প্রসব-পরবর্তী সময়ে রোজা রাখা নিয়ে যা জানা জরুরি
প্রসব বা সন্তানের জন্মের পর নারীর শরীর একটি বিশেষভাবে সংবেদনশীল অবস্থায় থাকে। এখানে শুধু শরীরই নয়, ধর্মীয় কর্তব্য ও সুস্থতা দুটোই বিবেচনায় রাখা জরুরি। বিশেষ করে যদি প্রশ্ন আসে সন্তান জন্মের পর কতদিন পর থেকে মা রোজা রাখতে পারেন? তাহলে শরীরের পুনরুদ্ধার সময়, ধর্মীয় বিধান এবং ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থার ওপর এ সিদ্ধান্ত নির্ভর করে।
গাইনি ও প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রুখসানা পারভীন মতে, প্রসূতি মায়ের জন্য রোজা শুধু ধর্মীয় বিষয় নয়; এটা তার শরীরের স্বাভাবিক পুনরুদ্ধার সময়ের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই রোজা রাখার সিদ্ধান্ত নিতে হলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
ছবি: গাইনি ও প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রুখসানা পারভীন
শরীরের পুনরুদ্ধার সময়
জন্মের পর প্রথম ৪০ দিন নারীর শরীর স্বাভাবিকভাবে পুনরুদ্ধার হওয়ার সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সময়ে যেহেতু শরীরে রক্তক্ষরণ (নিফাস) চলতে পারে এবং শক্তি–পুষ্টি কম থাকে এ সময়ে রোজা রাখা সাধারণত উপদেশযোগ্য নয়। ইসলামিক বিচারে গর্ভাবস্থা শেষ হওয়ার পর নিফাস বা প্রসবের রক্তক্ষরণ যতক্ষণ না থামে ততক্ষণ মা রোজা রাখতে পারেন না, কারণ রোজা রাখা শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ধর্মীয় দিক
ধর্মীয় দিক থেকে ইসলামশাস্ত্রে নির্দেশ আছে যে যতক্ষণ একজন মা নিফাসে থাকে, তিনি রোজা রাখতে পারবেন না। যদি রক্তক্ষরণ একেবারেই না থাকে বা আগেই বন্ধ হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে রোজা ও নামাজ শুরু করা যায়। শরীয়াহ অনুযায়ী ৪০ দিন পর্যন্ত কঠোরভাবে রক্তক্ষরণ স্থায়ী হওয়া স্বাভাবিক, তবে তা যদি আগেই বন্ধ হয় তাহলে রোজা রাখা যায়। এ ক্ষেত্রে ‘রক্তক্ষরণ রোধ হলে গোসল করে মমিনা পুনরায় রোজা–নামাজ শুরু করতে পারেন।’ তা ইসলামী বিধানও বলে।
অর্থাৎ, ৪০ দিন কোনো নির্দিষ্ট সময় নয়; বরং রক্তক্ষরণ শেষ হওয়া এবং শরীরের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
আরও পড়ুন:
শক্তি ও পুষ্টি
প্রসবের পর শরীর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কমপক্ষে কয়েক সপ্তাহ সময় নিলে, রোজা শক্তির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শরীর কমজোর অনুভব করতে পারে, মাথা ঘুরা বা দুর্বলতা হতে পারে, দুধের পরিমাণ বা গুণগত মানে পরিবর্তন ঘটতে পারে। এই কারণে অনেক চিকিত্সক ও বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে, মা যদি দুধপান করান ও ব্যস্ত থাকে তাহলে শরীরের প্রয়োজনীয় ক্যালরি ও পানি পাওয়ার জন্য রোজা রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এ বিষয়ে ডা. রুখসানা পারভীন কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। যথা-
- যদি রক্তক্ষরণ সম্পূর্ণ থেমে যায় এবং শরীর সুস্থ থাকে, তাহলে মা রোজা রাখতে পারেন। কিন্তু সেটা শারীরিক অনুভূতি ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হবে।
- প্রথম কয়েক সপ্তাহে রোজা আটকানো চিকিৎসা হিসেবে উপদেশযোগ্য, যেন শরীর যথেষ্ট শক্তি ও পুষ্টি পায়।
- রোজা শুরুর আগে চিকিৎসক বা গাইনি বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করা জরুরি, বিশেষ করে যাদের সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে বা চিকিৎসকের বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে।
প্রসবের পর রোজা রাখার সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র ধর্মীয় বিধান নয়; শরীরের সুস্থতা, দুধদান, পুনরুদ্ধার সময় এবং ব্যক্তিগত শক্তির উপর নির্ভর করে।
ডা. রুখসানা পারভীনের মতে, শরীর যখন পুরোপুরি রপ্ত হয়, রক্তক্ষরণ বন্ধ হয় এবং চিকিৎসক অনুমোদন দেন তখনই রোজা রাখা নিরাপদ ও উপযোগী। আর যদি রক্তক্ষরণ বা শরীরের দুর্বলতা থেকে থাকে, তাহলে রোজা মিস করে তা পরে খুঁজে নেওয়াই শরীর ও ধর্ম উভয়ের প্রতি সম্মান জানানো।
জেএস/