ্যোগ নিচ্ছে। এসব উদ্যোগ আরও বিস্তৃত ও দৃশ্যমান হলে সমাজে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে—রাষ্ট্র সবার জন্য সমানভাবে কাজ করছে।
আইনের শাসন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়—এটি সর্বজনস্বীকৃত সত্য। তাই সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি সুদৃঢ় করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান বাস্তবতা সরকারকে সেই সুযোগই এনে দিয়েছে, যাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও দৃঢ় পদক্ষেপের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভিত আরও মজবুত করা যায়।
বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই সময়টি যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও সামাজিক স্থিতিশীলতার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলার মধ্য দিয়েই একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যাবে।
এই সংকটময় সময়ে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, সত্যনিষ্ঠ বিশ্লেষণ এবং গঠনমূলক সমালোচনা রাষ্ট্রকে সঠিক পথে এগোতে সহায়তা করে। সহিংসতা নয়, বরং আইনি ও গণতান্ত্রিক সমাধানকেই এগিয়ে নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই সময়টি যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও সামাজিক স্থিতিশীলতার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলার মধ্য দিয়েই একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যাবে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়তা, পেশাদারিত্ব ও জনগণের আস্থাই পারে মব সহিংসতার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে—এবং সেই পথেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
[email protected]
এইচআর/এমএস