পোস্টাল ভোট, দেশের রাজনীতি: এক ভোটারের ভাবনার গল্প

ফারুক যোশী
ফারুক যোশী ফারুক যোশী , প্রবাসী সাংবাদিক
প্রকাশিত: ১০:৩২ এএম, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একটি উপ-নির্বাচন ঘিরে এখন ম্যানচেস্টারের একটি সংসদীয় এলাকা জুড়ে প্রচার-প্রচারণা চলছে। লিফলেট নিয়ে স্বেচ্ছাসেবকদের ছোট ছোট দলের ঘরে ঘরে নকিং ক্যাম্পেইনও চোখে পড়ে । এসময়ে আমার মোবাইলের একটি ফোনকল প্রতরণামূলক হতে পারে এ নিয়ে দ্বিধা থাকলেও স্থানীয় কোড নম্বর দেখে শেষ পর্যন্ত ধরেই ফেললাম।

ওপ্রান্ত থেকে অত্যন্ত ভদ্র, পরিমিত স্বরে জানানো হলো—মাত্র দুই মিনিট সময় লাগবে, স্থানীয় উপ-নির্বাচন নিয়ে একটি জরিপ, কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর চাই। যেহেতু আমি এই এলাকার নিবন্ধিত ভোটার, তাই সম্মতি দিলাম। প্রশ্ন শুরু হলো সরাসরি—

“গত নির্বাচনে আপনি কোন দলকে ভোট দিয়েছিলেন?” আমি উত্তর দিলাম।

“এবার কি অন্য কোনো দলকে বিবেচনায় নিচ্ছেন?” বললাম—না।

“কিন্তু আপনার এলাকার এমপি তো কেলেঙ্কারির দায় নিয়ে পদত্যাগ করেছেন—তবুও না?” উত্তর একই—না।

“আপনার সেকেন্ড চয়েস কোন দল?” বললাম—গ্রিন পার্টি।

পরের প্রশ্নটি ছিল বেশ গভীর—“আপনি তো বলছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ভালো করছেন না, তাহলে গ্রিন পার্টি কেন আপনার প্রথম পছন্দ নয়?”--'রিফোর্ম যেন না আসতে পারে' । এরপর আরও কিছু সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রশ্ন, ডেটা সংগ্রহের উপযোগী কয়েকটি তথ্য, সব মিলিয়ে তিন মিনিটের মধ্যেই জরিপ শেষ। ফোন রেখে দেওয়ার পর যে অনুভূতিটা হলো, তা শুধু যুক্তরাজ্যের রাজনীতি নিয়ে নয়—আমাকে যেন টেনে নিয়ে গেল বহু দূরে, আমার শৈশব-কৈশোর-যৌবনের দেশ, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায়।

বাস্তব রাজনীতি কেবল আদর্শের নয়, কৌশলেরও। আমি জানি গ্রিন পার্টি এই আসনে জিতবে না। আর যদি আমি তাদের ভোট দিই, তাহলে সেই ভোট কার্যত ডানপন্থি ‘রিফর্ম’ পার্টির পক্ষে গিয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ আমার একটি আদর্শিক ভোট বাস্তবে পরিণত হতে পারে আমার একেবারেই অপছন্দের শক্তির লাভে। তাই বাস্তবতার বিচারে আমি সেই ঝুঁকি নিতে চাই না।

২.

সত্যি বলতে কী, শুরুতে ইচ্ছে ছিল না ভোট প্রয়োগ করার। আমার পছন্দের কোনো প্রার্থী নেই, কোনো দলই আমার কাছে আদর্শিকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছিল না। তবু কেন জানি মনে হলো—ভোট দেওয়া প্রয়োজন। আমি যেমন জুলাই আন্দোলনের সুফল পাওয়ার স্বপ্ন দেখা মানুষদের একজন, তেমনি বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়েও আমার অসংখ্য প্রশ্ন আছে। অনিশ্চয়তা আছে, সন্দেহ আছে, দ্বিধা আছে।

তবু একটি বিষয় অস্বীকার করা যায় না—প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। ব্যর্থতা, অসংগতি আর বিতর্কের মাঝেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোট দেওয়ার অধিকার বাস্তবায়ন করা হয়েছে দ্রুততম সময়ে। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় রাষ্ট্রীয় সাফল্য। অথচ বিগত আওয়ামী লীগ সরকার তার টানা সতেরো বছরের শাসনামলে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেও এই ছোট্ট কিন্তু মৌলিক বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। তখন “ডিজিটাল বাংলাদেশ” ছিল স্লোগান, কিন্তু প্রবাসীর ভোটাধিকার ছিল অবহেলিত বাস্তবতা। আজ বাস্তবতা হলো—একজন প্রবাসী নাগরিকের 'একটি ভোট' নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে ব্যয় করতে হচ্ছে হাজার হাজার টাকা। লজিস্টিক, পোস্টাল সার্ভিস, প্রশাসনিক ব্যয়, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে এটি একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া।

এই ব্যয়ের মধ্যেই একটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আছে—প্রবাসীও সমান নাগরিক। সুতরাং একজন গর্বিত বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে ভোট প্রয়োগ করাটাও আমাদের নাগরিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। এটি কেবল অধিকার নয়, দায়িত্বও। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের পাঠানো ব্যালট পেপারটা নাড়াচাড়া করলাম--- বিদেশের মাটিতে বসে দেশের ভোট। এক অদ্ভুত অনুভূতি।

৩.

নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—কেউ যদি ভোট দিয়ে তা লিখিতভাবে প্রকাশ করেন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করেন, তবে সেই ভোট অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বাতিল করা হবে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তিও আছে। নির্বাচনে প্রচারণা আর ভোটের গোপনীয়তা—এই দুটি আলাদা বিষয়। নির্বাচন কমিশন সম্ভবত চেয়েছে, ভোটের বাক্স যেন প্রচারণার হাতিয়ার না হয়। “আমার ভোট আমি দেবো, যাকে ইচ্ছা তাকে দেবো”—এই শ্লোগানটি যেন কেবল বাক্সের ভেতরেই প্রমাণিত হয়, বাহিরে প্রদর্শনী হয়ে না ওঠে।

আমার ব্যক্তিগতভাবে পছন্দের কোনো প্রার্থী নেই। এই কারণেই প্রথমে ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু সেই জরিপকারীর ফোনকল আমাকে নতুনভাবে ভাবিয়েছে। কারণ উত্তরটা তো আমিই দিয়েছি—আমি ভোট না দিলেও নির্বাচন থেমে থাকবে না। একজন না একজন নির্বাচিত হবেনই।

সুতরাং আমার সামনে বাস্তব প্রশ্ন দাঁড়াল—আমি কি শুধু নিজের অপছন্দের কারণে সরে দাঁড়াবো, নাকি আমার “সেকেন্ড চয়েস”-এর মাধ্যমে অন্তত আমার সবচেয়ে অপছন্দের শক্তিকে এক ভোটে পিছিয়ে দেবো? গণতন্ত্রে অনেক সময়ই সিদ্ধান্ত হয় কম ক্ষতিকর বিকল্পের পক্ষে। আদর্শ আর বাস্তবতার এই দ্বন্দ্বেই ভোটের দর্শন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাচন কমিশনের ‘দেশ গড়ার নতুন ধারা’-র অংশ হওয়ার সুযোগটুকু অন্তত ন্যূনতমভাবে ব্যবহার করা যায়। হয়তো এতে বড় পরিবর্তন আসবে না, কিন্তু নাগরিক দায় পালনের জায়গাটুকু তৈরি হয়।

৪.

ভিন্ন একটি প্রসঙ্গে আসি। যুক্তরাজ্য দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতির একটি উর্বর ক্ষেত্র। ইতিহাস বলছে—মুক্তিযুদ্ধের সময় এই দেশের প্রবাসী বাংলাদেশিরাই আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তহবিল সংগ্রহ, লবিং, প্রচারণা—সব ক্ষেত্রেই যুক্তরাজ্য ছিল এক শক্তিশালী কেন্দ্র। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের জন্যও যুক্তরাজ্য ছিল একটি নির্ভরতার জায়গা। একইভাবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত সতেরো বছর ধরে এই দেশেই অবস্থান করে নিজেকে রাজনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করেছেন, দলকে সংগঠিত করেছেন, শক্তিশালী করেছেন। এই যুক্তরাজ্য থেকেই বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রামের রূপরেখা তৈরি করেছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে তিনি এই দেশ থেকেই দলের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের কাজ করেছেন।

তার প্রমাণও দেখা গেছে—যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, যা এক ধরনের রাজনৈতিক স্বীকৃতি ও পুরস্কার হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে।

এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের নেতিবাচক প্রচারণা দৃশ্যমান নয়, কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকেও খুব একটা সক্রিয় প্রচার-প্রচারণাও চোখে পড়ে না। এবার যুক্তরাজ্যের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটার ব্যালট পেপার পেয়েছেন। তারা ভোট দেবেনও। অতীতে দেখা গেছে—এমনকি স্থানীয় মেয়র নির্বাচন নিয়েও বড় বড় সভা-সমাবেশ হতো। অথচ বাংলাদেশের রাজনীতির পটপরিবর্তনের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রবাসী রাজনীতিতে এক ধরনের নীরবতা বিরাজ করছে।

৫.

যুক্তরাজ্যে জামায়াতে ইসলামীর নামে আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল নেই। কিন্তু তাদের আমীর যখন আসেন, তখন পুরো ব্রিটেনে যেন উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। অর্থাৎ নাম নিয়ে সংগঠন না থাকলেও কর্মী-সমর্থক নেটওয়ার্ক অগণিত, বিস্তৃত এবং সক্রিয়। বিএনপি তো বিশাল সংগঠন—আওয়ামী লীগের মতোই তাদেরও এখানে অর্ধশতাধিক শাখা রয়েছে। কমিউনিটি সংগঠন, সামাজিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন—সবখানেই রাজনৈতিক প্রভাব দৃশ্যমান। এই বাস্তবতায় দেশের এই ক্রান্তিকালে নির্বাচন নিয়ে প্রবাসে নীরব থাকা রাজনৈতিকভাবে একটি বড় শূন্যতা । গণতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রায় ভোট প্রদানে উদ্বুদ্ধ করা শুধু দেশের ভেতরে নয়, প্রবাসের প্রতিটি বাংলাদেশি অধ্যুষিত দেশেই জোরালোভাবে প্রয়োজন।

আওয়ামী লীগ দেশেও নির্বাচন নিয়ে তেমন উৎসাহ দেখাচ্ছে না। কিন্তু নির্বাচন তো হবেই। বাস্তবতা এটাই। সুতরাং তাদের কর্মী-সমর্থকদেরও অন্তত এ নিয়ে ভাবতে হবে—নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রয়োজনেই। ভোট নিছক অধিকার নয়, এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের এক ধরনের নীরব চুক্তি। আর সেই চুক্তির অংশ হয়েই ব্যালট বাক্সে পড়ে যায় একটি কাগজ, যার ভেতরে লুকিয়ে থাকে একটি দেশের ভবিষ্যৎ।

লেখক: বৃটেনপ্রবাসী কলামিস্ট।

এইজআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।